সনেট দেব »
একুশ শতকের শুরুতে প্রযুক্তির হাত ধরে যখন মানুষের জীবন এক নতুন বাস্তবতার দিকে মোড় নেয়, তখন সাহিত্যও আর বইয়ের পাতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ইন্টারনেট, বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ার উত্থানে মানুষ পেয়ে গেল এক অনন্য প্রকাশমাধ্যমÑ যেখানে চিন্তা, অনুভূতি, ভালোবাসা বা হতাশাÑ সবকিছুই মুহূর্তে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর মধ্যে ফেসবুক আজ একপ্রকার “ডিজিটাল কাগজ”Ñ যেখানে কবিতা লিখে পাঠকের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় সাথে সাথেই। কবিতা আর কেবল ছাপার অক্ষরের সম্পদ নয়; এটি এখন এক জীবন্ত, দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল, বহুস্বরে ভরপুর এক স্রোত। কিন্তু সেই স্রোতের ভেতরে প্রশ্ন জাগেÑএই কবিতা কি সত্যিই “শিল্প”? নাকি এটি কেবল আত্মপ্রকাশের এক ব্যাকুল প্রয়াস, একাকিত্ব ভাঙার উপায়?
ফেসবুকের কবিতা আসলে সময়েরই প্রতিবিম্ব। আধুনিক মানুষ আজ বহুব্যস্ত, বিচ্ছিন্ন এবং মানসিকভাবে একাকী। জীবনের দ্রুত গতির ফাঁকে বই হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে কবিতা পড়া বা লেখা অনেকের পক্ষেই আর সম্ভব হয় না। কিন্তু মানুষের ভেতরের আবেগ, ভালোবাসা, ব্যথা, আকাক্সক্ষা তো হারায়নি। এই অনুভূতির জোয়ার যখন কলম পায় না, তখন স্মার্টফোনই হয়ে ওঠে নতুন লেখার জায়গা। তাই কেউ লিখে ফেলেন ভোরের নির্জনতায়, কেউ অফিসের পথে ট্রাফিকের মাঝে, কেউ বা গভীর রাতের নিঃসঙ্গতায়Ñ একটি স্ট্যাটাস আকারে, কয়েকটি লাইনে। এই সহজলভ্যতা কবিতাকে দিয়েছে গণতান্ত্রিক স্বাধীনতাÑ যেখানে প্রকাশের অধিকার সবার। কিন্তু সেই সাথে জন্ম দিয়েছে এক সাংস্কৃতিক সংকট- সবার লেখা কি কবিতা? নাকি শুধুই শব্দে বাঁধা আবেগ?
ফেসবুকের কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর আন্তরিকতা ও তাৎক্ষণিকতা। এগুলো অনেক সময় নিখাদ মনের কথা, যে কথা হয়তো কবি কখনো প্রকাশ করতে পারতেন না কাগজে বা বইয়ে। এই লেখাগুলিতে আমরা পাই জীবনের কাঁচা গন্ধ, অমসৃণ সত্য। কোনো প্রেমভঙ্গের বেদনা, বন্ধুর মৃত্যু, বা রাষ্ট্রের অবিচারের প্রতিবাদ, সবই জায়গা পায় এই ছন্দহীন অথচ হৃদয়ছোঁয়া বাক্যগুলিতে। এভাবে ফেসবুকের কবিতা হয়ে উঠেছে এক সময়ের সামাজিক দলিল, এক প্রজন্মের মানসিক আবহের প্রতিচ্ছবি। সাহিত্য বিশ্লেষকরা তাই একে বলেন “ডিজিটাল হিউম্যান ডকুমেন্টেশন” যেখানে কবিতার মাধ্যমে ফুটে ওঠে মানুষের বর্তমান চিন্তাভাবনা, ভয়, একাকিত্ব ও স্বপ্নের দিগন্ত।
