সুপ্রভাত ডেস্ক »
ঈদুল আজহা এলেই কোরবানির পশুর চামড়া ঘিরে নতুন আশায় বুক বাঁধেন মৌসুমি ব্যবসায়ী, মাদ্রাসা ও এতিমখানার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। বছরের এই একটি সময়েই কিছু বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয় তাদের জন্য। কিন্তু এবারও সেই আশায় বড় ধাক্কা লেগেছে। সরকার মূল্য নির্ধারণ করলেও বাজারে তার কোনো কার্যকর প্রতিফলন দেখা যায়নি।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক কমে বিক্রি হয়েছে কাঁচা চামড়া। ফলে চামড়া সংগ্রহ করে বড় আড়ত ও ট্যানারিতে বিক্রি করতে গিয়ে লোকসানে পড়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।
একই সঙ্গে প্রত্যাশিত দাম না পেয়ে হতাশ মাদ্রাসা ও এতিমখানার কর্তৃপক্ষও। কোথাও কোথাও কম দামে বিক্রি করতে না পেরে কাঁচা চামড়া ফেলে দিতেও দেখা গেছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ডাস্টবিন ও নর্দমায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কাঁচা চামড়ার বাজার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করছে ট্যানারি মালিক ও বড় আড়তদারদের একটি শক্তিশালী চক্র। মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ীরা তাদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বাধ্য হয়েই কম দামে চামড়া কিনছেন এবং পরে আরও কম দামে বিক্রি করছেন।
এতিমখানা ও মাদ্রাসাগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত
কোরবানির পশুর চামড়া শুধু একটি পণ্যের নাম নয়, এটি দীর্ঘদিন ধরে গরিব, এতিম ও মাদরাসা ভিত্তিক সামাজিক সহায়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। প্রতি বছর কোরবানিদাতাদের বড় একটি অংশ পশুর চামড়া মাদ্রাসা, এতিমখানা কিংবা অসচ্ছল মানুষের কল্যাণে দান করেন। সেই চামড়া বিক্রির টাকায় বছরের বিভিন্ন সময় এতিমদের খাবার, শিক্ষা ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার খরচের একটি অংশ জোগাড় হয়। ফলে চামড়ার দাম যত কমে, সরাসরি ততটাই কমে যায় গরিব ও এতিমদের প্রাপ্য অর্থ। বাজারে চামড়ার দরপতন মানে শুধু একটি শিল্পখাতের সংকট নয়, এর প্রভাব গিয়ে পড়ে সমাজের সবচেয়ে অসহায় মানুষের ওপর।
এদিকে কোরবানির সময় কাঁচা চামড়ার দাম ঠিক রাখতে এবারও সরকার দাম নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু নির্ধারিত দামের প্রতিফলন বাজারে দেখা যায়নি। ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি এতিমখানা ও মাদ্রাসাগুলো।
অনেক প্রতিষ্ঠান প্রত্যাশার তুলনায় অর্ধেকেরও কম অর্থ পেয়েছে, কোথাও কোথাও চামড়া বিক্রি করতেই পারেননি সংশ্লিষ্টরা।
রাজধানীর মগবাজারের বাসিন্দা হাসানুর রহমান বলেন, কেউ কিনতে আসেনি আমরা চামড়া মাদ্রাসায় দিয়ে দিয়েছি। আমার মামার প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার টাকার গরুর চামড়াও গতকাল রাত পর্যন্ত কেউ নেয়নি। পরে সেটাও মাদ্রাসায় দেওয়া হয়েছে। আর পুরান ঢাকায় আমার ভাই ১ লাখ ৪৩ হাজার টাকার গরুর চামড়া মাত্র ৩০০ টাকায় বিক্রি করেছে।
সরকার নির্ধারিত দাম বাজারে অকার্যকর
সরকার এবার ঢাকায় গরুর লবণযুক্ত চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করে দেয়, যা গত বছরের তুলনায় ২ টাকা বেশি। কিন্তু বাস্তবে সেই দাম কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। শুধু তাই নয় গত বছরের চেয়েও এবার কম দামে বিক্রি হয়েছে কোরবানির পশুর চামড়া।
রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকার বাজারে গত বছরের তুলনায় প্রতি পিস গরুর চামড়া ১৫০ থেকে ২০০ টাকা কমে বিক্রি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এছাড়া এবারও ছাগলের চামড়া কিনতে তেমন আগ্রহ দেখাননি ব্যবসায়ীরা
ট্যানারি-আড়তদার সিন্ডিকেটের অভিযোগ
চামড়ার বাজার নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন পুরোনো ব্যবসায়ী আবুল হাসান। তিনি বলেন, ২৫-৩০ বছর আগে একটা চামড়া বিক্রি করেছি ২৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকায়। ওই সাইজের গরুর চামড়া এখন বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায়। ৪০০ টাকার চামড়া কিনে শ্রমিকের খরচও ওঠে না। এই ব্যবসা করবে কে? এই খাত ধ্বংস করা হচ্ছে।
পাশেই থাকা আরেক মৌসুমি ব্যবসায়ী প্রশ্ন তুলে বলেন, চামড়ার জুতার দাম কি কমেছে? কমেনি। তাহলে গরুর চামড়ার দাম এত কম কেন? এখানে কোনো সিন্ডিকেট কাজ করছে, অথবা এই শিল্পটা ধ্বংস করার পাঁয়তারা চলছে।
যদিও ট্যানারি মালিকরা বলছেন, বাজারে খুব বেশি সমস্যা হয়নি। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, এই ধরনের বিচ্ছিন্ন ঘটনা প্রতি বছরই ঘটে। তবে এখন পর্যন্ত যতটুকু চামড়া সংগ্রহ হয়েছে, তাতে আমরা মনে করি গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার ব্যবস্থাপনা ভালো ছিল। গতকাল পর্যন্ত ৬০০ থেকে ৮০০ টাকায় চামড়া কেনা হয়েছে। এর সঙ্গে লবণ ও আড়তের খরচ যোগ করলে সরকার নির্ধারিত দামের মধ্যেই পড়ে।
তবে মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ী ও মাদ্রাসা সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ ভিন্ন চিত্রই তুলে ধরছে। তাদের দাবি, সরকার প্রতিবছর দাম নির্ধারণ করলেও বাস্তব বাজারে সেই দামের কোনো কার্যকর বাস্তবায়ন নেই। ফলে কোরবানির চামড়া ঘিরে যে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার কথা ছিল, তা বরাবরের মতোই চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে। আর এর সবচেয়ে বড় খেসারত দিতে হচ্ছে গরিব, এতিম ও ছোট ব্যবসায়ীদের।




















































