মতামত সম্পাদকীয়

জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তরে চাই কার্যকর কৌশল

গতকাল ১১ জুলাই পালিত হলো বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। দিবসটি উপলক্ষে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন দেশের ভবিষ্যৎ ডেমোগ্রাফিক বা জনসংখ্যাগত কাঠামোর এক উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এনেছে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আমাদের জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম কার্যত ঝিমিয়ে পড়েছে। মাঠপর্যায়ে তীব্র জনবল সংকট এবং সচেতনতামূলক প্রচারণার অভাবে তৃণমূল পর্যায়ে পরিবার পরিকল্পনা সেবা স্থবির হয়ে পড়েছে। বর্তমানে ২০২৬ সালে এসে দেশের জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭.৯৩ কোটিতে, যা আগামী ২০৩৬ সালের মধ্যে ১৯.৯০ কোটিতে পৌঁছাবে বলে প্রক্ষেপণ করা হচ্ছে। এই বিপুল জনসংখ্যার চাপ সামলানোর মতো টেকসই প্রস্তুতি আমাদের আছে কি না, তা নিয়ে এখনই ভাবার সময় এসেছে।
একসময় বলা হতো ‘জনসংখ্যাই সম্পদ’। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপটে এই ধারণা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে। একদিকে অভ্যন্তরীণভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের স্থবিরতা, অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির অভাবনীয় উত্থান—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে বিপুল জনসংখ্যা অদূর ভবিষ্যতে দেশের জন্য বড় ‘বোঝা’ হয়ে উঠতে পারে।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে এআই ও অটোমেশনের কারণে বিশ্বজুড়ে শ্রমবাজারের সমীকরণ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। যেসব সনাতনী বা কায়িক শ্রমের ওপর ভর করে বাংলাদেশ এতকাল মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে জনশক্তি রপ্তানি করে আসছিল, সেই বাজারগুলো সংকুচিত হয়ে আসছে। প্রযুক্তির উৎকর্ষের কারণে আগামী দিনগুলোতে অনুন্নত বা আধা-দক্ষ জনশক্তির চাহিদা বিশ্ববাজারে মারাত্মকভাবে কমে যাবে। এর ফলে একদিকে যেমন রেমিট্যান্স প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে, অন্যদিকে দেশের ভেতরে বিপুল কর্মক্ষম বেকারের সংখ্যা তৈরি হবে।
এই সংকটময় পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাষ্ট্রকে দ্বিমুখী কৌশল অবলম্বন করতে হবে।
যেমন, ঝিমিয়ে পড়া জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে অনতিবিলম্বে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। মাঠপর্যায়ে জনবল সংকট দূর করে শূন্যপদগুলো দ্রুত পূরণ করা আবশ্যক। আধুনিক ও ডিজিটাল মাধ্যমে প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনার বার্তা প্রতিটি ঘরে পৌঁছাতে হবে।
প্রথাগত শিক্ষার চেয়ে প্রযুক্তিগত ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আমাদের যুবসমাজকে এআই, ডেটা সায়েন্স, কোডিং, এবং আধুনিক ফ্রিল্যান্সিং কাজের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে, যেন তারা এআই-এর যুগেও বৈশ্বিক শ্রমবাজারে টিকে থাকতে পারে।
জনসংখ্যাকে সম্পদে রূপান্তর করতে না পারলে তা দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ ও সমাজ ব্যবস্থার ওপর মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনবে। নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে, সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে। সঠিক পরিকল্পনা ও দ্রুত বাস্তবায়নই কেবল পারে এই সম্ভাব্য জনমিতিক বিপর্যয় থেকে দেশকে রক্ষা করতে।

-advertise-