ফিচার এলাটিং বেলাটিং

শিশুরাজ্যের রাজা রবিঠাকুর

মোস্তাফিজুল হক »

ক্ষান্তবুড়ির দিদিশাশুড়ির
পাঁচ বোন থাকে কালনায়,
শাড়িগুলো তারা উনুনে বিছায়,
হাঁড়িগুলো রাখে আলনায়|’
ছোট্ট বন্ধুরা, এই মজার ছড়াটা পড়ে নিশ্চয়ই খুব হাসি পাচ্ছে, তাই না? কল্পনার রং মিশিয়ে ছন্দে ছন্দে এভাবে আনন্দ দেওয়াটা মোটেও সহজ কাজ নয়| এই আনন্দ-কারিগর কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর| মন চাইলেই যিনি লিখে ফেলতেন মজাদার ছড়া, কবিতা, গল্প, গান, নাটক ও উপন্যাস| তিনি ছিলেন অত্যন্ত আলোকিত মানুষ| কারণ, ‘রবি’ মানে ‘সূর্য’, ‘ইন্দ্র’ মানে ‘রাজা’ আর ‘নাথ’ মানে হলো ‘কর্তা’| তিনি তাঁর নামের প্রতি সুবিচার করতে পেরেছিলেন বলেই তিনি সূর্যের মতোই; তাঁর চেয়ে আলোকিত মানুষ কে আর হতে পারে?
কলকাতার জোড়াসাঁকো’র বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জন্মগ্রহণ করেন; তারিখটা ছিল ৭ই মে ১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দ, ২৫শে ˆবশাখ ১২৬৮ বঙ্গাব্দ| তাঁদের ছিল বিশাল জমিদারি আর রাজবাড়ির মতো ঘর| ঘরে ঘরে ছিল দাসদাসি আর পাইকপেয়াদা| এতকিছু থাকার পরেও ছোট্ট রবি বড়ই নিঃসঙ্গ— কারণটা কী? জমিদার মহল বলে কথা, আশেপাশের সবাই ভীষণ গুরুগম্ভীর, কেউ প্রাণ খুলে কথা বলে না, গল্প করে না— এ কেমন কথা? যাঁরাই কাছে আসেন, তাঁরাই পড়ার কথা বলেন| ভারিক্কি যত পড়া তাঁর ভালো লাগে না| তাঁর চোখে প্রকৃতির হাতছানি, মুখে গল্প আর ছড়ার ছন্দ| পড়তে বসলেই হাই ওঠে| সেই সত্য কথাটিই তুলে আনলেন তাঁর ছড়ায়:
পাঠশালে হাই তোলে
মতিলাল নন্দী;
বলে, ‘পাঠ এগোয় না
যত কেন মন দি|’
তিনি নিজেকে মতিলাল ভাবলেও পড়তেন না যে, তা কিন্তু নয়| শুধুমাত্র ছকবাঁধা পড়াশোনার প্রতি অনীহা ছিল| তিনি অত্যন্ত বইপ্রেমী ছিলেন| বন্দিজীবন নয়, প্রকৃতির প্রতি ছিল তাঁর সীমাহীন মুগ্ধতা| তাঁর মন টানতো দূরের মাঠ, নদী, পথের ফেরিওয়ালা| তাইতো মাঠের তালগাছ দেখে লিখেছেন:
তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে
সব গাছ ছাড়িয়ে
উঁকি মারে আকাশে|
গাঁয়ের এঁকেবেঁকে চলা ছোট্ট নদীটি ছোট্ট রবিঠাকুর নানানভাবে ভাবিয়ে তুলত| তাইতো তিনি ‘আমাদের ছোটনদী’ ছড়ায় লিখেছেন:
আমাদের ছোট নদী
চলে বাঁকে বাঁকে,
বৈশাখ মাসে তার
হাঁটুজল থাকে|
গাঁয়ের এই ছোট্ট নদীটিই তাঁকে অজানাকে জানতে, অদেখাকে দেখতে আগ্রহী করত| সেই ছোট্ট নদীর খেয়াঘাটের মাঝি হওয়ার বাসনা জাগিয়ে তুলত| ‘মাঝি’ ছড়ায় কবি তাঁর সেই অদম্য ইচ্ছের কথাই তুলে ধরেছেন:
মা যদি হও রাজী
আমি হব খেয়াঘাটের মাঝি|
কবির মন কখনও গৃহবন্দি ছিল না| তিনি ছিলেন প্রকৃতি অনুসন্ধানী| তবে সময় বুঝে তিনিই আবার বলেছেন:
নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে
তিলঠাঁই আর নাহিরে,
ও গো আজ তোরা যাসনে
ঘরের বাহিরে|
গৃহশিক্ষক ছোট্ট রবিঠাকুরকে নিয়মিতই পড়াতে আসতেন| এসব দেখে তিনি তাঁর নিজের পোষা বিড়ালের শিক্ষকও সেজেছিলেন:
আমি আজ কানাই মাস্টার,
পোড়ো মোর বেড়ালছানাটি|
আমি ওকে মারি নে মা, বেত,
মিছিমিছি বসি নিয়ে কাঠি|
আমি বলি, ‘চ ছ জ ঝ ঞ’,
ও কেবল বলে ‘মিয়োঁ মিয়োঁ’|
শিশু রবিঠাকুরের নিজের ইচ্ছের কথা প্রকাশ করতে গিয়ে এভাবেই মাকে প্রাধান্য দিয়েছেন, টেনে এনেছেন মায়ের প্রসঙ্গ| তাঁর মনে ছিল অপরিসীম মাতৃভক্তি| তাইতো ‘বীরপুরুষ’ ছড়ায় লিখেছেন:
মনে করো, যেন বিদেশ ঘুরে
মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে|
আবার ‘খেলাভোলা’ ছড়ায় লিখেছেন:
তুই কি ভাবিস দিনরাত্রি
খেলতে আমার মন?
