সুপ্রভাত ডেস্ক »
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচির দিন সকাল পর্যন্ত চট্টগ্রামের পরিস্থিতি ছিল অনেকটাই থমথমে। বড় কোনো কর্মসূচি ছিল না। আন্দোলনকারী ও সাধারণ মানুষের দৃষ্টি ছিল রাজধানী ঢাকার দিকে। সকালেও ইন্টারনেট সংযোগ সচল থাকলেও বেলা ১১টার দিকে হঠাৎ তা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
কিছুক্ষণ পর বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে সেনাপ্রধানের জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার ঘোষণা প্রচার হতে শুরু করে। তখনই নগরজুড়ে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে, দেশে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে।
দুপুর আড়াইটার দিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মুহূর্তেই বদলে যায় চট্টগ্রামের চিত্র। বাসাবাড়ি, অফিস ও দোকানপাট থেকে মানুষ দলে দলে রাজপথে নেমে আসেন। হাতে জাতীয় পতাকা, মুখে বিজয়ের স্লোগান। নগরীর বিভিন্ন মোড়ে মিষ্টি বিতরণ হয়। অপরিচিত মানুষ একে অপরকে আলিঙ্গন করেন। অনেককে আনন্দে কাঁদতেও দেখা যায়। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে থমথমে চট্টগ্রাম পরিণত হয় বিজয়ের উৎসবে মুখর এক নগরীতে।
বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, শ্রমিক, রিকশাচালক, অভিভাবকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিজয় মিছিলে যোগ দেন। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত নগরীর প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সড়কই ছিল মানুষের দখলে।
পুলিশ শূন্য থানায় শুরু হয় হামলা
প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ ও দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর নিরাপত্তাজনিত আশঙ্কায় নগরীর বিভিন্ন থানা থেকে পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যরা সরে যান। অনেক এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দা ও আন্দোলনে অংশ নেওয়া মানুষ পুলিশ সদস্যদের নিরাপদে চলে যেতে সহায়তা করেন। তবে কোথাও কোথাও পুলিশের ওপর চডাও হয় বিক্ষুব্ধ লোকজন।
অন্যদিকে, পুলিশের অনুপস্থিতির সুযোগে সংঘবদ্ধ দুর্বৃত্তরা বিভিন্ন থানায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। ওইদিন প্রায় সবকটি থানায় হামলার চেষ্টা করা হয়। তবে কোনো কোনো এলাকায় সচেতন লোকজনের বাধার মুখে সম্ভব হয়নি। যদিও কয়েকটি এলাকায় পরিস্থিতি একেবারে নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। ওইদিন চট্টগ্রামের কোতোয়ালী, ডবলমুরিং, পতেঙ্গা, পাহাড়তলী ও লোহাগাড়াসহ বিভিন্ন থানার কক্ষ, নথিপত্র ও আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয়। কয়েকটি থানায় অগ্নিসংযোগ করা হয়। কিছু স্থানে অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদও নিয়ে যাওয়া হয়।
সরকার পতনের খবর নিশ্চিত হওয়ার পর নগরীর দারুল ফজল মার্কেটে অবস্থিত মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। বহদ্দারহাট, চাক্তাই ও খাতুনগঞ্জ এলাকার কয়েকটি ওয়ার্ড কার্যালয়েও হামলার ঘটনা ঘটে। একই সময়ে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের চশমা হিলের বাসভবন, তৎকালীন মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীর বাসভবন এবং পটিয়ার সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক হুইপ সামশুল হক চৌধুরীর বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন স্থানে ব্যক্তিগত গাড়ি ও আসবাবপত্রে আগুন দেওয়া হয়।
৫ আগস্টের ঘটনার পরদিন ৬ আগস্ট সকাল থেকে নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে নামেন আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা। জিইসি মোড়, টাইগারপাস, আগ্রাবাদ, মুরাদপুর, ও আর নিজাম রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় তারা যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করেন। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের চলাচল স্বাভাবিক রাখতে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
একই সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপাসনালয়ে যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে জন্য বিভিন্ন এলাকায় পাহারার ব্যবস্থা করেন শিক্ষার্থীরা। নগরীর জেএমসেন হল, ঢালঘাটসহ বিভিন্ন মন্দির এবং কয়েকটি গির্জার সামনে তাঁদের অবস্থান নিতে দেখা যায়। কোথাও কোথাও মাইকিং করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং সরকারি সম্পদ রক্ষার আহ্বানও জানানো হয়।
আগ্রাবাদ এলাকার বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আবদুল কাদের বলেন, আমার জীবনে এমন দিন আর দেখিনি। দুপুর পর্যন্ত সবাই অপেক্ষায় ছিল। বিকেলে মানুষ আনন্দে রাজপথে নেমে আসে।
চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষার্থী সাদমান হোসেন বলেন, সরকার পতনের খবরের পর মানুষের আনন্দ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। কিন্তু পরবর্তীতে আমরা উপলব্ধি করি, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে। তাই সহপাঠীদের নিয়ে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে নামি। আমাদের কেউ কেউ উপাসনালয় পাহারার দায়িত্বও পালন করে।



















































