সাইফুল্লাহ কায়সার »
মেথিকান্দা রেলস্টেশনের সকালের রোদটা আজ যেন একটু মলিন। যে প্ল্যাটফর্মটি গত পঁচিশ বছর ধরে এক নিঃশব্দ নারীর ঝাড়ুর ছোঁয়ায় প্রতিদিন ঝকঝকে হয়ে উঠত, আজ সেখানে ধুলোর আস্তরণ জমতে শুরু করেছে। যেন পুরো স্টেশনটি কাউকে খুঁজছে।
সেই মানুষটির নাম ছিল বুবি। তিনি কথা বলতে পারতেন না। কিন্তু তাঁর কাজই ছিল তাঁর ভাষা। প্রতিদিন ভোরে, যখন প্রথম ট্রেন আসার আগেই স্টেশন জেগে উঠত, বুবি হাতে একটি লম্বা ঝাড়ু নিয়ে প্ল্যাটফর্ম পরিষ্কার করতেন। যাত্রীরা কেউ তাঁকে দু-এক টাকা দিতেন, কেউ খাবার। এভাবেই চলছিল তাঁর জীবন।
অনেকে ভাবতেন, এই একাকী মানুষের আবার টাকার কী দরকার? কিন্তু বুবিরও একটি স্বপ্ন ছিল। হয়তো একদিন নিজের জন্য একটি ছোট্ট ঘর হবে, হয়তো কোনো হারিয়ে যাওয়া স্বজনের কাছে ফিরে যাবেন, অথবা শুধু ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্যই তিনি সঞ্চয় করতেন। কেউ জানত না তাঁর মনের কথা। শুধু জানত তাঁর ছেঁড়া কাপড়ের খুঁটে বাঁধা একটি ছোট প্লাস্টিকের ব্যাগের কথা। সেখানে তিনি দিনের পর দিন, বছরের পর বছর ধরে টাকা জমিয়েছিলেন। পঁচিশ বছরে সেই সঞ্চয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪০ হাজার টাকা। কিন্তু এক রাতে সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়।
গভীর রাতে কয়েকজন দুর্বৃত্ত বুবির আশ্রয়ে আসে। তারা তাঁর সঞ্চয়ের কথা জানত। টাকাটি ছিনিয়ে নেওয়ার সময় তারা তাঁর ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতন চালায়। অসহায় বুবি নিজের কষ্টের কথা কাউকে বলতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত তাঁর বহু বছরের সঞ্চয়ও হারিয়ে যায়, আর সেই আঘাত তিনি আর সইতে পারেননি।
পরদিন সকালে খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই পুরো স্টেশন স্তব্ধ হয়ে যায়। পুলিশ আসে, তদন্ত শুরু হয়। চায়ের দোকানি করিম মিয়া অনেকক্ষণ বুবির পুরোনো ঝাড়ুটি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। তাঁর মনে পড়ে যায়, কত ভোরে তিনি বুবিকে নিঃশব্দে কাজ করতে দেখেছেন। মানুষটি কখনো কারও কাছে কিছু চাননি। শুধু পরিশ্রম করে একটু একটু করে নিজের স্বপ্ন গড়ে তুলেছিলেন।
করিম মিয়ার মনে পড়ে যায় বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত-এর চলচ্চিত্র নিম অন্নপূর্ণা–র শেষ দৃশ্যের কথা, যেখানে একজন মানুষের মৃত্যুর পর অপরাধবোধ নীরবে তাড়া করে বেড়ায়।
তিনি ভাবেন, যারা বুবির স্বপ্ন কেড়ে নিল, তাদের মনেও কি কোনোদিন এমন অপরাধবোধ জাগবে? নাকি মানুষের লোভ তাদের আরও অন্ধ করে দেবে?
বুবির গল্প শুধু একজন দরিদ্র নারীর গল্প নয়। এটি আমাদের সমাজের এক গভীর সত্যের গল্প। যেখানে একজন মানুষ পঁচিশ বছর ধরে অল্প অল্প করে একটি স্বপ্ন গড়ে তোলেন, আর মুহূর্তের লোভে সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়।
মেথিকান্দা রেলস্টেশনে আজও যেন বুবির ঝাড়ুর শব্দ ভেসে আসে, আর ধুলোয় মিশে থাকা তাঁর অপূর্ণ স্বপ্ন আমাদের নীরবে প্রশ্ন করে, আমরা কি সত্যিই মানুষের কষ্ট বুঝতে শিখেছি?



















































