বিজনেস

বেসরকারি খাতের উন্নয়নে প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে গভর্নরের মতবিনিময়

নিজস্ব প্রতিবেদক >>

দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠন, টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ যথাযথভাবে বাস্তবায়নে চট্টগ্রামে অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

---------

শনিবার (৮ আগস্ট) হোটেল রেডিসন ব্লু চট্টগ্রামের ‘নীলগিরি হল’-এ বাংলাদেশ ব্যাংক, চট্টগ্রাম এ সভার আয়োজন করে।

সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, এফসিএমএ। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদ এবং প্রধান কার্যালয়ের নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম। সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংক, চট্টগ্রামের নির্বাহী পরিচালক মো. হানিফ মিয়া।

বর্তমান বৈশ্বিক মন্দা ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নেওয়া ৬০ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কর্মসূচি বাস্তবায়নে ব্যাংক ও উদ্যোক্তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণের গুরুত্ব সভায় তুলে ধরা হয়। এতে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন চেম্বারের প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী সমিতির নেতৃবৃন্দ, উদ্যোক্তা, সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের প্রতিনিধি এবং সব ব্যাংকের আঞ্চলিক প্রধানরা অংশ নেন।

সভায় ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-১-এর পক্ষ থেকে একটি প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের বিভিন্ন খাত, সুদের হার, সুযোগ-সুবিধা ও প্রয়োজনীয়তা বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।

প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় মোট ৬০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে এবং ৪১ হাজার কোটি টাকা তফসিলি ব্যাংকের উদ্বৃত্ত তারল্য থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

ব্যাংকের উদ্বৃত্ত তারল্য থেকে গঠিত ৪১ হাজার কোটি টাকার স্কিমের মধ্যে বন্ধ শিল্প ও সেবা খাতে ২০ হাজার কোটি টাকা, কৃষি ও পল্লি অর্থনীতি খাতে ১০ হাজার কোটি টাকা, সিএমএসএমই উন্নয়ন খাতে ৫ হাজার কোটি টাকা, রপ্তানি বহুমুখীকরণ খাতে ৩ হাজার কোটি টাকা এবং উত্তরাঞ্চল কৃষি হাব খাতে ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত ১৯ হাজার কোটি টাকার স্কিমের মধ্যে প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট পুনঃঅর্থায়ন খাতে ৫ হাজার কোটি টাকা, কটেজ ও মাইক্রো খাতে ৫ হাজার কোটি টাকা, হিমায়িত চিংড়ি ও মাছ রপ্তানি খাতে ২ হাজার কোটি টাকা, চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা রপ্তানি খাতে ২ হাজার কোটি টাকা, বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতে ১ হাজার কোটি টাকা, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান খাতে ১ হাজার কোটি টাকা, গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড খাতে ১ হাজার কোটি টাকা, পরিবেশবান্ধব পুনঃঅর্থায়ন খাতে ১ হাজার কোটি টাকা, সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশে ৫০০ কোটি টাকা এবং স্টার্টআপ খাতে অর্থায়নে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, এই প্রণোদনা প্যাকেজগুলো শুধু ঋণ সহায়তা নয়, বরং একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক পরিবর্তনের রূপরেখা। এ উদ্যোগের মাধ্যমে প্রায় ২৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘এক গ্রাম এক পণ্য’ নীতির মাধ্যমে চট্টগ্রামের উপকূলীয় ও পার্বত্য অঞ্চলের সম্ভাবনাময় পণ্যগুলোকে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দেওয়া হবে। পাশাপাশি শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি আয় বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হবে।

গভর্নর আরও বলেন, বর্তমানে প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় ৩১টি রিফাইন্যান্স ও প্রি-ফাইন্যান্স প্যাকেজ চলমান থাকলেও পর্যাপ্ত প্রচারণার অভাবে প্রকৃত উদ্যোক্তারা অনেক সময় এসব সুযোগ-সুবিধার সঠিক তথ্য পান না। ফলে অনেক প্রণোদনা প্যাকেজের বিপুল অর্থ অব্যবহৃত পড়ে থাকে।

তিনি উপস্থিত উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও ব্যাংকারদের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ সম্পর্কে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির আহ্বান জানান।

চট্টগ্রাম অফিসের পরিচালক (পরিদর্শন)-এর সঞ্চালনায় প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী প্রশ্নোত্তর পর্বে উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও ব্যাংকের আঞ্চলিক প্রধানরা বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করেন। গভর্নর সরাসরি এসব প্রশ্নের উত্তর দেন।

সভায় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বারের সহসভাপতি ও বিজিএমইএর সদস্য মারুফ চৌধুরী জানান, অতীতে তালিকাভুক্ত ৬ হাজারের বেশি কারখানার মধ্যে বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ৭০০টি প্রতিষ্ঠান টিকে রয়েছে। তিনি রুগ্ণ শিল্প পুনরুজ্জীবনে উন্নত বিশ্বের মতো ‘সিক ইন্ডাস্ট্রিজ ল’ (Sick Industries Law) প্রণয়নের প্রস্তাব দেন।

জবাবে গভর্নর বলেন, প্রচলিত মর্টগেজভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা খেলাপি ঋণ কমাতে ব্যর্থ হয়েছে। একই সঙ্গে বন্ধকি সম্পত্তি থেকে খেলাপি ঋণ আদায়ের হারও সন্তোষজনক নয়। তাই মর্টগেজভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের পরিবর্তে ক্যাশ ফ্লো (Cash Flow) ভিত্তিক ঋণ বিতরণের পরামর্শ দেন তিনি।

তিনি প্রণোদনা কর্মসূচি সফল করতে ব্যাংক, শিল্পপতি ও উদ্যোক্তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার আহ্বান জানান। পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং কর্মসূচির সুফল প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছে দিতে গণমাধ্যমের সক্রিয় সহযোগিতা কামনা করেন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদ বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, শ্লথ জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব মোকাবিলায় ঘোষিত এই প্রণোদনা প্যাকেজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সভায় বাংলাদেশ ব্যাংক চট্টগ্রাম অফিসের পরিচালক (প্রশাসন) স্বরূপ কুমার চৌধুরী, পরিচালক (পরিদর্শন) মো. নুরুল আলম, পরিচালক (ব্যাংকিং) ইয়াসমিন রহমান বুলা, পরিচালক (বৈদেশিক মুদ্রা) মাহবুবুল রহমানসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।