টপ নিউজ

ভূ-রাজনীতির বেড়াজালে বঙ্গোপসাগর

ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি থেকে ইন্দো বাদ কিসের ইঙ্গিত

রুশো মাহমুদ »

পৃথিবীর আয়তন প্রায় ২০ কোটি বর্গকিলোমিটার। তার মধ্যে প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি বর্গমাইল সমুদ্র। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ উপসাগর, বঙ্গোপসাগর। সমুদ্র উপকূলের দেশ বাংলাদেশ আর বঙ্গোপসাগর হলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক জীবনরেখা।

-advertise-

সমুদ্র যার বিশ্ব তার। সমুদ্র যার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, তার পক্ষে পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। স্থলভূমিতে যতই সম্পদ থাকুক না কেন, সমুদ্রপথে সম্পদ বিনিময় বা বাণিজ্য যত সহজ, অন্য কোন পথে অত সহজ নয়। একটি দেশ যদি দুনিয়ার বড় শক্তি হতে চায়, তবে তাকে তার আশেপাশের জলসীমায় নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে হবে – এই কথাগুলো বলেছেন উনিশ শতকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৌ রণকৌশলবিদ আলফ্রেড থায়ের মাহান।

আজকের দুনিয়ায় বিশ্ববাণিজ্যের ৯০ ভাগই হয় সমুদ্রপথে। সমুদ্র যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াই চলছে বড় শক্তিগুলোর মধ্যে।

একপাশে আটলান্টিক ও অন্যপাশে প্রশান্ত মহাসাগরের মত বিশাল জলরাশির অবস্থান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রে পরিণত করেছে।

অন্যদিকে একবিংশ শতকের রাজনীতিতে দক্ষিণ চীন সাগরের মত বিশাল জলরাশিকে কেন্দ্র করে চীন পরাশক্তি হিসেবে উত্থান নিশ্চিত করতে চাইছে।

ভৌগলিক কারণে সাগরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার যে ক্ষেত্র তার মধ্যে বাংলাদেশেও রয়েছে। সমুদ্র, সমুদ্রবন্দর বা সমুদ্রবাণিজ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে চলছে নানামুখি তৎপরতা। বাংলাদেশের দক্ষিণে ২১ লক্ষ ৭৩ হাজার বর্গ কিলোমিটার আয়তনের বিশাল জলরাশি রয়েছে বঙ্গোপসাগরে। অর্থনৈতিক গুরুত্বের কথা চিন্তা করলে দেখা যায় বঙ্গোপসাগরের এই জলরাশি কেবল একটি সমুদ্রপথ নয়, এখানে রয়েছে প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদসহ ব্যাপক হাইড্রোকার্বনের উপস্থিতি। ভূ-অর্থনৈতিক গুরুত্বের দিক থেকে বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের সমুদ্র অর্থনীতির এক বিরাট ভাণ্ডার।

বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কার মতো উদীয়মান দেশগুলো বঙ্গোপসাগরের বেসিনে অবস্থিত হওয়ায় এ অঞ্চলের কৌশগত গুরুত্ব বিশ্ব রাজনীতিতে অপরিমেয়।

ভূকৌশলগত অবস্থানের কারণে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের মতো বৃহৎ অর্থনীতি ও শক্তিশালী দেশগুলো নিজ নিজ স্বার্থ রক্ষায় বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে আগ্রহ প্রবল। বাংলাদেশের সমুদ্র অঞ্চল ও সমুদ্র সীমানা সঙ্গত কারণেই এখন বৈশ্বিক মনোযোগের মধ্যে রয়েছে। এদিকে পেন্টাগন সম্প্রতি ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি থেকে ইন্দো বাদ দিয়েছে। এটা কী ভূ-রাজনৈতিক এবং কৌশলগত পরিবর্তনের কোন ইঙ্গিত?

