জি এম ফরহাদ সরওয়ার »
রাষ্ট্রের বাজেটে অর্থ সীমিত। একই অর্থ দিয়ে বেতন-ভাতা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, সামাজিক নিরাপত্তা, অবকাঠামো, যোগাযোগ ও উন্নয়ন প্রকল্প—সবকিছু পরিচালনা করতে হয়।
রাজস্ব আয় যদি প্রত্যাশা অনুযায়ী না বাড়ে এবং অনিবার্য পরিচালন ব্যয় দ্রুত বাড়তে থাকে, তাহলে বাজেটের একটি বড় অংশ চলে যেতে পারে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য অনুন্নয়ন খাতে। এতে উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য সরকারের হাতে তুলনামূলকভাবে কম অর্থ থাকতে পারে।
এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। কারণ একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ শুধু সরকারি কর্মচারীদের বর্তমান আয় বৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে না; ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্পায়ন, অবকাঠামো ও বিনিয়োগ সক্ষমতার ওপরও নির্ভর করে।
তাহলে কি বেতন বাড়ানো হবে না?
অবশ্যই বেতন বাড়ানো যেতে পারে এবং প্রয়োজন হলে বাড়াতেই হবে। কিন্তু সেটি হতে হবে রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং ধাপে ধাপে।
একসঙ্গে বিশাল ব্যয় বাড়ানোর পরিবর্তে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি বন্ধ, কর প্রশাসনের ডিজিটালাইজেশন এবং বড় করদাতাদের কাছ থেকে কার্যকর রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করতে হবে।
এর পাশাপাশি সরকারি ব্যয়ের অপচয় কমাতে হবে। প্রকল্প ব্যয়ে স্বচ্ছতা, অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বেতন বাড়লে জবাবদিহিও বাড়তে হবে। উচ্চতর বেতন কাঠামোর সঙ্গে কর্মদক্ষতা, উপস্থিতি, সেবার মান, দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থা এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।
চারটি সংস্কার একসঙ্গে প্রয়োজন
বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে যৌক্তিক পথ হতে পারে—বেতন সংস্কার, রাজস্ব সংস্কার, ব্যয় সংস্কার এবং পেনশন সংস্কার—এই চারটি বিষয়কে একই কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা।
শুধু বেতন বাড়িয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হবে না। সেই বেতন দেওয়ার মতো রাজস্ব কাঠামোও তৈরি করতে হবে। আবার রাজস্ব বাড়ালেই হবে না; ব্যয়ের ক্ষেত্রেও দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বর্তমান প্রজন্মের সুবিধা নিশ্চিত করতে গিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর অযৌক্তিক দায় চাপানো যাবে না।
শেষ কথা: বেতন বাড়ুক, রাষ্ট্র যেন দুর্বল না হয়
সরকারি কর্মচারীরা ভালো থাকবেন—এটি অবশ্যই কাম্য। তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে, ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে, দক্ষ জনবল রাষ্ট্রে ধরে রাখা যাবে—এটিও প্রয়োজন।
কিন্তু রাষ্ট্রের সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলে সেটি শেষ পর্যন্ত কর্মচারী, সরকার কিংবা জনগণ—কারও জন্যই ভালো ফল বয়ে আনবে না।
তাই বেতন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের আগে সরকারের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত—এই অতিরিক্ত ব্যয় কীভাবে স্থায়ীভাবে বহন করা হবে?
রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলে কী হবে? উন্নয়ন ব্যয়ে চাপ পড়বে কি না? ঋণের বোঝা কতটা বাড়বে? আগামী ২০-৩০ বছরে পেনশন ও বেতন বাবদ রাষ্ট্রের দায় কত দাঁড়াবে?
এই প্রশ্নগুলোর স্বচ্ছ উত্তর জনগণের সামনে থাকা দরকার।
কারণ বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত শুধু আজকের সরকারি কর্মচারীর পকেটের বিষয় নয়; এটি আগামী দিনের রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিরও বিষয়।
বেতন বাড়ুক, মানুষের জীবনমান বাড়ুক—কিন্তু সেই বেতন যেন রাষ্ট্রের আর্থিক ভিত্তিকে দুর্বল না করে।
লেখক : চিফ রিলেশনশিপ অফিসার, ব্যাংকিং অ্যান্ড স্ট্র্যাটিজিক লিডারশিপ প্রফেশনাল, সিপিডিএল




















































