চট্টগ্রামে অত্যন্ত অল্প সময়ের ব্যবধানে চাঞ্চল্যকর দুটি নির্মম অপরাধের রায় ঘোষিত হয়েছে| ৫ বছরের শিশু আলিনা ইসলাম আয়াতকে অপহরণ ও নৃশংসভাবে হত্যার দায়ে আবীর আলী নামের এক আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং বাকলিয়ায় শিশু ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত মুনির হোসেনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত| প্রথম মামলাটির বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হতে সাড়ে তিন বছর সময় লাগলেও, বাকলিয়ার ধর্ষণ মামলাটির বিচারকাজ শেষ হয়েছে মাত্র ৮ কর্মদিবসে| গত ২১ মে যে ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো বাকলিয়া উত্তাল হয়ে উঠেছিল, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে পুলিশসহ অর্ধশত মানুষ আহত হয়েছিল, সেই ঘটনার মাত্র এক মাসের মাথায় অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত হওয়া দেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত|
এই দুটি রায় স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র, প্রশাসন, তদন্তকারী সংস্থা এবং আদালত যদি আন্তরিকভাবে সচেষ্ট হয়, তবে দেশের বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা কাটিয়ে অত্যন্ত দ্রুততম সময়ে রায় প্রদান করা সম্ভব| আমাদের দেশে বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকা যেখানে একটি নিয়মিত চিত্র, সেখানে মাত্র ৮ কর্মদিবসে একটি স্পর্শকাতর মামলার বিচার সম্পন্ন হওয়া সাধারণ মানুষের মনে আইনের শাসনের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়| অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর দ্রুততম সময়ে চার্জশিট গঠন এবং নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন করে রায় দেওয়া গেলে তা সমাজে অপরাধ প্রবণতা কমাতেও এক শক্তিশালী বার্তা দেয়| অপরাধীরা যখন দেখে যে অপরাধ করে পার পাওয়ার বা সময়ক্ষেপণ করার সুযোগ নেই, তখন অপরাধের লাগাম টেনে ধরা সহজ হয়|
তবে দ্রুত গতিতে বিচার সম্পন্ন করার এই ইতিবাচক ধারাকে সাধুবাদ জানানোর পাশাপাশি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমাদের সজাগ থাকতে হবে| সেটি হলো—ন্যায়বিচারের মৌলিক চেতনা| দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে গিয়ে কোনো অবস্থাতেই যেন তাড়াহুড়ো বা গাফিলতির কারণে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি ফেঁসে না যায়| একটি প্রবাদ রয়েছে—”ঔঁংঃরপব যঁৎৎরবফ রং লঁংঃরপব নঁৎরবফ” (ক্ষিপ্র বিচার মানেই ন্যায়বিচারের সমাধি)| আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে মনে রাখতে হবে, তদন্তের গতি বাড়ানোর অর্থ এই নয় যে প্রমাণের সত্যতা যাচাই না করেই তড়িঘড়ি করে অভিযোগপত্র জমা দিতে হবে| যথাযথ ফরেনসিক পরীক্ষা, চাক্ষুষ ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ এবং আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের আইনি অধিকার পুরোপুরি নিশ্চিত করা জরুরি|
আয়াত হত্যা ও বাকলিয়ার ধর্ষণ মামলায় যথাক্রমে ৩৩ জন ও ১৮ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করে আইনি প্রক্রিয়ার সব ধাপ মেনেই রায় দেওয়া হয়েছে, যা প্রশংসার দাবিদার| আমরা চাই, দেশের প্রতিটি সহিংসতার মামলায় এই ধরনের গতিশীলতা বজায় থাকুক| তবে তা হতে হবে নিখুঁত তদন্ত ও অকাট্য প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে| দ্রুত তদন্ত ও ন্যায়বিচারের এই মেলবন্ধন বজায় থাকলে একদিকে যেমন অপরাধীরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পাবে, অন্যদিকে কোনো নির্দোষ মানুষও বলির পাঁঠা হবে না| তবেই দেশে আইনের শাসন পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে|


















































