বৃহস্পতিবার, আগস্ট ১৩, ২০২৬
ফিচার শিল্প-সাহিত্য

রশীদ করীম : স্বাতন্ত্র্য ও নতুনত্বের কথাশিল্পী

এস ডি সুব্রত »

রশীদ করীম বাংলাদেশের প্রধান কথাশিল্পীদের মধ্যে অন্যতম হলেও তাঁকে নিয়ে চর্চা হয়েছে কম। প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে নিজস্ব ধারায় সাহিত্য সৃষ্টিতে তিনি মগ্ন ছিলেন সবসময়। ব্যক্তি হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত বন্ধুবৎসল ও পরিশীলিত। উত্তম পুরুষ, আমার যত গ্লানি, প্রসন্ন পাষাণ- এর মতো শক্তিশালী উপন্যাসের লেখক রশীদ করীমের সাহিত্য অত্যন্ত মূল্যবান। রশীদ করীম ১২টি উপন্যাস লিখেছেন। এর সবগুলো উপন্যাসের কাছেই পাঠককে ফিরে যেতে হয়। রশীদ করীমকে জানলে, বুঝলে বাঙালি সমাজের বিবর্তনের উপলব্ধি ও পথরেখা আমরা পেতে পারি। কথাসাহিত্যিক হামীম কামরুল হক বলেন, রশীদ করীম যেন গদ্য লেখা শামসুর রাহমান। কোনো দিকে না ঝুঁকে তিনি নিজের লেখাটা নিজের মতো করে লিখে গেছেন। রশীদ করীমকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের উপন্যাসের আলোচনা সম্পূর্ণ হয় না। হামীম কামরুল হকের বক্তব্যেও উঠে আসে রশীদ করীমের বাঙালি মুসলমানকে চিত্রিত করার কথা। কবি ও লেখক আলতাফ শাহনেওয়াজ বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পর আমরা জাতীয়তাবাদী বয়ানের মধ্যে আটকে গিয়ে সাহিত্যের অনেক কিছুই অন্বেষণ করতে পারিনি। রশীদ করীমের কাছ থেকে তরুণ লেখকদের লেখা নিয়ে ধৈর্য ধরার বিষয়টিসহ অনেক কিছু শেখার আছে। তিনি বলেন, রশীদ করীম তাঁর বাঙালি মুসলমান আত্মপরিচয়টি উন্মোচন করতে চেয়েছেন সবসময়। রশীদ করীমের পুরো নাম রশীদ করীম গোলাম মুরশেদ। জন্ম ১৯২৫ সালে কলকাতায়, ৩০ নম্বর ইউরোপিয়ান অ্যাসাইলাম লেনে। তার মা সৈয়দা আমাতুজ জোহরা ছিলেন গৃহিণী। বাবা মৌলভি আবদুল করীম ছিলেন সাব-ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। দাদা খান সাহেব আবদুর রাহিম ছিলেন ক্যালকাটা পুলিশের চিফ ইন্সপেক্টর। নানা সৈয়দ আবদুল মালেক ছিলেন এডিশনাল ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। তাদের পূর্বপুরুষ আফগানিস্তান থেকে এসেছিলেন সোনারগাঁয়ে। পরে বসতি গড়েন যশোরে। যশোর থেকে কলকাতায়। দেশভাগের অভিঘাতে ও চাকরির সুবাদে রশীদ করীম ১৯৫০ সালের ১৫ মার্চ স্থায়ীভাবে চলে আসেন ঢাকায়। বড় ভাই আবু রুশদ মতিনউদ্দিন ঢাকায় আসেন আরও আগে। শৈশবে বাবার বদলি চাকরির কারণে রশীদ করীম থেকেছেন লালমনিরহাট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুষ্টিয়ায়। পঞ্চাশের দশকেই লেখালেখির সূচনা, শুরুটা গল্প দিয়ে। ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে ‘সওগাত’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তার প্রথম গল্প ‘আয়েশা’। প্রথম উপন্যাসের মধ্য দিয়েই সাহিত্যে তার স্থান পাকাপোক্ত করে নেন। ভারত বিভক্তির প্রেক্ষাপট নিয়ে রচিত ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত তার ‘উত্তম পুরুষ’ উপন্যাসটির জন্য লাভ করেন আদমজী পুরস্কার। রশীদ করীম ছিলেন বাংলাদেশের আধুনিক উপন্যাস নির্মাণ-কলার অন্যতম পথিকৃৎ শিল্পী। উপন্যাসের পাশাপাশি ছোটগল্প ও প্রবন্ধ রচনায়ও ছিলেন সিদ্ধহস্ত। তার সমসাময়িক কাছের মানুষ ও তার বন্ধু মানুষেরা যেমন- কবি শামসুর রাহমান, অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ, মফিদুল হক প্রমুখ বলেন, সমৃদ্ধ জীবনাভিজ্ঞতা, অনন্য ভাষাভঙ্গি এবং স্বকীয় গদ্যশৈলীর মধ্য দিয়ে রশীদ করীম বাংলা সাহিত্যকে ঋদ্ধ করেছেন। জন্ম ও বেড়ে ওঠা কলকাতায় হলেও রশীদ করীমের কল্পনা, কর্ম ও স্মৃতির ভূগোলে জীবন্ত হয়েছে পূর্ব বাংলা ও পরবর্তী পূর্ব পাকিস্তান তথা আজকের বাংলাদেশ। পারিবারিকভাবে পাওয়া ভাষা উর্দুকে পরিহার করে বাংলাকে নিজ ভাষা হিসেবে গ্রহণ করে আবু রুশদের মতো রশীদ করীমও সন্তুষ্ট থাকেননি; তিনিও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উন্নয়নকল্পে আত্মনিয়োগ করেছেন নিবিষ্টচিত্তে। পাকিস্তান সরকার যখন ইসলাম ধর্মভিত্তিক সাহিত্যচর্চাকে উদ্বুদ্ধ করেছে, তখন তিনি বিশ্বসাহিত্যের মানদণ্ডে বাংলাদেশের কথাসাহিত্যকে দাঁড় করাতে হয়েছিলেন উন্মুখ। দেশী রবীন্দ্র-শরৎ আর বিদেশি রুশ, ফরাসি, জার্মান ও আমেরিকান সাহিত্য প্রভাব বিস্তার করেছে রশীদ করীমের সাহিত্যচিন্তায় ও চরিত্রনির্মাণে। দস্তয়েভস্কি, তলস্তয়, ডিফো, ফিল্ডিং, টমাস হার্ডি, জেন অস্টেন, ফ্লবেয়ার, ভিক্টর হিউগো, বালজাক, রোমাঁ রোলাঁ, আনাতোল ফ্রাঁস, আঁদ্রে মারোয়া, আলবেয়ার কামু, জঁ পল সার্ত্র আর কাফকা পড়া রশীদ করীম বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে যে শিল্পাদর্শ সূচিত করেছেন, তা ছিল নিঃসন্দেহে স্রোতবিরুদ্ধ। বিষয় ও আঙ্গিক নির্মাণ, নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণে উন্নত দৃষ্টিভঙ্গির স্বাতন্ত্র্য ও নতুনত্ব কথাশিল্পী রশীদ করীমকে পৃথক করেছে অন্যদের থেকে। ষাটের দশকের সূচনালগ্নে ১৯৬১ সালে প্রকাশিত হয় রশীদ করীমের প্রথম উপন্যাস ‘উত্তম পুরুষ’। ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত হয় তার দ্বিতীয় উপন্যাস ‘প্রসন্ন পাষাণ’। রশীদ করীম যে স্রোতের বিরুদ্ধচারী কথাশিল্পী, তা উপন্যাস দুটি বিশ্লেষণ করলে উপলব্ধি হবে অনেকটা। উপন্যাস দুটি কলকাতার ভূগোলে পরিবর্ধিত। দেখুন, পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের কথাশিল্পীরা যখন দেশীয় টানে ও আর্থরাজনৈতিক চৈতন্যে