তবে সাহিত্যিক মানদ-ে বিচার করলে দেখা যায়, এই কবিতার অধিকাংশই শিল্পের কাঠামো মেনে চলে না। কবিতা মানে শুধু অনুভূতি নয়, এটি এক পরিশ্রমী নির্মাণপ্রক্রিয়া। ছন্দ, অলংকার, সংযম, এবং ভাষার গভীরতা, এসবের সমন্বয়েই কবিতা হয় শিল্প। কিন্তু ফেসবুকের কবিতাগুলোর বড় অংশেই দেখা যায় তাৎক্ষণিকতার প্রভাবÑ এক মুহূর্তের ভাবাবেগে লেখা, কোনো সম্পাদনা বা সংশোধন ছাড়াই প্রকাশিত। ফলে সেগুলো অনেক সময় হয়ে ওঠে ডায়েরির টুকরো, মনের উচ্ছ্বাস, কিংবা ক্ষণিকের প্রতিক্রিয়া। তাতে মনের সততা থাকলেও, অনুপস্থিত থাকে শিল্পের শৃঙ্খলা। আর এখানেই ফেসবুক কবিতার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা।
অন্যদিকে, “লাইক” আর “কমেন্ট”-এর সমাজে কবিতা হয়ে উঠেছে একধরনের সামাজিক ঘটমান শিল্প। মানুষ লিখছে, অন্যরা প্রশংসা করছে, কেউ কেউ সমালোচনা করছে এ এক তাৎক্ষণিক সাহিত্যের বাজার। এতে কবিতার পবিত্রতা অনেক সময় ভোগে; কারণ পাঠকের প্রতিক্রিয়াই হয়ে ওঠে লেখকের অনুপ্রেরণা বা মূল্যায়নের মাপকাঠি। লাইক কম হলে মন খারাপ, বেশি হলে আত্মতুষ্টি। সাহিত্যচর্চা তখন আর অন্তর্মুখী নয়, হয়ে ওঠে এক প্রকার সামাজিক প্রতিযোগিতা। ফলে কবিতার গভীর আত্মচর্চার জায়গাটি কখনো কখনো হারিয়ে যায় প্রশংসার নেশায়।
তবুও ফেসবুক কবিতাকে একেবারে অবজ্ঞা করা অন্যায় হবে। কারণ এই প্ল্যাটফর্মই অনেক তরুণ লেখকের জন্য হয়ে উঠেছে আত্মপ্রকাশের প্রথম দরজা। অনেকেই এখান থেকেই সাহিত্যজগতে প্রবেশ করেছেন, গড়ে তুলেছেন পাঠক, প্রকাশ করেছেন বই। ফেসবুক তাই এক নতুন সাহিত্যতরঙ্গÑ যেখানে লেখক ও পাঠকের দূরত্ব বিলুপ্ত। এক সময় যাদের লেখা পত্রিকার পাতায় জায়গা পেত না, তারাও এখন পাঠকের ভালোবাসা পাচ্ছেন অনলাইনে। এতে একদিকে যেমন জন্ম নিচ্ছে অগণিত সাময়িক কবিতা, তেমনি অন্যদিকে উঠে আসছে কিছু সত্যিকার প্রতিভা, যারা ভবিষ্যতের সাহিত্যধারাকে বদলে দিতে পারে।
অতএব, ফেসবুকের কবিতা আসলে দ্বিমুখী বাস্তবতার প্রতিফলন। এটি যেমন আত্মপ্রকাশের ব্যাকুলতা, তেমনি শিল্পের নবযাত্রাও বটে। এর মধ্যে যেমন আছে কাঁচা আবেগের বিস্ফোরণ, তেমনি আছে নতুন ভাবনার পরীক্ষা। সময়ের সাথে সাথে হয়তো এই ডিজিটাল কবিতাগুলোর ভেতর থেকেই জন্ম নেবে নতুন ধারার কবিতাÑ যেখানে প্রযুক্তি ও মনন মিলবে এক নতুন কাব্যিক উচ্চারণে। শেষ পর্যন্ত, কবিতার প্রকৃত অর্থ কিন্তু একই থাকেÑ মানুষের মনের গভীর সত্তাকে শব্দে ধরা। মাধ্যম বদলায়, পাঠক বদলায়, কিন্তু কবিতার প্রাণ তার মমতা, তার ব্যথা, তার প্রেমÑচিরন্তন। ফেসবুকের কবি হয়তো জানেন না তিনি “শিল্প” তৈরি করছেন কি না, কিন্তু তিনি নিশ্চিত জানেনÑ তিনি বেঁচে আছেন, অনুভব করছেন, আর সেই অনুভূতিটাই কবিতার জন্মদাতা।























































