এ মুহূর্তের সংবাদ

এস আলম গ্রুপের ১১ কর্ণধারের বিরুদ্ধে ৫ মাসের সাজা পরোয়ানা

বাস কেনার নামে ৮০ কোটি টাকা লুট

নিজস্ব প্রতিবেদক »

বাস কেনার নামে ইসলামী ব্যাংক থেকে নেওয়া প্রায় ৮০ কোটি টাকার ঋণ ফেরত না দেওয়ায় এস আলম গ্রুপের ১১ কর্ণধারের বিরুদ্ধে পাঁচ মাসের সাজা পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত।

আজ বৃহষ্পতিবার (২১ মে) চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালত-১ এর বিচারক মো. হেলাল উদ্দিন এ আদেশ দেন। আলোচিত এই মামলাটি দেশের ব্যাংক খাতে বহুল আলোচিত এস আলম গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারির নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সাজা পরোয়ানাপ্রাপ্তরা হলেন— এস আলম গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ওজি ট্রাভেলস লিমিটেডের চেয়ারম্যান গোফরানুল আলম, ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাকিম আলী, এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম, তার সহোদর ওসমান গনি, মো. রাশেদুল আলম, আব্দুস সামাদ, মো. আব্দুল্লাহ হাসান, শহিদুল আলম, স্ত্রী ফারজানা বেগম, ভাইয়ের স্ত্রী ফারজানা পারভীন ও ছেলে আহসানুল আলম।

মামলার নথি ও ইসলামী ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৩ সালের ২০ ডিসেম্বর ১৩৪টি বিলাসবহুল হিনো বাস কেনার জন্য ওজি ট্রাভেলস লিমিটেডকে ১০৯ কোটি ৪২ লাখ ২৪ হাজার টাকার বিনিয়োগ অনুমোদন দেয় ইসলামী ব্যাংক। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ১০ মার্চ থেকে ৮ জুলাই পর্যন্ত আট দফায় নাভানা গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান আফতাব অটোমোবাইলস লিমিটেডের অনুকূলে ৮৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা ছাড় করা হয়। অর্থ ছাড় দেওয়া হয় ইসলামী ব্যাংকের চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ করপোরেট শাখা থেকে।

চুক্তি অনুযায়ী ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাসগুলো সরবরাহ করার কথা থাকলেও দুই বছর পার হয়ে গেলেও একটি বাসও বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। ফলে ব্যাংকের বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়ে। এরই মধ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এস আলম গ্রুপের শীর্ষ কর্মকর্তারা আত্মগোপনে চলে গেলে ঋণ আদায় আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

এ অবস্থায় পাওনা অর্থ উদ্ধারে গত বছরের ২৬ আগস্ট ওজি ট্রাভেলস লিমিটেড ও আফতাব অটোমোবাইলস লিমিটেডের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালত-১ এ মামলা করে ইসলামী ব্যাংক। মামলার নম্বর ৫৮৪/২৫। মামলার হিসাবে, চলতি বছরের ২৩ আগস্ট পর্যন্ত ব্যাংকের পাওনা দাঁড়িয়েছে ৮০ কোটি ৬১ লাখ ৬০ হাজার ৭৬১ টাকা।

মামলায় এস আলম গ্রুপের সংশ্লিষ্টদের পাশাপাশি আফতাব অটোমোবাইলসের পরিচালক সফিউল ইসলাম, খালেদা ইসলাম, সাজেদুল ইসলাম ও মিয়া সেলিম শেখকেও মোকাবেলা বিবাদি করা হয়েছে।

এর আগে গত ৯ নভেম্বর আদালত মামলার রায়ে ৬০ দিনের মধ্যে পুরো পাওনা অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দেন।রায়ে আদালত উল্লেখ করেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ পরিশোধ না হলে অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩ এর ৫০(২) ধারা অনুযায়ী সুদসহ অর্থ আদায়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।

নির্দেশনা অনুযায়ী ঋণ শোধ না করায় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অর্থ জারি মামলা (২০/২০২৬) দায়ের করে ব্যাংক। জারি মামলায় সর্বশেষ আদালত এই সাজা পরোয়ানা জারি করলেন।

অর্থঋণ মামলার পাশাপাশি প্রতারণার অভিযোগে চট্টগ্রাম চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতেও পৃথক একটি ফৌজদারি মামলা করেছে ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকের অভিযোগ, পুরো অর্থ ছাড়ের পরও বাস সরবরাহ না করে ঋণগ্রহীতা ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পরিকল্পিতভাবে ব্যাংকের সঙ্গে প্রতারণা করেছে।

ইসলামী ব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও খাতুনগঞ্জ করপোরেট শাখার ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন বলেন, “চুক্তি অনুযায়ী বাসগুলো সরবরাহ করা হলে সেগুলো ব্যাংকের নামে নিবন্ধন হওয়ার কথা ছিল। এতে ঋণের বিপরীতে কোলাটারেল সিকিউরিটি নিশ্চিত হতো। কিন্তু গাড়ি সরবরাহ না হওয়ায় পুরো বিনিয়োগ এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।”

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিতর্কিত শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের বিভিন্ন ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে শুধু ইসলামী ব্যাংক থেকেই নেওয়া হয়েছে প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে বহুদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে গ্রুপটি।

এদিকে একসময় চট্টগ্রাম-কক্সবাজারসহ বিভিন্ন রুটে প্রভাব বিস্তারকারী এস আলম পরিবহনের অবস্থাও এখন অনেকটাই দুর্বল। আগে যেখানে প্রায় ২০০ বাস চলাচল করত, বর্তমানে তা নেমে এসেছে ১০০টিরও নিচে। প্রশাসনিক নির্দেশনার পর গত চার মাস ধরে চট্টগ্রাম নগরের সিনেমা প্যালেস এলাকা থেকেও তাদের বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে।

তবে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে এস আলম গ্রুপের কর্ণধার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।