মতামত সম্পাদকীয়

রোহিঙ্গা সংকটের নতুন অভিঘাত : বাড়তি বোঝার দায় আর কত

ফাইল ছবি

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে অব্যাহত সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে আবারও বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। সম্প্রতি জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ৩১ মে পর্যন্ত মাত্র কয়েক মাসে নতুন করে ১ লাখ ৫২ হাজার ২৯ জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে নিবন্ধিত হয়েছে। মে মাসেই এই সংখ্যা ছিল ২ হাজার ২৬০ জন। এর ফলে দেশের ক্যাম্পগুলোতে আশ্রয় নেওয়া মোট রোহিঙ্গার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২ লাখে। একটি উন্নয়নশীল এবং জনঘনত্বপূর্ণ দেশের জন্য এই বিপুল সংখ্যক অতিরিক্ত মানুষের চাপ বহন করা যে কতটা দুঃসাধ্য, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।
বাংলাদেশ বরাবরই মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। ২০১৭ সালে যখন লাখ লাখ রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়ে এসেছিল, তখন বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিয়ে বিশ্বদরবারে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছিল। কিন্তু ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও এই সংকটের কোনো টেকসই সমাধান মেলেনি; বরং সংকট দিন দিন আরও ঘনীভূত ও জটিল হচ্ছে।
প্রথমত, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। আমাদের সীমিত সম্পদ, আবাসন, কর্মসংস্থান ও পরিবেশের ওপর এই ১২ লাখ মানুষের বোঝা এক দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কক্সবাজার ও সংলগ্ন অঞ্চলের বনভূমি উজাড়, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া এবং স্থানীয়দের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি সামাজিক ভারসাম্যকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
দ্বিতীয়ত এবং সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো—রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ক্রমবর্ধমান অপরাধপ্রবণতা। শুরুর দিকে যা ছিল কেবলই আশ্রয়প্রার্থীদের মানবিক সংকট, এখন তা রূপ নিয়েছে জাতীয় নিরাপত্তার হুমকিতে। মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান, মানবপাচার, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, খুন এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্য বিস্তারের চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে এই ক্যাম্পগুলো। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও শান্তি আজ চরম বিঘ্নিত।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত হতাশাজনক। মানবিক সহায়তার পরিমাণ যেমন দিন দিন কমছে, তেমনি মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও বিশ্বমোড়লদের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।
আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, বাংলাদেশ অনন্তকাল ধরে এই বিপুল জনসংখ্যার বোঝা টানতে পারবে না। নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে এবং সীমান্ত সুরক্ষায় আরও জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সাথে, জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহকে কেবল পরিসংখ্যান প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, মিয়ানমার সরকারের ওপর কার্যকর কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে হবে। রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান নিরাপদ ও স্থায়ী প্রত্যাবাসন—এই সত্যটি বিশ্ব সম্প্রদায় যত দ্রুত উপলব্ধি করবে, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য ততই মঙ্গল।

-advertise-