ফিচার শিল্প-সাহিত্য

সক্রেটিসের কষ্ট

বিশ্বজিৎ মণ্ডল »

সকাল থেকে টাঙা নিয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে সক্রেটিস।
আজ কোন ভাড়া পায়নি।
এমনটা নতুন নয়, মাঝে মাঝেই এমন উপোসী দিন যায়। শয়ে শয়ে পর্যটক এলেও, টাঙা গাড়ির দিকে সকলে এগিয়ে আসে না। বিশেষ পছন্দ যাদের, তারাই এ গাড়ির খোঁজ করে। কিন্তু আজ তেমন হৃদয়বান আরোহী এগিয়ে আসেনি।
লালবাগ সংলগ্ন বেগমগঞ্জের বাসিন্দা সক্রেটিস। বাপের দেওয়া নাম সক্রেটিস খান। এই নাম শুনে অধিকাংশই কৌতূহলের চোখে তাকায়। সক্রেটিস লজ্জা পায়।
এ সক্রেটিস ইতিহাসখ্যাত, বিশ্ববন্দিত চরিত্র নয়। টানা পোড়েনের চোরা গর্তে মুখ লুকানো দেহাতি সক্রেটিস। সামান্য রোজকারে তিন তিনটে পেট পালতে হয়। বাপের জমি জিরেত বলে কিছু ছিল না। ভাগের মধ্যে পেয়েছে এই এক ফালি ভিটে।
এখন টাঙা চালিয়ে সংসার পালন করলেও, এটা ওর নির্দিষ্ট পেশা ছিল না। বিয়ের আগে ছ’মাস রং মিস্ত্রির যোগালদারি করেছে চেন্নাই গিয়ে। কিন্তু পেট রোগা মানুষ, বেশি দিন টিকে থাকতে পারেনি। শরীরের অসুখ বাঁধিয়েছিল। অগত্যা বাপ দাদার মাটিতে ফিরে এসে বিয়ে থা করে সংসার পাতল।
তারপর থেকেই এই টাঙাওয়ালা জীবন।
ইতিহাসের পৃষ্ঠা ওল্টাবার কিংবা সেইসব চরিত্রদের আখ্যায়িকা শোনার মন মানসিকতা কোনদিনই ছিল না সক্রেটিসের। কৈশোরে সামান্য কয়েকটি বছরের জন্য স্কুলে গেলেও ইতিহাসের কোনো গল্পের প্রতি আকর্ষণ তার কোনোদিনই ছিল না। তবুও ঐতিহাসিক স্থানে স্থানে পর্যটকদেরকে নিয়ে ঘুরে বেড়াতে হয়। সেটা নিতান্তই জীবিকার দায়ে ।
কেউ কেউ জিজ্ঞাসা করে, ঐতিহাসিক মুর্শিদাবাদের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা স্থানগুলো সম্পর্কে। অধিকাংশ সময়ে নিরুত্তর থাকে সে। যাত্রীরা যেখানে যেখানে বলে সেখানেই নিয়ে যায় । বিনিময়ে ভাড়াটুকু বুঝে নেওয়া।
সিরাজদ্দৌলার ঐতিহাসিক এই স্থানে মানুষ ছুটে আসে ইতিহাসের গন্ধ খুঁজে নিতে। একের পর এক নিদর্শনগুলো দেখে, মানসিক চাহিদা মেটায়। এতে পেট ভরে না সক্রেটিসের।
প্রতিদিন সেই এক গন্তব্য। একই পথ ভেঙে চলা। মনের মধ্যে কখনো অন্য বাতাস খেলা করে না। তার প্রিয় ঘোটকি টাঙা টেনে নিয়ে চলে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে, বছর দশেকের সিমরানের মুখ। তার একমাত্র মেয়ে। রোজ স্কুলে যায়, সেখানে মিড ডে মিল খায়, পেট পুরে। পড়াশুনায় ততটা স্বচ্ছন্দ নয়। সক্রেটিস বলে, মেয়ে মানুষের আর পড়াশোনা! যাহোক স্কুলে গিয়ে পেট পুরে খেতে তো পায়!
