মতামত সম্পাদকীয়

পাখির জুম- এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত

অস্থিরতা, পরশ্রীকাতরতা আর ভোগবাদী মানসিকতার প্রভাবে চারপাশের সমাজ যখন ক্রমশ স্বার্থপর হয়ে উঠছে, ঠিক তখনই বান্দরবানের পার্বত্য ভূমিতে একদল তরুণের মানবিক ও স্পর্শকাতর উদ্যোগ যেন এক চিলতে স্নিগ্ধ বাতাস নিয়ে এলো। নীলাচল পর্যটনকেন্দ্র-সংলগ্ন টাইগারপাড়ায় ‘গ্রিন মিলিউ ইয়ুথ অর্গানাইজেশন’-এর তরুণেরা প্রকৃতির এক অনন্য নিবেদন হিসেবে গড়ে তুলেছেন ‘পাখির জুম’। ষাট শতক পাহাড়ি জমিতে ফলানো ধান, ভুট্টা, মারফা, চিনার কিংবা তিল-তিসি—কোনো ফসলই মানুষের খাদ্যতালিকার জন্য নয়; পুরোটাই বনের পাখি আর বন্য প্রাণীদের আহার। নিখাদ ভালোবাসা আর পরিবেশ প্রতিবেশের প্রতি নিঃস্বার্থ দায়বদ্ধতার এমন নজির বর্তমান সময়ে কেবল বিরল নয়, চরম অনুকরণীয়।
নিজেদের শ্রমে ঝোপঝাড় কেটে জমি প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে বীজ বপন ও আগাছা দমন—সব কাজই তরুণেরা করেছেন নিজেদের উদ্যোগে, কোনো আর্থিক অনুদান না নিয়ে। আধুনিক সমাজ যখন প্রকৃতির বুক থেকে কেবল শুষে নিতে ব্যস্ত, তখন এই স্বেচ্ছাসেবী দল প্রকৃতির গৃহহীন ও খাদ্যসংকটে থাকা প্রাণীদের জন্য নিজেদের ঘাম ঝরাচ্ছেন। এমনকি মারমাদের ঐতিহ্যবাহী ‘আবংমাহ পূজা’র মাধ্যমে প্রকৃতির ভালো ফলন ও জীববৈচিত্র্যের মঙ্গল কামনা করার মধ্যে ফুটে উঠেছে লোকজ সংস্কৃতি ও পরিবেশভাবনার এক অপূর্ব মেলবন্ধন।
সংকটাপন্ন বাস্তুসংস্থান আর নগরায়নের থাবায় বন্য প্রাণীরা আজ নিজ বাসভূমে পরবাসী। বন উজাড় ও মানবসৃষ্ট নানা সংকটে বনের পশুপাখি প্রতিদিন খাদ্যহীন হয়ে পড়ছে। সেই বাস্তবতায় টাইগারপাড়ার এই জুমখেত কেবল পশুপাখির আহারের সংস্থান নয়, এটি প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত। বনের স্তন্যপায়ী প্রাণী, কাঠবিড়ালি কিংবা বিভিন্ন পাখির জন্য নির্দিষ্ট শস্যের জোগাড় রেখে পরিবেশের প্রতিটি উপাদানের অস্তিত্বকে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে এই প্রকল্পে।
আমাদের নীতি-নৈতিকতা ও সহমর্মিতার চর্চা যখন কেবল মানুষের গণ্ডির ভেতরেই থমকে দাঁড়িয়েছে (বা ক্ষেত্রবিশেষে সেখান থেকেও মুছে যাচ্ছে), তখন এই তরুণদের পরিবেশবান্ধব ভাবনা সমাজকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দেয়। প্রকৃতি কেবল মানুষের ভোগের বস্তু নয়, এর প্রতিটি প্রাণীর টিকে থাকার সমান অধিকার রয়েছে—এই অমূল্য সত্যটি তাঁরা নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিলেন।
স্বার্থপরতার এই অন্ধকার সময়ে ‘পাখির জুম’ আলোর দিশারি হয়ে উঠেছে। গ্রিন মিলিউ ইয়ুথ অর্গানাইজেশনের তরুণ-তরুণীদের এই নিঃস্বার্থ মহোদ্যোগকে আন্তরিক সাধুবাদ জানাই। দেশের অন্যান্য অঞ্চল ও সামাজিক সংগঠনগুলোর জন্যও এই প্রয়াস একটি দূরদর্শী রোল মডেল। তরুণদের এমন কাজের বিস্তার ঘটুক পুরো দেশে; মানুষ ও প্রকৃতির এই সুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ুক সর্বত্র।

---------