গতকাল ৫ই জুন বিশ্বজুড়ে পালিত হলো বিশ্ব পরিবেশ দিবস| যখন বিশ্বব্যাপী জলবায়ুর চরম বিপর্যয় রোধে ‘কার্বন নির্গমন কমানো’ এবং ‘সবুজ অর্থায়নে’র স্লোগান চলছে, তখন এক নির্মম সত্য আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে—বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, গণহত্যা আর লাগামহীন সামরিক প্রতিযোগিতা পৃথিবীর ফুসফুসকে বিষাক্ত করে তুলছে| সাম্প্রতিক সময়ে তাই বিশ্বজুড়ে একটি অত্যন্ত যৌক্তিক আওয়াজ উঠেছে: যুদ্ধ ও গণহত্যা বন্ধ করো, এবং জলবায়ু তৎপরতাকে ‘বেসামরিকীকরণ’ করো|
আমরা এমন এক অদ্ভুত পৃথিবীতে বাস করছি, যেখানে একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলো অর্থায়নের জন্য হাত পাতছে, অন্যদিকে যুদ্ধের পেছনে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের জল্লাদখানা সাজানো হচ্ছে| বিশ্বমঞ্চে পরিবেশ রক্ষার বড় বড় বুলি আওড়ানো দেশগুলোর আসল রূপ উন্মোচিত হয়ে পড়ে যখন দেখা যায়—বিশ্বের শীর্ষ ৬০টি সামরিক ব্যয়কারী দেশের বেশির ভাগই তাদের সামরিক খাতের গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের আসল তথ্য সুকৌশলে লুকিয়ে রাখে| যুদ্ধবিমান, ট্যাংক, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন এবং সামরিক মহড়ায় যে বিপুল পরিমাণ জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো হয়, তা ˆবশ্বিক উষ্ণায়নের অন্যতম প্রধান অনুঘটক| অথচ এই ধ্বংসাত্মক খাতের কার্বন ফুটপ্রিন্টকে হিসাবের বাইরে রেখে জলবায়ু মোকাবিলার যেকোনো আলোচনা কেবলই এক চরম ভণ্ডামি|
শীর্ষ নির্গমনকারী (সামগ্রিক) একক দেশ হিসেবে চীন একাই ˆবশ্বিক কার্বন নির্গমনের ৩২ ভাগ করে| এরপরই দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের অবদান ১৩ ভাগ| সামগ্রিক পরিমাণের বাইরে যদি মাথাপিছু বা জনপ্রতি কার্বন নির্গমনের দিকে তাকানো হয়, তবে কাতার, বাহরাইন ও কুয়েতের মতো মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো সবার ওপরে রয়েছে|
এই পরিসংখ্যান আমাদের একটি পরিষ্কার বার্তা দেয়—উন্নয়ন ও বিলাসিতার যে খতিয়ান আমরা ˆতরি করছি, তার মূল্য চুকাতে হচ্ছে পুরো মানবজাতিকে| চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তিগুলো একদিকে যেমন ˆবশ্বিক কার্বন নির্গমনের সিংহভাগের জন্য দায়ী, অন্যদিকে তাদের ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্যের লড়াই ও সামরিক বাজেট বৃদ্ধির প্রতিযোগিতাও আকাশচু¤^ী|
সামরিক খাতে ব্যয় করা ট্রিলিয়ন ডলার যদি জলবায়ু অর্থায়নে স্থানান্তর করা যেত, তবে আজ বিপন্ন দ্বীপ রাষ্ট্রগুলো কিংবা বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে প্রতি বছর জলবায়ু তহবিলের জন্য ধরনা দিতে হতো না| যুদ্ধের পেছনে ব্যয় করা অর্থের সামান্য অংশও যদি পুনর্ব্যবহারযোগ্য শক্তি এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনে ব্যয় হতো, তবে পৃথিবী আজ এতটা বাসঅযোগ্য হতো না|
পরিবেশ দিবসের মূল দাবি হওয়া উচিত একটাই—কেবল কাগজের কলমে জলবায়ু চুক্তির বুলি আউড়ে কার্বন নির্গমন কমানো যাবে না| যদি আমরা সত্যিই পৃথিবীকে বাঁচাতে চাই, তবে যুদ্ধের বারুদ স্তিমিত করতে হবে| সামরিক খাতের কার্বন নির্গমনের তথ্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং যুদ্ধ খাতের বাজেট কেটে তা জলবায়ু তহবিলে রূপান্তর করতে হবে| যুদ্ধ আর জলবায়ু বিপর্যয় দুটি ভিন্ন সংকট নয়, এরা একে অপরের পরিপূরক| তাই টেকসই ভবিষ্যতের ¯^ার্থে বিশ্বনেতাদের যুদ্ধবাজ মানসিকতা পরিহার করে ধরিত্রী রক্ষায় একযোগে কাজ করার এখনই সময়|
এ মুহূর্তের সংবাদ


















































