এ মুহূর্তের সংবাদ

সর্বজনীন শিক্ষার দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান

সুপ্রভাত ডেস্ক »

গণ-অভ্যুত্থানের রক্ত ভেজা পথেও শিক্ষায় বৈষম্য দূর হয়নি, বৈষম্যহীন উল্লেখ করে সর্বজনীন শিক্ষার দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফন্ট।

বুধবার (১৩ মে) জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফন্ট ঢাকা মহানগরের আয়োজনে এক ছাত্র সমাবেশে এ আহ্বান জানানো হয়।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের রক্তে ভেজা রাজপথ থেকে আমরা স্বপ্ন দেখেছিলাম পরিবর্তনের। দেড় সহস্রাধিক ছাত্র-শ্রমিক-জনতার আত্মবলিদান, পঁচিশ হাজার মানুষের পঙ্গুত্ববরণের বিনিময়ে বিতাড়িত হয়েছে স্বৈরাচারী সরকার। কিন্তু অভ্যুত্থানের ধুলো সরতে না সরতেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে- শাসকের মুখ বদলেছে, শিক্ষার্থীর কপাল বদলায়নি।

তারা বলেন, ঢাকার শিক্ষার বাস্তবতা, দুই ভুবনের গল্প। এই শহরে দুটো শিক্ষা জগৎ পাশাপাশি বেঁচে আছে। একটিতে আলোকোজ্জ্বল ব্যয়বহুল প্রতিষ্ঠানে পড়া সন্তান, অন্যটিতে গলি-বস্তির স্কুলে গাদাগাদি করে বসা কিশোর। নিবন্ধনকৃত ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ১১১টিই ঢাকায় কেন্দ্রীভূত, আর এই শহরের লাখ লাখ শ্রমজীবী পরিবারের সন্তানের ভাগ্যে জোটে ভাঙাচোরা বেঞ্চ, শিক্ষকশূন্য ক্লাসরুম আর কোচিং-গাইডের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল এক ফাঁকা শিক্ষাব্যবস্থা।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা পিরামিড আকৃতির। প্রতিবছর ঝরে পড়ার হার গাণিতিক হারে বাড়তেই থাকে। সিপিডির তথ্যে উঠে এসেছে, ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী ভর্তি কমেছে ২১ দশমিক ৫ শতাংশ। যার মধ্যে শিশুশ্রমের কারণে বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার হার বেড়ে ৯ দশমিক ২ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। দেশে বাল্যবিবাহের কারণে মেয়েদের ঝরে পড়ার হার ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ। শিক্ষা এখন আর মানুষ গড়ার হাতিয়ার নয়, পরিণত হয়েছে প্রতিষ্ঠানের রেটিং রক্ষার বাণিজ্যিক কৌশলে। অথচ, ২৪ এর অভ্যুত্থানের পরে অন্তর্বর্তী সরকার এগারোটি সংস্কার কমিশন গঠন করলেও, শিক্ষাবিষয়ক কোনো কমিশন গঠিত হয়নি বলে তারা দাবি করেন

তারা আরও বলেন, জুলাই আন্দোলনে সম্মুখসারিতে থেকে লড়াই করেছিল শিক্ষার্থীরা, কিন্তু শিক্ষার সংস্কার আটকে আছে নথিপত্রের ভাঁজে। ২০২৬-এর নতুন শিক্ষাবর্ষে দেখা গেছে বইয়ের সংকট, নিম্নমানের পাঠ্যপুস্তকের সমাহার, যা শিক্ষার প্রতি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অবহেলার বহিঃপ্রকাশ। জাতীয় বাজেটের ২৫ ভাগ শিক্ষাখাতে বরাদ্দের কথা থাকলেও পূর্ববর্তী সরকারের মতোই গত সরকারও শিক্ষায় বাজেট বরাদ্দ কমিয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত না করে বরং শিক্ষার বাণিজ্যিক খাত যেমন: কোচিং, গাইড, নোটের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়ে প্রগতিশীল মুক্ত চিন্তার লেখকদের লেখা বাদ দিয়ে সাম্প্রদায়িক বক্তব্য হাজির করা হয়েছে বলেও জানান তারা।

বক্তারা বলেন, শিক্ষার্থীদের দেহমনে গড়ে তোলার জন্য খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের আয়োজন করা প্রয়োজন। রাজধানীর খেলার মাঠ গুলো দখল করেছে বহুতল মার্কেট, আবাসিক ভবন, ক্লাবসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। যে-সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলার মাঠ রয়েছে, সেগুলো ক্লাস ছুটির পর বন্ধ থাকায় পাড়া-মহল্লার ছেলে-মেয়েরা খেলতে পারে না। সাংস্কৃতিক আয়োজন নেই বললেই চলে। ফলে কিশোর গ্যাং-এর দৌরাত্ম্য বাড়ছে, বাড়ছে মাদকাসক্ত। শিক্ষা ব্যয় নির্বাহ করতে না পেরে ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা দেখে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে।

এছাড়া ছাত্র নেতারা বলেন, শিক্ষক নেই, বাজেট নেই, সংস্কার নেই। শিক্ষামন্ত্রী জাতীয় সংসদে স্বীকার করেছেন, সরকারি কলেজে ৬৫৬টি প্রভাষক পদ শূন্য, সদ্য সরকারিকৃত কলেজে আরো দুই হাজার ৪১০টি শূন্য পদ আছে। এমপিওভুক্ত কলেজে অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষের এক হাজার ৩৪৯টি পদ শূন্য। যে শিক্ষক মানুষ গড়ার কারিগর, রাষ্ট্র তাকে সম্মানজনক বেতনও দেয় না, ন্যায্য দাবিতে আন্দোলনে নামলে লাঠিচার্জ করে।

শেষে তারা দাবি জানান, জাতীয় বাজেটের ২৫ শতাংশ শিক্ষাখাতে বরাদ্দ, ঢাকার প্রতিটি ওয়ার্ডে শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত খেলার মাঠ ও সাংস্কৃতিক আয়োজন, সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য ন্যায্য আসন ও মানসম্পন্ন পাঠ, শিক্ষক সংকট দূরীকরণে অবিলম্বে নিয়োগ, কোচিং-গাইড নির্ভরতার অবসান ঘটিয়ে শ্রেণিকক্ষে প্রকৃত শিক্ষা নিশ্চিত করা, এবং শিক্ষার সাম্প্রদায়িকীকরণ ও বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধ করা।

সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট ঢাকা মহানগরের সভাপতি অনিক কুমার দাসের সভাপতিত্বে ছাত্র সমাবেশে আরও উপস্থিত ছিলেন সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক রায়হান উদ্দিন, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক রিনা মুর্মু, সাংগঠনিক সম্পাদক ইনজামামুল হক, বাসদের ঢাকা মহানগর ইনচার্জ নিখিল দাস প্রমুখ।