এলোমেলো ভাবনাগুলো মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল। ঘোটকিটাও আজ ঝিম ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সেও মালিকের ভালোমন্দ বিচার করতে জানে। ভালো ভাড়া না পেলে, ভালোমতো খাবার দিতে পাওে না সক্রেটিস।
টানাপোড়েনের সংসারে তেমন কিছু জমা পড়ে না। বউ হালিমা তবুও সামান্য সঞ্চয়ের চেষ্টা করে। কোনোদিন যদি কাজ না হয়, এরমধ্য থেকে চালিয়ে নিতে হয়। ইদানিং রেশন থেকে চালটুকু পাওয়া যায় বলে অনেকটাই রক্ষা। সবই কিনে খেতে হয় তাদের। তবুও তাদের চলতে হয় এই সব চড়াই উতরাই পথে।
“এই টাঙা যাবে নাকি, নেমকহারামের দেউড়ি?” ঝলমলে পোশাকের এক দম্পতি টাঙার সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করল।
“যাব, চলেন। কজন আছেন?” সক্রেটিস আগ্রহ নিয়ে বলল।
“আমরা দুজনেই। কত ভাড়া নেবে বল?” ভদ্রলোক বললেন।
একটু দামাদামির পর ভাড়া ঠিক করে ওরা টাঙায় উঠে বসল ।
সক্রেটিসের টাঙা এখন দুরন্ত গতিতে ছুটছে। পাশ দিয়ে হুশ হাস করে বেরিয়ে যাচ্ছে ট্রেকার ও অটোওয়ালারা। এক সময় মুর্শিদাবাদে শুধুমাত্র টাঙাওয়ালাদের দাপট ছিল। অথচ আজ তা কালের গর্ভে চলে যেতে বসেছে।
এখন তেমনভাবে কেউ টাঙা চালায় না, যাত্রীরাও আরোহণ করতে চায় না। বিকল্প হিসেবে এসেছে টোটো ও অটো ভ্যান। ওদের ভাড়াটা বেশি। প্রায়শই টাঙাকে পিছনে ফেলে বেরিয়ে যায় অটোগুলো। ওদের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার ক্ষমতা সক্রেটিসের নেই। নিজের অপারগতাকে মনের মধ্যে গোপন করে টাঙা ছোটায় সে ।
এক এক করে দেখাতে থাকে মুর্শিদাবাদের ঐতিহাসিক স্থান। এটাই তো ওর কাজ। ভাড়ার বিনিময়ে এটাও যেন এক পর্যটকের বৃত্তি।
আরোহীদের গন্তব্য স্থান নিয়ে গেলেও সেটা দেখা বা জানার কোন আগ্রহ নেই সক্রেটিসের। কবে কোন নবাব যুদ্ধ করেছিল, কোন মসজিদ কোন মেহফিলখানা বানিয়েছিল, সে বিষয়ে কোনদিন আগ্রহ নেই তার । সে কেবল টাঙাওয়ালা। যাত্রীবহন তার কাজ।
তবে এখন ভাড়া বড্ড কমে এসেছে। তার প্রধান কারণ এই ঘোটকযান । এখন তেমন ভাবে কেউ আরোহন করতে চায় না ঘোড়ার গাড়িতে।
সকলেই যেন দ্রুত ছুটছে তাদের গন্তব্যের দিকে। সক্রেটিস ভাবে, তার একটা ইঞ্জিন গাড়ি চায়। কিন্তু তা পাবে কি করে! আর এই সামান্য রোজগারে জমানো টাকা বলে কিছু থাকে না। অনেকটাই দিন আনি দিন খায় জীবন।
হালিমাও তার স্বামীর কষ্ট বুঝতে পারে। কিন্তু কোনো উপায় নেই, সামর্থ্যও নেই। একটা টোটো কেনার। নিজের অবস্থানটুকু জানে সক্রেটিস।
এইসব ভাবনার মধ্যে বিকেল বেয়ে কতদিন নেমে এসেছে, সন্ধ্যার অন্ধকার। রাতে দুচোখ বেয়ে দিশাহারা একজন পথচারী চলে যায়, সক্রেটিসের চোখের সামনে দিয়ে । সেটা কার প্রতিবিম্ব, সেটা ও জানে।
