প্রতিটি মানুষের দিন শুরু হয় একটি সুস্থ ও পরিচ্ছন্ন জীবনের প্রত্যাশা নিয়ে। কিন্তু অতিপ্রয়োজনীয় দৈনিক অনুষঙ্গ টুথপেস্ট যখন বিষের বাহক হয়ে দাঁড়ায়, তখন নাগরিক জীবন গভীর উদ্বেগে নিমজ্জিত না হয়ে পারে না। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাজারে প্রচলিত ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতেই মিলেছে বিপজ্জনক মাইক্রোপ্লাস্টিক। যা দিয়ে আমরা প্রতিদিনের সূচনা করি, তাতেই যদি লুকিয়ে থাকে এমন ক্ষতিকর উপাদান—তবে এ দেশে জনস্বাস্থ্যের ভবিষ্যৎ কোন আঁধারে ধাবিত হচ্ছে, তা ভেবে দেখা জরুরি।
মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো প্লাস্টিকের অতি সূক্ষ্ম কণা, যা খালি চোখে দেখা কঠিন হলেও এর প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ। বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, মুখগহ্বরের পাতলা মিউকাস মেমব্রেন ভেদ করে এসব প্লাস্টিক কণা সহজেই মানবদেহের রক্তসংবহন তন্ত্রে ঢুকে পড়তে পারে। দীর্ঘমেয়াদে তা লিভার, কিডনি বিকল করার পাশাপাশি হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে এবং ক্যান্সারের মতো দূরারোগ্য ব্যাধির ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমরা নিজেদের অজান্তেই শিশুদের মুখে বিষ তুলে দিচ্ছি না তো?—এই প্রশ্নটি এখন প্রতিটি পরিবারকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।
একটি দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রধানতম স্তম্ভ হলো ভেজালমুক্ত খাদ্য ও নিত্যপণ্য নিশ্চিত করা এবং কঠোর গুণমান নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু আমাদের দেশের বর্তমান চিত্রটি অত্যন্ত হতাশাজনক। বাজারে কোন পণ্যটি মানসম্মত আর কোনটি ক্ষতিকর, তা যাচাইয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর নজরদারি ও কার্যকারিতা আজ বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে। বাজারে এমন একটি সংবেদনশীল পণ্যে বছরের পর বছর বিষাক্ত প্লাস্টিক বহাল তবিয়তে বিকোচ্ছে, অথচ প্রশাসনের চোখে তা পড়ছে না কিংবা ধরা পড়লেও দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না। আইন ও মনিটরিংয়ের এই দুর্বলতাই অসাধু ব্যবসায়ী চক্রকে মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার সাহস জুগিয়ে যাচ্ছে।
সুস্থ নাগরিক ছাড়া কোনো জাতির সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্ভব নয়। তাই এই সংকটকে কেবল একটি সাধারণ বাজারসংক্রান্ত সমস্যা হিসেবে দেখার অবকাশ নেই; এটি একটি জাতীয় স্বাস্থ্য সংকট। অবিলম্বে এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। যে ২৬টি টুথপেস্টে বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে, সেগুলোর উৎপাদন ও বিক্রি দ্রুত বন্ধ করতে হবে এবং বাজার থেকে সেগুলো সরিয়ে নিতে হবে। দোষী প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় মাননিয়ন্ত্রণ সংস্থাকে নিয়মিত আধুনিক ল্যাব পরীক্ষার মাধ্যমে পণ্যের গুণগত মান যাচাই এবং তার ফলাফল জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে। ক্ষতিকর উপাদানের বিরুদ্ধে জনগণকে সোচ্চার করতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচার চালাতে হবে।
দিনের সূচনাতেই যেখানে বিষের ছোবল, সেখানে সার্বিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষা কেবল অলীক কল্পনা। রাষ্ট্রের প্রাথমিক দায়িত্ব তার নাগরিকদের জীবনকে নিরাপদ রাখা। প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তারা যদি এখনই কঠোর হতে ব্যর্থ হন, তবে এক রুগ্ণ ও অসুস্থ প্রজন্ম রেখে যাওয়া ছাড়া জাতির জন্য আর কিছু বাকি থাকবে না। সময় এসেছে চোখ মেলবার এবং কঠোর হস্তে ব্যবস্থা নেয়ার।
মতামত সম্পাদকীয়



















