বঙ্গোপসাগরে কার কী স্বার্থ

চীন

চীনের লক্ষ্য হলো মহাপরিকল্পনা ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বাস্তবায়ন। বঙ্গোপসাগরের মত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে কৌশলগত ও অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। দক্ষিণ এশিয়ায় চীন চায় নিজের আধিপত্য।

বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের ৩০ শতাংশ বাণিজ্য শুধু দক্ষিণ-চীন সমুদ্র দিয়েই পরিচালিত হয়। প্রায় এক লাখ জাহাজ পণ্য সরবরাহ করে ভারত মহাসাগর থেকে আরব মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত বাণিজ্যপথ ধরে। এখানে নিজেদের কর্তৃত্ব, খবরদারি ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা চীনের নিজস্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য খুবই জরুরি। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের কর্তৃত্বের সুফল পেতে হলে বঙ্গোপসাগরেও তাদের জোড়ালো উপস্থিতি লাগবে।

চীনের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিক দুর্বলতা হলো তার জ্বালানি আমদানির রুট। চীনের রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারকদের পরিভাষায় এটি ‘মালাক্কা ডিলেমা’ নামে পরিচিত।

মালয় উপদ্বীপ ও ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের মাঝে অবস্থিত মালাক্কা প্রণালি বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ততম সামুদ্রিক পথ। এটি ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত বাণিজ্যিক পথ।

চীন, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার জ্বালানির জন্য একটি প্রধান গেটওয়ে বা প্রবেশপথ এই মালাক্কা প্রণালি। বর্তমানে চীনের আমদানিকৃত অপরিশোধিত খনিজ তেলের প্রায় ৮০ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে অত্যন্ত সংকীর্ণ ও সংবেদনশীল মালাক্কা প্রণালি হয়ে চীনের মূল ভূখণ্ডে পৌঁছায়। এই নির্ভরশীলতাকে মালাক্কা ডিলেমা বা দ্বিধা বা উভয়সঙ্কট হিসেবে উল্লেখ করে বেইজিং।

ভবিষ্যতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্রদের সঙ্গে কোনো ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা,  আঞ্চলিক যুদ্ধ বা দক্ষিণ চীন সাগরে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত তৈরি হলে শত্রুভাবাপন্ন শক্তিগুলো এই মালাক্কা প্রণালি অবরুদ্ধ করে দিতে পারে। এমনটা ঘটলে চীনের সামগ্রিক অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়বে।

এই ‘মালাক্কা ডিলেমা’ থেকে স্থায়ী মুক্তি পাওয়ার জন্য চীনের জন্য ভারত মহাসাগরে সরাসরি এবং বিকল্প প্রবেশাধিকার প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। সম্প্রতি বাংলাদেশকে দেওয়া প্রস্তাবিত (বিএমসিইসি) করিডরটি চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ল্যান্ডলকড প্রদেশ কুনমিংকে সরাসরি বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করবে। এর ফলে চীন মালাক্কা প্রণালি সম্পূর্ণ এড়িয়ে সরাসরি ভারত মহাসাগরের কৌশলগত জলসীমায় প্রবেশ করতে পারবে।

বিদ্যমান চীন-মিয়ানমার করিডরের আওতায় বাংলাদেশের সেন্টমার্টিন দ্বীপের কিছুটা দক্ষিণ-পূর্বে রাখাইনের (আরাকান) সিত্তওয়ে (আকিয়াব) বন্দরের কাছে মেড দ্বীপে জ্বালানি তেলের টার্মিনাল তৈরি করেছে চীন। এই টার্মিনাল থেকে কুনমিং পর্যন্ত বসানো হয়েছে দীর্ঘ পাইপলাইন। একই সঙ্গে চীন পাশের চকপিউ (Kyaukphyu) দ্বীপে গভীর সমুদ্রবন্দর এবং এর লাগোয়া অঞ্চলে স্পেশাল ইকোনমিক জোনও তৈরি করেছে।

