মতামত সম্পাদকীয়

ঘন ঘন ভূমিকম্পের সর্তকবার্তা ও বাংলাদেশের প্রস্তুতি

সম্প্রতি ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা শক্তিশালী ভূমিকম্পটি আমাদের আরও একবার মনে করিয়ে দিয়েছে যে, প্রকৃতির রুদ্ররূপের সামনে মানুষের তৈরি অবকাঠামো কতটা ভঙ্গুর। ভেনেজুয়েলার সেই কম্পনে ঘরবাড়ি ধসে পড়া, অবকাঠামোগত ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এবং জনগণের মধ্যে তৈরি হওয়া তীব্র আতঙ্ক কেবল একটি দূরবর্তী দেশের চিত্র নয়; এটি বাংলাদেশের জন্য একটি জ্বলন্ত সর্তকবার্তা। বিশেষ করে যখন আমাদের নিজস্ব পরিসংখ্যান বলছে, গত ছয় মাসে দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে ৩২টি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে, যার মধ্যে কেবল চলতি জুনেই হয়েছে ছয়টি। মৃদু বা মাঝারি মাত্রার এই ঘন ঘন ঝাঁকুনিগুলো আসলে কোনো সাধারণ ঘটনা নয়; ভূতাত্ত্বিকদের মতে, এগুলো ভবিষ্যতে ধেয়ে আসা কোনো বড় দুর্যোগের আগাম পূর্বাভাস বা ‘উত্তেজক সঙ্কেত’।
বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে ইন্ডিয়ান, ইউরেশিয়ান ও বার্মা প্লেটের সংযোগস্থলের কাছাকাছি অবস্থিত। ফলে যেকোনো সময় এখানে রিখটার স্কেলে ৭ বা তার চেয়ে বড় মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানার তীব্র ঝুঁকি রয়েছে। ভেনেজুয়েলার ক্ষয়ক্ষতির চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে মূলত অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং দুর্বল নির্মাণশৈলীর কারণেই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বহুগুণ বেশি। রাজধানী ঢাকা বা বন্দর নগরী চট্টগ্রামের মতো মেগাসিটিগুলোতে যেভাবে নিয়মকানুনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একের পর এক বহুতল ভবন গড়ে উঠছে, তাতে বড় কোনো কম্পন আঘাত হানলে তা এক ভয়াবহ মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ে রূপ নেবে। সরু গলি, গ্যাস ও বিদ্যুতের তারের জটলা এবং জলাশয় ভরাট করে তৈরি করা দুর্বল ভিত্তির ভবনগুলো একেকটি মৃত্যুফাঁদ।
এই আসন্ন বিপদ থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়, তবে সঠিক প্রস্তুতি ও পরিকল্পনার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনা অবশ্যই সম্ভব। উত্তরণের প্রথম ও প্রধান উপায় হলো ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড’ বা ইমারত নির্মাণ বিধিমালার কঠোর বাস্তবায়ন। নতুন যেকোনো ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে ভূমিকম্প-সহনীয় প্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে কোনো ছাড় দেওয়া চলবে না। একই সঙ্গে, ঝুঁকিপূর্ণ পুরনো ভবনগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোকে ‘রেট্রোফিটিং’ বা শক্তিশালীকরণের আওতায় আনতে হবে অথবা ভেঙে ফেলতে হবে।
দ্বিতীয়ত, দুর্যোগ-পরবর্তী উদ্ধারকাজের সক্ষমতা বহুগুণ বাড়াতে হবে। ভূমিকম্পের পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা বা ‘গোল্ডেন আওয়ার্স’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে আরও আধুনিক ও ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে সজ্জিত করতে হবে, যাতে ধসে পড়া ভবনের নিচ থেকে দ্রুত মানুষকে উদ্ধার করা যায়। সরু গলির কারণে যেখানে বড় গাড়ি পৌঁছাতে পারে না, সেখানে বিকল্প উদ্ধারকৌশল প্রস্তুত রাখা জরুরি।
তৃতীয়ত, গণসচেতনতা বৃদ্ধি। স্কুল, কলেজ, অফিস এবং কমিউনিটি পর্যায়ে নিয়মিত ‘মক ড্রিল’ বা ভূমিকম্পের মহড়া পরিচালনা করতে হবে। সাধারণ মানুষ যেন জানে কম্পন শুরু হলে ঠিক কী করতে হবে, কোথায় আশ্রয় নিতে হবে এবং কীভাবে আতঙ্কিত না হয়ে ধৈর্য ধরতে হবে।
ভেনেজুয়েলার ক্ষয়ক্ষতি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, প্রকৃতির নিয়মে কোনো ছাড় নেই। জুনের ছয়টি কম্পন আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে। ঘুমিয়ে থাকার বা উদাসীনতার সময় আর নেই। সরকারের নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক—সবাইকে এখনই সমন্বিতভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে। আজ আমরা যদি সচেতন না হই, তবে আগামীকালের একটি বড় বিপর্যয় আমাদের পুরো জাতীয় অগ্রগতিকে স্তব্ধ করে দিতে পারে। সময় থাকতেই সাবধান হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

-advertise-