নিজস্ব প্রতিবেদক »
ব্রেইন স্ট্রোকের পর কিডনিতে পাথর। শরীরের একের পর এক জটিলতা, সঙ্গে চরম অর্থকষ্ট। এমনকি মাথা গোঁজার ঘরটিও বৃষ্টির সময় বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। জীবনের এমন কঠিন বাস্তবতায় চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতে না পেরে শেষ আশ্রয় হিসেবে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেছিলেন মোঃ মনির উদ্দিন। সেই আবেদনেই মিলেছে মানবিক সাড়া।
চট্টগ্রামের পাঠানটুলী রোডের মরহুম রাজা মিয়া ও মোস্তফা খাতুন দম্পতির ছেলে মনির উদ্দিন। পরিবহন শ্রমিক হিসেবে পরিবার নিয়ে সুখে-শান্তিতে জীবনযাপন করছিলেন তিনি। কিন্তু গত ১৫ মে ২০২৫ হঠাৎ ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হলে তাঁর জীবনে অন্ধকার নেমে আসে। ধারদেনা করে চট্টগ্রাম মা-শিশু ও জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নেন তিনি। পরে অর্থ সংকটের কারণে নিয়মিত ওষুধ চালিয়ে যেতে পারেননি।
শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসক ডা. মোঃ কামরুল হাসানের শরণাপন্ন হন মনির উদ্দিন। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যায়, তাঁর কিডনিতে পাথর হয়েছে এবং দ্রুত অপারেশন প্রয়োজন। কিন্তু অপারেশনের ব্যয়ভার বহনের মতো সামর্থ্য ছিল না তাঁর।
এরপর চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা চেয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন মনির উদ্দিন। আবেদন নিয়ে আজ বৃহস্পতিবার (২১ মে) সারা দেশে মানবিক ডিসি হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার সঙ্গে দেখা করলে শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন গ্রহণ করেই দায়িত্ব শেষ করেননি তিনি। ব্যস্ততার মাঝেও ধৈর্য নিয়ে মনির উদ্দিনের কষ্টের কথা শোনেন জেলা প্রশাসক নিজেই। খোঁজ নেন তাঁর পরিবারের সদস্যদের, জানতে চান সংসারের বর্তমান অবস্থা ও চিকিৎসার বিষয়ে।
পরে তাৎক্ষণিকভাবে মনির উদ্দিনের চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন তিনি।
এ বিষয়ে মনির উদ্দিন বলেন, “ডিসি স্যার তাঁর ব্যস্ততার মাঝেও আমাকে দীর্ঘক্ষণ সময় দিয়েছেন। আমার কষ্টের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। আমার মতো একজন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন—এটাই আমার জন্য অনেক বড় পাওয়া।”
মনির উদ্দিনের স্ত্রী আসমা আক্তার বলেন, “স্বামীর চিকিৎসার ব্যবস্থা করার জন্য অনেক মানুষের কাছে গিয়েছি। কিন্তু আশানুরূপ সাহায্য পাইনি। আজ আমার ভাতিজা তারেক হোসেনের সঙ্গে ডিসি স্যারের কাছে যাই। ডিসি স্যার আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, সাধ্যমতো সহায়তা করেছেন। আমরা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ।”
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির চট্টগ্রাম শাখার সাধারণ সম্পাদক অলি আহম্মেদ বলেন, “এই ডিসি স্যার সব সময় অসহায়, গরিব ও প্রতিবন্ধী মানুষের পাশে দাঁড়ান। তাই গত বুধবার সড়ক নিরাপত্তা দিবসের অনুষ্ঠানে স্যারকে অনুরোধ করেছিলাম মনির উদ্দিনকে সহায়তা করার জন্য। সে অনুযায়ী আজ মনির উদ্দিন তার ভাতিজা তারেক হোসেনকে সাথে নিয়ে ডিসি স্যারের সঙ্গে দেখা করলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসা সহায়তা দেন।”
তিনি আরও বলেন, “ডিসি স্যার সত্যিই একজন মানবিক জেলা প্রশাসক। আগে অন্যদের মুখে শুনেছি, আজ নিজেই তার প্রমাণ পেলাম।”
স্থানীয়রা বলছেন, প্রশাসনিক দায়িত্বের বাইরে গিয়ে অসহায় মানুষের ব্যক্তিগত দুর্দশার কথা ধৈর্যসহকারে শোনা, পরিবারের খোঁজ নেওয়া এবং তাৎক্ষণিক সহায়তা করা মানবিক প্রশাসনের অনন্য উদাহরণ।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই জনবান্ধব ও ব্যতিক্রমী নানা উদ্যোগের কারণে আলোচনায় রয়েছেন মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। অসুস্থ পরিবহন শ্রমিক মনির উদ্দিনের পাশে দাঁড়ানোর ঘটনাও সেই মানবিক প্রশাসনিক ধারাবাহিকতার আরেকটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল।
















