ভাবতে ভাবতে ভাবনার স্তর কঠিন হয়। কোন উত্তরণের পথ খুঁজে পায় না। অশান্ত মনটাকে স্তিমিত করে ঘুমিয়ে পড়ে।
সক্রেটিসের রোজকারের একমাত্র সঙ্গী তার প্রিয় ঘোটকী। আজ দুদিন তেমন ভাবে কিছু খাচ্ছে না। চিন্তায় পড়েছে সক্রেটিস।
টাঙা না চললে সংসার চলবে না। একমাত্র রোজগারের উপায় বর্তমানে এটাই। কষ্ট হলেও একটু ভালো দানাপানি দেওয়ার চেষ্টা করে সে।
কিন্তু কি যে হল, দুদিন থেকে কেমন ভাবে খাবার মুখে দিচ্ছে না, তার দিলরুবা। প্রিয় ঘোটকীকে দিলরুবা বলে ডাকে সক্রেটিস। হালিমা শুনে হাসলেও মুখে কিছু বলে না।
“সকা বাড়ি আছ নাকি হে?” হাঁক দিতে দিতে বাড়ির ভেতর ঢুকলো ও পাড়ার রহমত আলী।
“কিছু বুলছো নাকি চাচা?” সক্রেটিস উত্তর দিল।
“কাইল সকাল হুনে আমার মাগকে লিয়ে ইছলামপুর যেতে পারবা কিনা বুলো?” রহমত জিজ্ঞাসা করে।
একটু থেমে গেল সক্রেটিস। কিছুক্ষণ ভেবে নেয়।
তারপর বলে,” চাচা আমার দিলরুবার শরীল ভালো লাই। অত দূরের পথ, ভাঙতে লারবো । তুমি অন্য গাঢ়ি দ্যাখো চাচা।”
রহমত ফিরে গেছে। আফসোস হয় সক্রেটিসের। এটা মোটামুটি ভাল ভাড়া পাওয়া যেত। কিন্তু কিছু করার নেই। দিলরুবার দিকে তাকালো, চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। কষ্ট চোখে মুখে।
গতকাল ডাক্তারকে মুখে বলে ওষুধ নিয়ে এসেছিল। কমার লক্ষণ নেই। গজু ডাক্তারের ওষুধ এখন আর তেমন কাজ করছে না।
রাত নেমেছে। আজ কোন ভাড়া মারতে পারেনি সক্রেটিস। তার দিলরুবার অসুখ। কাল বড় ডাক্তার ডেকে আনবে। ডাক্তার না দেখালে দিলরুবা সুস্থ হবে না। সিদ্ধান্ত নেয় , স্বামী-স্ত্রী দুজন মিলে।
মাঝরাতে দিলরুবার গোঙানির আওয়াজ শুনতে পেল সক্রেটিস।
ল্যাম্পটা জ্বেলে এগিয়ে এল। দিলরুবা বড় কষ্ট পাচ্ছে। এত রাতে কাকেই বা ডাকবে! ডাক্তারও বেশ দূরে থাকেন। তাকে ডাকার কোন উপায় নেই।
অস্থির মন নিয়ে হু হু করে কাঁপতে থাকে সক্রেটিস।
হালিমা পাশে দাঁড়িয়ে চোখের পানি মুছতে থাকে।
রাত বেড়েছে।
আস্তে আস্তে গোঙানিটা থেমে যায়।
সক্রেটিস বুঝতে পারে , জানটা খালাস হয়ে গেছে। হু হু করে কেঁদে ফেলে স্বামী স্ত্রী দুজনে। তাদের চোখের সামনে জান হারাল দিলরুবা।
বাকি রাতটুকু পাথরের মত বসে রইল দুজনে দিলরুবার মৃত শরীরের পাশে।
সক্রেটিসের চোখের সামনে ভোরের অন্ধকার বেয়ে ঝুপঝুপ করে নামতে থাকে, কান্নাভেজা সকাল আর অন্ধকারে ঢাকা একটা বিপথ ।

-advertise-

বিশ্বজিৎ মণ্ডল
বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ, পশ্চিমবঙ্গ