চীন মালাক্কা প্রণালির বিকল্প হিসেবে মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, মালদ্বীপ বা বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে বিকল্প পথের সন্ধান করে যাচ্ছে। চীন ইতোমধ্যে পাকিস্তানের ভেতর দিয়ে আরব সাগরের দরজায় পৌঁছে গেছে। সিপিইসি বা চীন-পাকিস্তান  ইকোনোমিক করিডরের আওতায় পাকিস্তানে তৈরি হয়েছে গোয়াদার গভীর সমুদ্র বন্দর। যা চীনের উত্তর-পশ্চিম জিনজিয়াং অঞ্চলকে যুক্ত করছে। নির্মিত হয়েছে ৩,০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ মহাসড়ক, রেলপথ এবং পাইপলাইন নেটওয়ার্ক।

ভারত

ভারতের স্বার্থ হলো বঙ্গোপসাগর  ও বাংলাদেশের ট্রানজিট ব্যবহার করে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় সেভেন সিস্টার্স আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, মণিপুর, অরুণাচল, মিজোরাম ও নাগাল্যান্ডে পণ্য পৌঁছে দেয়া ও বঙ্গোপসাগরসহ এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের কৌশলগত আধিপত্য বিস্তারকে চ্যালেঞ্জ করে ভারতের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। ভারত চায় চীনের সিল্ক রুটের বিপরীতে তাদের ইকোনমিক কটন রুট বাস্তবায়ন করতে। ভারত তার ‘পূবে তাকাও’ নীতির নিরিখে চীনের দীর্ঘদিনের মিত্র মিয়ানমারের সাথে সখ্য গড়ে তোলার কাজে নিয়োজিত রয়েছে।

বাংলাদেশের সীমান্তের দক্ষিণে রাখাইনের যে সরু উত্তর-পূর্বমুখি ভূখণ্ড রয়েছে, তার মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত কালাদান নদী। নদীটি ভারতের মিজোরাম ও মিয়ানমারের চিন ও রাখাইন রাজ্যের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সিত্তওয়ে বা আকিয়াবকে ছুঁয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। এ নদীকে ঘিরে বাস্তবায়িত হচ্ছে ভারতের ‘কালাদান মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট’। কখনও ‘চিকেন নেক’ অথবা বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ট্রানজিট পথে পূর্ব ভারতে মালামাল পরিবহন বাধাগ্রস্ত হয়, সেক্ষেত্রে ‘কালাদান প্রকল্প’ হবে বিকল্প পথ।

জাপান

২০০০ সাল থেকে জাপান ও ভারতীয় উপকূলীয় নিরাপত্তা রক্ষীরা বঙ্গোপসাগরে নিয়মিতভাবে সমুদ্র মহড়া পরিচালনা করছে। বিগ-বি হলো বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে জাপান সরকারের প্রস্তাবিত ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ’ (Bay of Bengal Industrial Growth) উদ্যোগ। ২০১৪ সালে গৃহীত এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের শিল্প ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোর উন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করার মাধ্যমে দেশটিকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি বাণিজ্যিক হাব হিসেবে গড়ে তোলা।

এই উদ্যোগটি মূলত তিনটি প্রধান লক্ষ্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমত চট্টগ্রামকে একটি প্রধান শিল্পনগরী ও বন্দর হিসেবে ব্যবহার করে আমদানি-রফতানির প্রবাহ বজায় রাখা। দ্বিতীয়ত মাতারবাড়ী অঞ্চলে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনসহ জ্বালানি খাতের উন্নয়ন। তৃতীয়ত ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজারসহ আশেপাশের অঞ্চলগুলোকে সংযুক্ত করে একটি শক্তিশালী পরিবহন ও সাপ্লাই চেইন নেটওয়ার্ক তৈরি করা।

জাপান তাদের আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা জাইকার মাধ্যমে এই কাজগুলো করছে। বঙ্গোপসাগরে টোকিওর উপস্থিতি শক্তিশালী করবার লক্ষ্যে জাপান এসব প্রকল্পে অর্থায়ন করছে।

