ফারুক হোসেন সজীব »
বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা তাঁদের সৃষ্টিশীলতা, চিন্তা ও প্রতিভার মাধ্যমে একটি জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয়কে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁরা শুধু একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে কাজ করেননি, বরং তাঁদের প্রতিটি কাজ হয়ে উঠেছে নতুন চিন্তার দরজা। মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন তেমনই একজন বিরল প্রতিভার অধিকারী শিল্পী। তিনি ছিলেন একাধারে চিত্রশিল্পী, শিক্ষক, নাট্যনির্মাতা, সাংস্কৃতিক সংগঠক, টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের পাপেট শিল্পের প্রাণপুরুষ। তাঁকে মানুষ ভালোবেসে ডাকত পাপেটম্যান নামে। এই নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে তাঁর দীর্ঘ শিল্পযাত্রার পরিচয়। তিনি শুধু পুতুল তৈরি করেননি, তিনি পুতুলের মধ্যে জীবন, অনুভূতি এবং গল্প সৃষ্টি করেছিলেন।
তাঁর হাতে তৈরি পাপেটগুলো শিশুদের আনন্দ দিয়েছে, আবার বড়দেরও ভাবিয়েছে। তিনি দেখিয়েছিলেন, শিল্প শুধু গ্যালারির দেয়ালে আটকে থাকে না, শিল্প মানুষের ঘরে, শিশুর মনে এবং সমাজের চেতনার মধ্যেও বেঁচে থাকে। ২০২৬ সালের ২৯ জুন বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গন হারায় তার এক উজ্জ্বল নক্ষত্রকে। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মুস্তাফা মনোয়ার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। নিউমোনিয়া ও প্রোস্টেট ক্যানসারে ভুগছিলেন তিনি। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। তাঁর মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর দেশের শিল্পী, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নেমে আসে গভীর শোক। কারণ তিনি শুধু একজন শিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক স্মৃতির একটি বড় অংশ। তবে একজন সত্যিকারের শিল্পীর মৃত্যু কখনো তাঁর সৃষ্টির মৃত্যু নয়। মুস্তাফা মনোয়ারের রঙ, রেখা, পুতুল ও ভাবনা আজও আমাদের সঙ্গে কথা বলে। তাঁর সৃষ্টি আগামী প্রজন্মকে শেখাবে কীভাবে শিল্প দিয়ে মানুষকে ভালোবাসতে হয়। মুস্তাফা মনোয়ার জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর যশোর জেলার মাগুরা মহকুমার শ্রীপুর থানার নাকোল গ্রামে। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে। তাঁর বাবা ছিলেন প্রখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফা। সাহিত্য ও সংস্কৃতির পরিবেশে বেড়ে ওঠার কারণে ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে সৃষ্টিশীলতার বিকাশ ঘটে। পরিবার থেকেই তিনি পেয়েছিলেন শিল্প ও সৌন্দর্যের প্রতি ভালোবাসা।
ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকা ও গানের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। তিনি চারপাশের সাধারণ জিনিসের মধ্যেও খুঁজে পেতেন অসাধারণ কিছু। অন্য শিশুরা যেখানে শুধু একটি দৃশ্য দেখত, তিনি সেখানে গল্প খুঁজে নিতেন। একটি মুখ, একটি পাখি, গ্রামের কোনো মানুষ কিংবা দৈনন্দিন জীবনের ছোট কোনো ঘটনা তাঁর কল্পনায় নতুন রূপ পেত। এই পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাই পরবর্তীতে তাঁকে বড় শিল্পী হিসেবে গড়ে তুলেছিল। তাঁর বেড়ে ওঠার সময় ছিল উপমহাদেশের পরিবর্তনের সময়। সমাজ, রাজনীতি ও সংস্কৃতির নানা পরিবর্তন তাঁর চিন্তাকে প্রভাবিত করে। মানুষের জীবন ও সংগ্রামের সঙ্গে তাঁর শিল্পীসত্তার সম্পর্ক তৈরি হয় খুব অল্প বয়সেই। কিশোর বয়সেই মুস্তাফা মনোয়ার দেশের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্নে সচেতন হয়ে উঠেছিলেন। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় তিনি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। সেই সময় ছবি আঁকার অপরাধে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়েছিল। এই ঘটনা তাঁর জীবনে গভীর ছাপ ফেলে। তিনি বুঝেছিলেন, শিল্প শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়। শিল্প মানুষের পরিচয়, অধিকার ও প্রতিবাদের ভাষাও হতে পারে।
পরবর্তীতে তাঁর কাজের মধ্যে বারবার মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সংস্কৃতির প্রতি দায়িত্ববোধ এবং নিজস্ব পরিচয়ের বিষয়টি উঠে এসেছে। মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করার পর তিনি কলকাতায় উচ্চশিক্ষার জন্য যান। প্রথমে স্কটিশ চার্চ কলেজে ভর্তি হলেও তাঁর মন পড়ে ছিল শিল্পের জগতে। তাই তিনি কলকাতা চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হন। চারুকলায় তাঁর প্রতিভা দ্রুত সবার নজরে আসে। ১৯৫৯ সালে তিনি ফাইন আর্টসে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। এটি ছিল তাঁর কঠোর পরিশ্রম ও শিল্পের প্রতি গভীর ভালোবাসার ফল। কলকাতায় পড়াশোনার সময় তিনি ভারতীয় শিল্প, ইউরোপীয় শিল্প এবং লোকজ শিল্পের নানা দিক সম্পর্কে জানতে পারেন। এসব অভিজ্ঞতা তাঁর শিল্পচিন্তাকে আরও সমৃদ্ধ করে। তবে তিনি কখনো নিজের শিকড় ভুলে যাননি। তাঁর শিল্পে সবসময় বাংলাদেশের মাটি, মানুষ ও সংস্কৃতির উপস্থিতি ছিল স্পষ্ট। তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন শিল্পী যত বেশি নিজের সমাজকে বুঝবেন, তাঁর শিল্প তত বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাবে। শিক্ষকতা ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। শিক্ষক হিসেবে তিনি ছিলেন আলাদা ধরনের। তিনি শিক্ষার্থীদের শুধু আঁকার নিয়ম শেখাতেন না, তাঁদের নিজের মতো করে ভাবতে উৎসাহিত করতেন। তিনি মনে করতেন, একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো কল্পনা। তাঁর কাছে শিল্প মানে ছিল নতুন কিছু দেখা, নতুনভাবে ভাবা এবং নিজের অনুভূতিকে প্রকাশ করা। তাঁর ছাত্ররা শুধু তাঁর কাছ থেকে ছবি আঁকা শেখেননি, শিখেছেন কীভাবে একজন সৃষ্টিশীল মানুষ হতে হয়। মুস্তাফা মনোয়ারের সবচেয়ে বড় অবদান বাংলাদেশের পাপেট শিল্পে। বাংলাদেশে পুতুলনাচের ঐতিহ্য বহু পুরোনো। গ্রামবাংলার পুতুলনাচ ছিল মানুষের বিনোদনের একটি অংশ। কিন্তু মুস্তাফা মনোয়ার এই ঐতিহ্যকে আধুনিক শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করেন। তিনি দেখান, পুতুল শুধু খেলনা নয়। পুতুলও কথা বলতে পারে, অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে এবং মানুষের জীবনের গল্প বলতে পারে। ছোটবেলায় দেখা পুতুলনাচ তাঁর মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। চারুকলার শিক্ষা এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পাপেট শিল্প সম্পর্কে জ্ঞান তাঁকে নতুনভাবে ভাবতে সাহায্য করে। তিনি বিদেশি ধারাকে অনুকরণ করেননি। বরং বাংলাদেশের নিজস্ব