কক&খনো তা সত্যি না মা
আমার কথা শোন|
বন্ধুরা, আমার তো মনে হয় রাত হলে কবি রবিঠাকুরের চোখে চাঁদ এসে জোছনা মেখে দিয়ে যেত; কেন জানো? এসো তাহলে তাঁর লেখা পড়েই জানি:
দিনের আলো নিভে এল
সূর্যি ডোবে ডোবে,
আকাশ ঘিরে মেঘ ছুটেছে
চাঁদের লোভে লোভে|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মাত্র ষোলো বছর বয়সে ‘ব্রজবুলি’ পদাবলিতে আকৃষ্ট হয়ে ‘ভানুসিংহ’ ছদ্মনামে গান লিখতে শুরু করেন| এই তিনিই আবার বিশ্বসেরা ছোট গল্পকার| বড়দের পাশাপাশি ছোটদের জন্যও বেশ মজার মজার গল্প লিখেছেন| ‘ছুটি’ গল্পের ফটিককে তাইতো আমরা কিছুতেই মন থেকে মুছে ফেলতে পারি না, বরং মনের অজান্তেই দু’ফোটা অশ্রু ঝরে যায়| অজপাড়া গাঁয়ের চির চঞ্চল কিশোর ফটিক| গাঁয়ের মাঠে মায়ের আদরে বেড়ে ওঠা ছেলেটি মামার সাথে শহরে আসে| শহরের প্রতিকূল পরিবেশে সে বারবার হোঁচট খায়| শহুরে স্কুলের কড়া শাসনে সে জর্জরিত| মামি ও মামাত ভাইদের কাছেও অবহেলিত| ফটিক মামার কাছে আবদার করে মায়ের কাছে যাবে| মামা তাকে পুজোর ছুটিতে গ্রামে নিয়ে যাবেন বলে কথা দেন| ফটিক ছুটির অপেক্ষায় দিন গুনতে থাকে| মামার ছুটির আগেই ওর ছুটি হয়| ফটিক জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়! ফটিকের এই অনাকাঙি&ক্ষত মৃত্যু পাঠকের চিত্তে অপরিসীম বেদনা জাগায়| তাঁর অনন্য সৃষ্টি ‘পোস্টমাস্টার’ গল্পের রতন চরিত্র| স্নেহকাতর মেয়ে রতন যেন এদেশের অসহায় শিশুদের ছায়ামূর্তি| বাঙলা সাহিত্যে ছোটগল্পের পথপ্রদর্শক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর| তিনি তাঁর ‘অতিথি’ গল্পে বাঁধনহারা তারাপদকে এদেশের কিশোরদের যথার্থ প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরেছেন| তারাপদ তার ইচ্ছেমতো যেখানে খুশি সেখানে ছুটে বেড়ায়| ওর দুরন্তপনাকে কেউ স্নেহমায়ায় বেঁধে স্থিরতা দিতে পারে না|
রবিঠাকুরের অনবদ্য শিশুতোষ নাটক ‘ডাকঘর’| নাটকের মূল চরিত্র অসুস্থ বালক অমলের আকুতি ভীষণ বেদনাদায়ক| অমল বাইরের পৃথিবীকে প্রাণভরে উপভোগ করতে চায়| অথচ তাকে সুস্থ করে তুলতে কবিরাজের কথায় একটি ঘরে বন্দি রাখা হয়| সে পথের দিকে তাকিয়ে থাকে| অমল সবার কাছে অনুনয় করে, তাকে মুক্ত করে দিতে| কারণ, তাকে যে রাজবাড়ির ঘণ্টা, দূরের আকাশ, গাঁয়ের পথ হাতছানি দিয়ে ডাকে|