জাপান কোয়াডের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। কোয়াড (QUAD) হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং ভারতের মধ্যে একটি অনানুষ্ঠানিক কৌশলগত নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক জোট। এই জোট ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও আধিপত্য প্রতিহত করার লক্ষ্যে কাজ করে থাকে।

জাপান একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে তার পণ্যের বাজার সৃষ্টিসহ জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ রুটকে বৃহৎ শক্তি চীনের নিয়ন্ত্রণ হতে মুক্ত রাখতে চায়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার একক আধিপত্যের হুমকি হিসেবে চীনের উত্থানের বিপরীতে  এবং এই অঞ্চলে চীনের আধিপত্য যেন শক্তিশালী হতে না পারে সেজন্য ভারসাম্য কৌশল গ্রহণ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির (আইপিএস) মূল লক্ষ্য হলো এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব প্রতিহত করা। এই স্ট্র্যাটেজির মূল রূপকার ছিলেন জাপানের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে, যিনি চেয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়া, ভারত, জাপান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো একজোট হয়ে কাজ করুক, যাতে একনায়কতান্ত্রিক চীন দক্ষিণ চীন সাগরকে সম্পূর্ণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ‘লেক বেইজিং’-এ পরিণত করতে না পারে।

পেন্টাগন অতি সম্প্রতি ইন্দো-প্যাসিফিক থেকে ইন্দো বাদ দিয়েছে। ‘ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড’ এর নাম পরিবর্তন করে পুনরায় আগের নাম প্যাসিফিক কমান্ড বা প্যাকম করেছে।

দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক ডেরেক গ্রসম্যান সাম্প্রতিক এক নিবন্ধে লিখেছেন, এই নাম পরিবর্তনের পেছনে কেবলই সামরিক ঐতিহ্যের চেয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রশাসনের এক গভীর ভূ-রাজনৈতিক এবং কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

এই পদক্ষেপটি মূলত চীনের সাথে তীব্র প্রতিযোগিতার পথ পরিহার করে এক ধরনের দ্বিপক্ষীয় বোঝাপড়া ও চুক্তিভিত্তিক কূটনীতির দিকে ট্রাম্পের ঝুঁকে পড়ার প্রবণতাকে প্রতিফলিত করে।

ডেরেক গ্রসম্যান সেই নিবন্ধের উপসংহার টেনেছেন এই বলে যে, ‘ইন্ডোপ্যাকম’ লেবেলটি পরিত্যাগ করা আসলে কোনো ভৌগোলিক সীমানার পরিবর্তন নয়, বরং এটি একটি গভীর কৌশলগত পরিবর্তন। এর মাধ্যমে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, ট্রাম্প প্রশাসন চীনের উত্থানের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদী কোনো বহুপক্ষীয় জোট গঠনে আগ্রহী নয়, বরং তারা তাৎক্ষণিক কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জনের জন্য দ্বিপক্ষীয় ও লেনদেনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে।

অথচ ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ ধারণাটি ভারতকে একটি প্রধান অংশীদার হিসেবে দেখা, বহুপক্ষীয় জোট গঠনকে শক্তির উৎস মনে করা এবং চীনের সাথে দীর্ঘমেয়াদী প্রতিযোগিতাকে শতাব্দীর প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে গণ্য করার প্রতীক ছিল।

বাংলাদেশ কী করবে

তীব্র ত্রিভুজ ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মুখে বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো বেইজিং, নয়াদিল্লি এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করা। কোনো একটি পক্ষের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে না পড়ে নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এবং অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করা বাংলাদেশের কূটনীতির জন্য এখন একটি মস্ত বড় পরীক্ষা।

প্রবল পক্ষসমূহের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মাঝখানে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশই বা কী কৌশল গ্রহণ করবে? সময়টা চীন-আমেরিকার বাণিজ্যযুদ্ধের! আমাদের একটাই ভয় যেন অন্য যুদ্ধ না হয়।

লেখক: সম্পাদক, সুপ্রভাত বাংলাদেশ