বাংলাদেশের ভূগোলের প্রতি আবেগ-উচ্ছ্বাস-ভালোবাসা সঞ্চার করতে সচেষ্ট ছিলেন, তখন রশীদ করীম খুব সম্ভব এককভাবেই কলকাতা নগরীকে করলেন চৈতন্যের কেন্দ্রবিন্দু। মুসলিম বাঙালি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব ও বিকাশে কলকাতা নগরীর ভূমিকাকে তিনি খর্ব বা অস্বীকার করেননি। তিনি দেখিয়েছেন কলকাতাভিত্তিক ‘উত্তম পুরুষ’ ও ‘প্রসন্ন পাষাণ’ উপন্যাসের অস্তিত্বসন্ধানী ও আত্মপ্রতিষ্ঠাকামী শাকের-তিশনা-কামিলরা পরবর্তীতে বিস্তৃত, বুনট ও সম্প্রসারিত হয়েছে ঢাকা শহরসংলগ্ন ‘আমার যত গ্লানি’, ‘প্রেম একটি লাল গোলাপ’, ‘মায়ের কাছে যাচ্ছি’, ‘বড়ই নিঃসঙ্গ’, ‘চিনি না’, ‘শ্যামা’, পদতলে রক্ত’ প্রভৃতি উপন্যাসের চরিত্রসমূহে। বৃহত্তর অর্থে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের কথাশিল্পীগণ গ্রামীণ জীবনকে উপজীব্য করলেও রশীদ করীম অগ্রগামী হয়েছেন নগরজীবনের স্বরূপ সন্ধানে। আধুনিক শিক্ষা, বিশ্বদর্শন ও বিজ্ঞানমনস্কতায় সমৃদ্ধ যে নাগরিক চেতনা ও নগর-চরিত্র, তা রশীদ করীমের উপন্যাসে হয়েছে শিল্পিত। তার চরিত্ররা শিক্ষিত, সচ্ছল, স্বাবলম্বী ও ক্ষুধামুক্ত। তাই তারা শিল্প-সাহিত্যমনা, যুক্তিবাদী, দেশ-রাজনীতিঘনিষ্ঠ ও শরীরী অবয়বে আকর্ষণীয়। যারা ক্ষুধার্ত-বুভুক্ষু-অশিক্ষিত, তারা ব্যক্তিত্ববান ও রাজনীতিচেতন হবে কীভাবে? যারা দিনের পর দিন অনাহারে ভুখা পেটে থাকে, তাদের মন-মনন-দেহ কীভাবে হয় পুষ্পিত পূর্ণ? তাদের যৌবন, তাদের বীরত্ব কীভাবে উথলে ওঠে আমাদের কথাসাহিত্যে, তা রশীদ করীমের প্রশ্ন। অর্থাৎ, তিনি নগরজীবনের বাহির নয়, অন্তঃকরণকে নিঃসঙ্গভাবে তুলে এনেছেন কার্যকারণসূত্রে। চরিত্রনির্মাণে রশীদ করীম ভেঙে দিয়েছেন ব্যাকরণের সূত্র। ব্যাকরণে পুরুষ তিন প্রকার; যথা: উত্তম পুরুষ, মধ্যম পুরুষ ও নাম পুরুষ এবং এই উত্তম পুরুষ হলো একবচনে আমি আর বহুবচনে ‘আমরা’। যেকোনো ব্যক্তির দৃষ্টি ও যুক্তিতে সে বা তিনি সব সময়ই শ্রেষ্ঠ বা ভালো; তাই ‘আমি’ মাত্রই উত্তম পুরুষ। ‘আমি’ কখনো অধম-মধ্যম-ইতর হতে পারে না। অথচ, উত্তমপুরুষে লেখা রশীদ করীমের উপন্যাসগুলোর নায়ক ‘আমি’ নিজেকে কখনোই উত্তম দাবি করেনি। উত্তম নয়ও। ‘উত্তম পুরুষ’ উপন্যাসের শাকের আত্মপরিচয় বর্ণনে বলেছে, ‘আমি আদর্শ পুরুষ নই…যাকে বলে আত্মকেন্দ্রিক, আমি সেই বহু নিন্দিত জীব।’ আবার, ‘আমার যত গ্লানি’ উপন্যাসে এরফান মিঞা ওরফে এরফান চৌধুরী নিজের সম্পর্কে বলে, ‘আমি লোকটা আসলে একটা খচ্চর’। পাষণ্ড-পিশাচ-অনাদর্শ চরিত্রের রূপান্তর ঘটার প্রচলন রয়েছে আমাদের নাটক ও কথাসাহিত্যে। অমানুষের ‘মানুষ’ হয়ে ওঠা, কিংবা বিবেকহীনের বিবেক জাগ্রত হওয়ার দৃশ্য আমাদের সাহিত্যে প্রচুর। কিন্তু রশীদ করীম এই প্রথাসিদ্ধ পথ গ্রহণ করেননি। প্রাতিস্বিকতায় এগিয়েছেন নতুন পথে। যে কারণে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসমৃদ্ধ উপন্যাস ‘আমার যত গ্লানি’ পর্বেও খচ্চর এরফান মিঞা ওরফে এরফান চৌধুরীর চরিত্রের কোনো পরিবর্তন বা রূপান্তর ঘটেনি। সে ভয় ও কাপুরুষতার বৃত্ত ভেদ করে শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে স্বাধীনতার পক্ষে ‘জয় বাংলা উচ্চারণ করতে পারেনি। অনুরূপ, পুঁজিবাদী জীবনবাস্তবতায় লেখা ‘প্রেম একটি লাল গোলাপ’ উপন্যাসের রানু ও উমরের প্রেম আদর্শিক নয়। চিনি না উপন্যাসের সুলেমান কিংবা পদতলে রক্ত উপন্যাসের রেখাও মহৎ হতে পারেনি। রেখার পরিচয় নৃত্যশিল্পী হলেও বস্তুত সে একটা দেহজীবী নর্তকী। আর ‘মানুষের ইমোশনটাই সব নয়, মাথাটাও কাজ করে-বক্তব্য নিয়ে অগ্রসর হওয়া সুলেমান ধর্ষণ করে যুদ্ধে যাওয়া বাল্যবন্ধু বিমলের সুন্দরী স্ত্রী মন্দিরাকে। আমি ভূমিকায় অবতীর্ণ সুলেমান তার বাল্যসখীর মূল্যায়নে একটা ‘স্কাউন্ড্রেল; যা সুলেমানের জবানিতে পাঠকমহল জানতে পারে। তারপরও রশীদ করীমের সৃষ্ট চরিত্রগুলো পাঠকের ভালোবাসা হারায় না। বরং অর্জন করে অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও সহানুভূতি। কেন এই ভালোবাসা কিংবা শ্রদ্ধা ও সহানুভূতি? কারণ, আমাদের কথাসাহিত্যে একমাত্র রশীদ করীমই বলতে পেরেছেন, ‘আমি কোনো বাস্তবকে আদর্শায়িত করিনি অথবা কোনো আদর্শকে বাস্তবায়িত করি নি।’ উক্তিটি শুধু ‘উত্তম পুরুষ’ প্রসঙ্গে নয়, তার সব উপন্যাস সম্পর্কেই সত্য। তিনি মায়ের কাছে যাচ্ছি উপন্যাসে কামরুদ্দীন আহমদ ওরফে কামরু সাহেবের জবানিতে বলেছেন, ‘আমি তো জানি আমি একজন সাধারণ নির্দলীয় মানুষ মাত্র!; আবার ‘চিনি না’ উপন্যাসে সুলেমানের কণ্ঠে শুনি রশীদ করীমের জীবনদর্শনের সারকথা, কোনো মানুষকেই আমি তার আদর্শ বা মতবাদের জন্য অভিযুক্ত করি না- সেটা আমার আদর্শ বা মতবাদের যতোই বিরোধী হোক না কেন। বরং নিষ্ঠার সঙ্গে মতকে আঁকড়ে থাকেন বলে শ্রদ্ধা করি।
বাংলা সাহিত্যে কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য রশীদ করীম বাংলা একাডেমি পুরস্কার, লেখিকা সংঘ পুরস্কার পান, ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে অর্জন করেন রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ‘একুশে পদক’।
তার জীবদ্দশায় অনেক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তন্মধ্যে- আমার যত গ্লানি, একালের রূপকথা, সোনার পাথরবাটি, মায়ের কাছে যাচ্ছি, পদতলে রক্ত, প্রথম প্রেম, আর এক দৃষ্টিকোণ, মনের গহনে তোমার মুরতিখানি উল্লেখযোগ্য। রশীদ করীম ২০১১ খ্রিস্টাব্দের ২৫ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।

---------