ছোটগল্পের জাদুকর ছোটদের জন্য আরো অনেক গল্প লিখেছেন| বিশেষ করে তাঁর লেখা ‘রাজার বাড়ি’, ‘বড়ো খবর’, ‘পরী’, ‘আরো সত্য’, ‘বাচস্পতি’, ‘জলে ডুবে মরার গল্প’, ‘শেয়ালের মানুষ হওয়ার গল্প’, ‘বাঘের গল্প’, ‘বনমানুষের মাথা ঠোকার গল্প’, ‘গেছো-বাবার গল্প’ ছোটদের মনে এক আলাদা আনন্দভুবন ˆতরি করে| বন্ধুরা, তোমরা তাঁর ‘গল্পগুচ্ছ’ বইটা হাতে নিলে ছাড়তেই চাইবে না| এছাড়াও তিনি অনেক কবিতাই গল্পের আদলে লিখেছেন| ইচ্ছে করলেই তাঁর সেসব কবিতাকেও উৎকৃষ্ট গল্পের রূপ দিতে পারতেন| এসবের মধ্যে ‘কনি’, ‘বাঁশিওয়ালা’, ‘ক্যামেলিয়া’ আরো বহু কবিতা|
জমিদারপুত্র হলেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন অনন্য কোমলপ্রাণের অধিকারী| তাঁর ‘দুইবিঘা জমি’ কবিতা সে কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়:
এ জগতে হায় সেই বেশি চায়
যার আছে ভুড়িভুড়ি,
রাজার হস্ত করে সমস্ত
কাঙালের ধন চুরি|
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য এশীয়দের মধ্যে প্রথম নোবেল পুরস্কার লাভ করেন| তাঁর লেখা ‘শিশু’, ‘খাপছাড়া’, ‘ছড়ার ছবি’ ও ‘শিশু ভোলানাথ’, এর সবই তোমাদের জন্য লেখা| তিনি শিশুদের কথা ভেবে সেজেছেন শিশু, পৃথিবীকে দেখতে চেয়েছেন শিশুর সরলতায়— তাইতো তিনি লিখেছেন:
আমরা সবাই রাজা আমাদের
এই রাজার রাজত্বে—
নইলে মোদের রাজার সনে
মিলব কী ¯^ত্বে ?
আমরা সবাই এক সূর্য থেকেই আলো পাই, একই বায়ুমণ্ডল থেকে শ্বাস নেই এবং সবাই মাটি থেকেই খাদ্য পাই| এসব ক্ষেত্রে আমাদের সবার অধিকার সমান| আমাদের সুখ-দুঃখের অনুভূতিও সবার একই রকম| আমরা সবাই চেষ্টার মাধ্যমে জীবনে সফল হয়ে ¯^প্ন পূরণ করতে পারি| এই ¯^াপ্নিক নিয়মে প্রতিটা মানুষই রাজা বা রানি| তাই আমাদের সবার সবাইকে সম্মান করা আর সমান সুযোগ দেওয়া উচিত|
‘আমরা সবাই রাজা’ গানটির মাধ্যমে শিশুদের পরস্পর মিলেমিশে থাকা, তাদের ঐক্য ও বন্ধুত্ব গড়ে তোলার সহজ আকর্ষণকে সমাজের আর সবার মাঝে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে| গানটি মূলত ¯^াধীনতা, অধিকার চেতনা ও ঐক্যশক্তির প্রতীক| মানব সমাজে সাম্য ও সামাজিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার গান এটি| সবাইকে সাথে নিয়ে, সবাইকে সমান গুরুত্ব ও সম্মান দিয়ে রাজ্য শাসন করলে রাজা ব্যর্থ হন না| জনগণকে সম্মান দিলে প্রকৃতপক্ষে রাজাই সম্মানিত হন| এই গানে ছোটবড় ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে সবাইকে একইসূত্রে গাঁথা হয়েছে|
ধর্ম-বর্ণ, জাতিগোষ্ঠী ইত্যাদির পার্থক্য শিশুদের চোখে ধরা পড়ে না| শিশুরা তাদের নিজ আনন্দলোকে সবাই সবার হাতে হাত রেখে চলতেই পছন্দ করে— গানে শিশুদের সেই সমঅধিকার চেতনার কথাই উঠে এসেছে| রবীন্দ্রনাথ আমাদের আবারও স্মরণ করিয়ে দিলেন: জগতে শিশুরাই সবচেয়ে সম্প্রীতি পরায়ণ| তাইতো তিনি আমাদের শিশুরাজ্যের রাজা|