সংস্কৃতির সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি করেন নিজস্ব পাপেট ভাষা। তাঁর পাপেট ছিল বাঙালির জীবনের প্রতিচ্ছবি। পারুল, বাঘা ও মেনির মতো চরিত্র শুধু পুতুল ছিল না, তারা হয়ে উঠেছিল মানুষের পরিচিত সঙ্গী। বিশেষ করে পারুল চরিত্রটি বাংলাদেশের শিশুদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পারুলের মাধ্যমে তিনি সাহস, আশা এবং মানবতার কথা তুলে ধরেছিলেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় মুস্তাফা মনোয়ার মানুষের কষ্ট খুব কাছ থেকে দেখেছেন। বিশেষ করে শরণার্থী শিবিরে শিশুদের ভয়, দুঃখ ও অসহায়তা তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল। তিনি বুঝেছিলেন, যুদ্ধ শুধু ঘরবাড়ি ধ্বংস করে না, শিশুদের হাসিও কেড়ে নেয়। সেই শিশুদের মুখে একটু আনন্দ ফিরিয়ে আনতে তিনি শরণার্থী শিবিরেই পাপেট শো আয়োজন করেন। এটি ছিল তাঁর শিল্পজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক অধ্যায়। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, শিল্প শুধু বিনোদনের জন্য নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্যও। বাংলাদেশের টেলিভিশন ইতিহাসেও মুস্তাফা মনোয়ারের নাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের সঙ্গে দীর্ঘ সময় যুক্ত ছিলেন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল তাঁর সৃষ্টিশীলতা। তিনি বিশ্বাস করতেন, টেলিভিশন মানুষের চিন্তা ও সংস্কৃতিকে গড়ে তুলতে পারে। ১৯৭২ সালে শিশুদের প্রতিভা বিকাশের লক্ষ্যে শুরু হওয়া জনপ্রিয় অনুষ্ঠান নতুন কুঁড়ি তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। এই অনুষ্ঠান বাংলাদেশের অসংখ্য শিশুর প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ তৈরি করে। তিনি মনে করতেন, শিশুদের ভেতরে থাকা প্রতিভাকে ভালোবাসা ও উৎসাহ দিয়ে সামনে আনতে হয়। এই কারণেই নতুন কুঁড়ি শুধু একটি অনুষ্ঠান ছিল না, এটি ছিল একটি প্রজন্ম তৈরির মাধ্যম। শিল্পকলায় অসামান্য অবদানের জন্য মুস্তাফা মনোয়ার বহু পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯৫৭ সালে কলকাতার একাডেমি অব ফাইন আর্টস আয়োজিত প্রদর্শনীতে গ্রাফিক্স শাখায় তিনি স্বর্ণপদক লাভ করেন।
১৯৫৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা প্রদর্শনীতে তেলচিত্র ও জলরং শাখায় দুটি স্বর্ণপদক অর্জন করেন। ২০০৪ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে শিল্পকলায় অবদানের জন্য একুশে পদক প্রদান করে।
তবে তাঁর সবচেয়ে বড় পুরস্কার ছিল মানুষের ভালোবাসা। মুস্তাফা মনোয়ার চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি আজও বেঁচে আছে। তাঁর পাপেট, তাঁর ছবি, তাঁর অনুষ্ঠান এবং তাঁর শিল্পভাবনা আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে। তিনি রঙ দিয়ে গল্প লিখেছেন। তিনি পুতুল দিয়ে জীবন দেখিয়েছেন। তিনি শিশুদের হাসির মধ্যে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছেন। পাপেটের জাদুকর মুস্তাফা মনোয়ার শুধু একজন শিল্পী নন, তিনি বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল অধ্যায়। সত্যিকারের শিল্পীরা কখনো হারিয়ে যান না। তাঁরা বেঁচে থাকেন তাঁদের সৃষ্টি, তাঁদের চিন্তা এবং মানুষের ভালোবাসার মধ্যে!























































