খায়রুল আলম সুজন »
একটি দেশের সামগ্রিক আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের সিংহভাগ যখন একক কোনো বন্দরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন সেই বন্দরটি স্রেফ কোনো ভৌগোলিক পরিকাঠামো বা স্থাপনা থাকে নাঃ তা রূপান্তরিত হয় পুরো দেশের অর্থনৈতিক হৃৎপিণ্ডে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রাম বন্দর ঠিক তেমনই এক অপরিহার্য লাইফ লাইন। পরিসংখ্যান বলছে, দেশের মোট সমুদ্রবাহিত সাধারণ কার্গো বা খোলা পণ্যের (যেমন: খাদ্যশস্য, সিমেন্ট, সার, কয়লা ইত্যাদি) প্রায় ৯২ শতাংশ এবং কন্টেইনারবাহী আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের এককভাবে প্রায় ৯৮ শতাংশই সম্পন্ন হয় এই বন্দরের মাধ্যমে। বাকি মাত্র ২ থেকে ৮ শতাংশ বাণিজ্য মূলত মোংলা, পায়রা ও বিভিন্ন স্থলবন্দরের ওপর নির্ভরশীল। এই বিশাল পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে কেন চট্টগ্রাম বন্দরকে দেশের অর্থনীতির ‘প্রধান প্রবেশদ্বার’ বা ‘লাইফলাইন’ বলা হয়ে থাকে। স্বভাবতই, এই হৃৎপিণ্ডের ছন্দ সামান্য বিঘ্নিত হলে, তার গতিতে একটু ধীরতা এলে কিংবা পরিচালনগত অদক্ষতা দেখা দিলে তার চূড়া মাশুল দিতে হয় টেকনাফ থেকে তেঁতু-লিয়ার প্রতিটি প্রান্তিক নাগরিককে। আপাতদৃষ্টিতে বন্দরের ভেতরের কন্টেইনার জটকে সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন মনে হতে পারে, কিন্তু অর্থনীতির অদৃশ্য সুতোয় তা বাঁধা রয়েছে প্রতিটি সাধারণ ভোক্তার পকেটের সাথে।
সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রকৃত সক্ষমতা, কন্টেইনারের গড় অবস্থানকাল এবং লজিস্টিকস শৃঙ্খল নিয়ে যে সমস্ত আলোচনা ও উদ্বেগ সামনে আসছে, তা অত্যন্ত যৌক্তিক এবং সময়োপযোগী। একটি বন্দর কতটা দক্ষ, তার বৈশ্বিক মাপকাঠি হলো কন্টেইনার কত দ্রুত হাতবদল হয়ে অর্থনীতিতে প্রবেশ করছে, অর্থাৎ ‘টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম’ কত কম। কিন্তু আমাদের এখানে দীর্ঘদিন ধরে এক বিপরীত-মুখী সংস্কৃতি জেঁকে বসেছে। কাস্টমস কর্তৃপক্ষের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, স্ক্যানিং ও ল্যাব টেস্টের দীর্ঘসূত্রতা কিংবা বন্দর ব্যবস্থাপনার অন্য যেকোনো ত্রুটির কারণেই হোক কন্টেইনারের দীর্ঘ অবস্থানকাল আদতে আমাদের সামগ্রিক সরবরাহ শৃঙ্খলের অদক্ষতারই প্রমাণ। দুঃখজনক বিষয় হলো, এই অদক্ষতার মাশুল হিসেবে যখন ব্যবসায়ীদের ওপর ‘স্টোর রেন্ট’ বা উচ্চহারে জরিমানা চাপানো হয়, তখন বন্দর বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ একে দেখায় তাদের ‘পরিচালন আয়’ বা লাভ হিসেবে। অদক্ষতা থেকে তৈরি হওয়া জরিমানা কখনো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্যের সূচক হতে পারে না। একে আয় হিসেবে দেখার এই আত্মঘাতী মানসিকতা দেশের সামগ্রিক ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় (Cost of Doing Business) বহু গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। অর্থনীতির সরল নিয়ম অনুযায়ী, আমদানিকারকের পকেট থেকে চলে যাওয়া এই বাড়তি জরিমানা বা ডেমারেজ চার্জের প্রতিটি পয়সা শেষ পর্যন্ত সমন্বয় করা হয় পণ্যের চূড়ান্ত বিক্রয়মূল্য বাড়িয়ে। চাল, ডাল, তেল, চিনি থেকে শুরু করে শিল্পের কাঁচামাল কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় ওষুধ, সবকিছুর ওপরই এই অদৃশ্য করের প্রভাব পড়ে। ফলস্বরূপ, সাধারণ মানুষকে বাজারে গিয়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতির আগুনে পুড়তে হয়। বন্দর জটের কারণে ব্যবসায়ীদের যে বাড়তি মূলধন ও সময় নষ্ট হয়, তার সরাসরি আঘাত আসে সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের জীবনযাত্রার ওপর।
আমাদের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে প্রায়ই একটি ধারণা দেখা যায় যে, জেটিতে আধুনিক ও ভারী ক্রেন বসালে কিংবা নতুন টার্মিনাল অপারেটর নিয়োগ করলেই বুঝি বন্দরের জট রাতারাতি জাদুবিদ্যার মতো কমে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শুধু কন্টেইনার নামানোর গতি বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না, যদি না সমান্তরালভাবে কাস্টমস প্রক্রিয়ার আধুনিকায়ন ও ফাইল ছাড়করণের গতি বাড়ানো যায়। বন্দর যদি দ্রুত জাহাজ থেকে কন্টেইনার নামিয়ে ইয়ার্ডে স্তূপ করে রাখে, আর কাস্টমস যদি সনাতনী ও কাগজনির্ভর কায়দায় দিনের পর দিন তার ছাড়পত্র আটকে রাখে, তবে লজিস্টিকসের পরিভাষায় একে বলা হয় ‘বটলনেক’ বা প্রতিবন্ধকতা। এই দুই গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভের সংস্কার বিচ্ছিন্নভাবে হওয়া সম্ভব নয়, এদের এগোতে হবে সমান্তরালভাবে, একে অপরের হাত ধরে। আজকের বৈশ্বিক বাণিজ্যে শতভাগ ডিজিটাল অটোমেশন অপরিহার্য। সিঙ্গাপুরের তুয়াস বন্দরের আদলে পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন হয়তো আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য স্বল্পমেয়াদে বাস্তবসম্মত বা রাতারাতি সম্ভব নয়। তবে তার জন্য হাত গুটিয়ে বসে থাকারও কোনো সুযোগ নেই। বড় কোনো পরিকাঠামো বা বিশাল অঙ্কের আর্থিক বিনিয়োগের আগেই প্রতিবেশী দেশগুলোর সফল অভিজ্ঞতাকে আমরা অনায়াসে কাজে লাগাতে পারি। এর জন্য প্রয়োজন কেবল একটি আধুনিক ও দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি এবং আন্তঃসংস্থা সমন্বয়।
বন্দর ব্যবস্থাপনাকে গতিশীল করতে হলে সবচেয়ে জরুরি হলো কাস্টমস, বন্দর কর্তৃপক্ষ, বাণিজ্যিক ব্যাংক, বীমা কোম্পানি, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার এবং শিপিং এজেন্টদের একটি অভিন্ন সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে (Integrated Digital Platform) যুক্ত করা। বর্তমানে একেকটি কন্টেইনার ছাড় করতে যে সমস্ত কাগজনির্ভর ও ধাপে ধাপে অনুমোদনের প্রক্রিয়া পার হতে হয়, তা শুধু দীর্ঘসূত্রতাই তৈরি করে না, বরং দুর্নীতির পথকেও প্রশস্ত করে। যদি একটি অভিন্ন ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড তৈরি করা যায়, যেখানে প্রতিটি কন্টেইনারের অবস্থানকাল এবং কোনো বিলম্ব হলে তার সুনির্দিষ্ট কারণ রিয়েল-টাইমে দৃশ্যমান থাকবে, তবে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব। এর জন্য কোটি কোটি টাকার অবকাঠামোর চেয়ে বেশি প্রয়োজন সংস্থাগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক সদিচ্ছা। এর পাশাপাশি তিনটি সুনির্দিষ্ট উপাদানের ওপর জোর দিতে হবে।
প্রথমত, ঝুঁকিভিত্তিক কাস্টমস প্রক্রিয়া, যেখানে সব কন্টেইনার ঢালাওভাবে শতভাগ কায়িক পরীক্ষা না করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কেবল সন্দেহভাজন কন্টেইনার পরীক্ষা করা হবে। দ্বিতীয়ত, প্রাক-অনুমোদিত দ্রুত ডেলিভারি ব্যবস্থা (Pre-clear-ance), যার মাধ্যমে জাহাজ বন্দরে পৌছানোর আগেই কাস্টমসের যাবতীয় কাগজের কাজ সম্পন্ন করে রাখা যাবে, যাতে নোঙর করার পরপরই দ্রুত খালাস করা যায়। এবং তৃতীয়ত, ডিজিটাল ইয়ার্ড ব্যবস্থাপনা, যা স্বয়ংক্রিয় গেট ব্যবস্থা ও ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে ইয়ার্ডের ভেতরের কন্টেইনারের অবস্থান রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করতে সাহায্য করবে।
একটি আধুনিক ও বাণিজ্যবান্ধব রাষ্ট্রে বন্দর কর্তৃপক্ষের আর্থিক পারফরম্যান্স মূল্যায়নের মাপকাঠি বা কি পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর (KPI) কখনোই মোট রাজস্বের অংক বা জরিমানা আদায়ের পরিমাণ হতে পারে না। বরং তা হওয়া উচিত কন্টেইনারের সর্বনিম্ন অবস্থানকাল হ্রাস এবং হ্যান্ডলিং রাজস্বের অনু-পাত বৃদ্ধি। দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের সিংহভাগ যে বন্দরের ওপর দাঁড়িয়ে, তার প্রকৃ ত সক্ষমতা নির্ধারিত হয় সেবার গতিতে, শান্তিমূলক জরিমানা আদায়ে নয়। প্রতিবেশী বন্দরগুলো যখন প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারে তাদের লজিস্টিক পারফরম্যান্স ইনডেক্স উন্নত করছে, তখন আমরা যদি সনাতন পদ্ধতি আঁকড়ে ধরে রাখি, তবে বিশ্ববাজারে আমাদের তৈরী পোশাকসহ অন্যান্য রপ্তানি পণ্য তার প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাবে। পরিশেষে বলা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরকে আর কতদিন আমরা কেবল ‘রাজস্ব আদায়ের খনি’ হিসেবে বিবেচনা করব, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে। একে দেখতে হবে দেশের ‘বাণিজ্য সহজীকরণের প্রধান প্রবেশদ্বার’ হিসেবে। বন্দর ও কাস্টমসের এই যুগপৎ সংস্কার কেবল বড় ব্যবসায়ীদের মুনাফা বাড়াবে না, বরং তা প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমিয়ে বাজারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে। হৃৎপিণ্ড সচল ও গতিশীল থাকলে তবেই পুরো অর্থনীতি সুস্থ থাকবে। আর এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ভেঙে সমন্বিতভাবে কাজ করার দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার।
লেখক: অর্থনীতি ও বাণিজ্য বিষয়ক কলামিস্ট



















































