সুপ্রভাত ডেস্ক »
বাংলাদেশে পাপেটের প্রবর্তক শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই। পাপেট- টিভি-চিত্রকলা বহু মাধ্যম নিয়ে কাজ করেছেন একুশে পদকপ্রাপ্ত এই গুণী শিল্পী।
আজ ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। সবশেষ নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গত ১৪ই জুন তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।
কেমন ছিলো তার জীবন?
চারুকলায় পড়াশোনা করলেও মুস্তাফা মনোয়ার পেশা হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন টেলিভিশনকে। কিন্তু চিত্রকলা, নির্দেশনা বা শিশুদের নানা অনুষ্ঠানের বাইরে পাপেট ছিল তার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি পাপেট নিয়ে কাজ করেছেন। তৈরি করেছেন অসংখ্য নতুন অনুসারী ও গুণগ্রাহী।
পড়াশোনা এবং কিছুদিন শিক্ষকতা করলেও, পেশা হিসাবে মুস্তাফা মনোয়ার বেছে নিয়েছিলেন টেলিভিশনকে। তার বর্ণাঢ্য পেশাজীবনে তৈরি করেছেন রক্তকরবী ও মুখরা রমণী বশীকরণের মতো অসংখ্য নাটক, নতুন কুড়ি, মনের কথার মতো নানা অনুষ্ঠান।
বিশেষ করে শিশুদের সহজে ছবি আঁকার জন্যে তিনি যেমন অনুষ্ঠান করেছেন, শিশুদের জন্য নানা অনুষ্ঠানের পরিকল্পনাও করেছেন।
পরবর্তীকালে মুখরা রমণী বশীকরণ বা রক্তকরবীর মতো টিভিতে যেসব নাটক তৈরি করেছেন, স্টুডিওর ছোট জায়গার মধ্যে যে চমৎকার সেট তৈরি করেছিলেন, তা ছিল অসাধারণ।
মুস্তাফা মনোয়ারের জন্ম পহেলা সেপ্টেম্বর ১৯৩৫ সালে। মাগুরা জেলার শ্রীপুরে তারা নানার বাড়িতে। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। তার বাবা গোলাম মোস্তফা ছিলেন বাংলাদেশের বিখ্যাত কবিদের মধ্যে একজন।
কলকাতার শিশু বিদ্যাপীঠে তার পড়াশোনার হাতেখড়ি। পরে নারায়ণগঞ্জের একটি বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাসের পর কলকাতায় স্কটিশ চার্চ কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু সেখানে পড়াশোনা শেষ না করে ভর্তি হন কলকাতার চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে এবং ফাইন আর্টসে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন। যদিও চিত্রকলায় তাকে কম সময় দিতেই দেখা গেছে। চিত্রকলায় সময় কম দিলেও, যেটুকু এঁকেছেন, তার গুরুত্বও অনেক।
কিন্তু শুধু ছবি আঁকার মধ্যে তিনি নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং উনি যে টেলিভিশনে গিয়েছেন, এর মাধ্যমে তিনি সেই শিল্পকলার সব মাধ্যমে অবদান রেখেছেন। চিত্রকলার ক্ষেত্রে জলরং এবং ড্রয়িং, এই দুইটি জায়গা ছিল তার বিচরণ ক্ষেত্র।
১৯৭১ সালের ২৩শে মার্চের ঘটনা
মুস্তাফা মনোয়ারের অনেক ব্যতিক্রমী আর সাহসী ঘটনার একটি সাক্ষী ছিলেন তাঁর একসময়কার সহকর্মী কেরামত মওলা।
কেরামত মওলা বলেন, ”২৩শে মার্চ পাকিস্তানের জাতীয় দিবস ছিল। তখন নিয়ম ছিল, অনুষ্ঠানের শেষে পতাকা উড়াতে হবে। সেদিন অনুষ্ঠান শেষ হবার কথা রাত ১০ টায়। টেলিভিশন স্টেশনের বাইরে আর্মি, পুলিশের লোকজন ছিল। কিন্তু মুস্তাফা মনোয়ারের পরিকল্পনায় আমরা অনুষ্ঠান লম্বা করে শেষ করলাম রাত ১২টার পর। এরপর পতাকা না দেখিয়েই অনুষ্ঠান শেষ করে দেয়া হয়।”
বাংলাদেশ টেলিভিশনের পর শিল্পকলা একাডেমী, এফডিসি, জাতীয় গণমাধ্যম ইন্সটিটিউটের নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকলেও, পাপেট ছিল তার ধ্যানজ্ঞান।
মুস্তাফা মনোয়ারের তৈরি করা পাপেট চরিত্র, পারুল বাংলাদেশে একসময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। দ্বিতীয় সাফ গেমসের মিশুক তার পরিকল্পনাতেই তৈরি হয়েছিল।
পাপেটের প্রবর্তক
মুস্তাফা মনোয়ারকে বাংলাদেশে পাপেটের প্রবর্তক বলা যেতে পারে, যিনি সম্পূর্ণ দেশীয় ঘরানায় পাপেট তৈরি করেছেন।
ধানমণ্ডিতে নিজের বাড়ির দোতলায় আছে ছোট্ট একটি পাপেট ওয়ার্কশপ। অন্যান্য কাজ থেকে অবসর নিলেও, শেষদিন পর্যন্ত দিনের বেশিরভাগ সময় সেখানেই পাপেট নিয়ে তাঁর নানা পরীক্ষানিরীক্ষা চলতো।
মুস্তাফা মনোয়ার নিজে আর পাপেট তৈরি করবেন না হয়তো, কিন্তু তিনি যে পাপেটের ধারা তৈরি করে গেছেন, যাদের ভেতরে পাপেটের প্রতি আর ছবির প্রতি ভালোবাসা প্রথিত করে গেছেন, তার সেই কাজের মধ্যেই তিনি অমর হয়ে থাকবেন।
সূত্র: বিবিসি বাংলা


















































