সুপ্রভাত ডেস্ক »
গত এক সপ্তাহের টানা ভারী বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ বন্যায় পানিবন্দি হয়ে আছে মানুষ। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জেলার দক্ষিণাঞ্চলের সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলা।
এ ছাড়া চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, বোয়ালখালী, পটিয়া ও আনোয়ারা উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এখনও পানির নিচে রয়েছে। অন্যদিকে উত্তর চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ, মিরসরাই, রাউজান, ফটিকছড়ি ও সীতাকুণ্ড উপজেলার নিম্নাঞ্চলেও বন্যার পানি ঢুকে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগের পাশাপাশি বসতবাড়ি ও আশপাশে বিষাক্ত সাপের উপদ্রবও বাড়তে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে জেলায় অন্তত ৭৫ জন সাপের কামড়ের শিকার হয়েছেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপজেলা হাসপাতালগুলোতে অ্যান্টিভেনম মজুত ও চিকিৎসা প্রস্তুতি জোরদারের পাশাপাশি সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলেন, হাসপাতালে গেলেও অনেক সময় অ্যান্টিভেনম না পাওয়ার অভিযোগ থাকে। ফলে রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য শহরে নেওয়ার পথে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বন্যার কারণে সাপের উপদ্রব বেড়ে গেলে এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম না থাকলে প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়তে পারে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ ও কৃষি কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশে বন্যার সময় ও বন্যার পরে গোখরা, পদ্মগোখরা, শঙ্খিনী, দুধরাজ, বিভিন্ন প্রজাতির জলসাপ এবং কিছু এলাকায় রাসেলস ভাইপার দেখা যেতে পারে। তবে এদের মধ্যে সব সাপ বিষধর নয়। বন্যার পানি কমে যাওয়ার পর আমনের বীজতলা তৈরির সময় মাঠে কাজ করতে গিয়ে কৃষকরা প্রায়ই সাপের কামড়ের শিকার হন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শুক্রবার (১০ জুলাই) দিবাগত রাতে বোয়ালখালী উপজেলার চরখিজিরপুর গ্রামে টানা বৃষ্টিতে চারপাশ প্লাবিত হলে স্থানীয় বাসিন্দা মো. আলমগীরের ঘরে একটি পদ্মগোখরা আশ্রয় নেয়।
আলমগীর বলেন, ঘরে নিরাপদ থাকবে ভেবে সদ্য ফোটা ছানাসহ মুরগিগুলো শোয়ার ঘরেই রাখা হয়। গভীর রাতে মা মুরগির অস্বাভাবিক ডানা ঝাপটানোর শব্দে তার ঘুম ভেঙে যায়। পরে তিনি লাইট জ্বালিয়ে দেখেন ফণা তোলা একটি বিষধর পদ্মগোখরোর সঙ্গে জীবন-মরণ লড়াই করছে মা মুরগিটি। আলো জ্বলতেই সাপটি খাটের নিচে আশ্রয় নেয়। ফলে পরিবারের সদস্যরা বিছানা থেকে নামার সাহস পাননি। তার চোখের সামনেই সাপের ছোবলে মারা যায় মা মুরগিটি।
পরদিন খবর পেয়ে ওয়াইল্ডলাইফ অ্যান্ড স্নেক রেসকিউ টিমের সদস্য আমীর হোসাইন শাওন কয়েক ঘণ্টার তল্লাশি চালিয়ে বাড়ির বারান্দায় লাকড়ির স্তূপ থেকে প্রায় আড়াই ফুট লম্বা একটি পদ্মগোখরা উদ্ধার করেন। পরে সাপটি নিরাপদে বনে অবমুক্ত করা হয়।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অধিকাংশ হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম মজুত রয়েছে। তবে কয়েকটি হাসপাতালে বন্যাকালীন সাপের কামড় মোকাবিলায় অতিরিক্ত প্রস্তুতির ঘাটতির তথ্য পাওয়া গেছে।
চন্দনাইশ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রশ্মি চাকমা বলেন, বন্যা শুরুর পর থেকে আমাদের হাসপাতালে সাপের কামড়ে আহত ১২ জন রোগী এসেছেন। তারা সবাই চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। বর্তমানে আমাদের হাসপাতালে ৩০ ডোজ অ্যান্টিভেনম মজুত রয়েছে।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ জানায়, বন্যার মধ্যে এখন পর্যন্ত সাপের কামড়ে ৭৫ জন আহত হয়েছেন। বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সাপের কামড়সহ সব ধরনের জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে উপজেলা হাসপাতালগুলোতে সার্বক্ষণিক নজরদারি চলমান থাকবে।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে প্রয়োজনীয় অ্যান্টিভেনম মজুত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসক, নার্স ও জরুরি বিভাগের কর্মীদেরও প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। কোথাও অ্যান্টিভেনমের সংকট দেখা দিলে জেলা পর্যায় থেকে দ্রুত সরবরাহের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. সৌনম বড়ুয়া বলেন, বন্যা-পরবর্তী সময়ে সাপের কামড়সহ অন্যান্য রোগ মোকাবিলায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানাচ্ছি। সাপে কামড়ালে আক্রান্ত ব্যক্তিকে শান্ত রাখতে হবে এবং দ্রুত নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। আক্রান্ত অঙ্গ অযথা নাড়াচাড়া করা যাবে না। ক্ষতস্থান কেটে রক্ত বের করা, বিষ চুষে নেওয়া, শক্ত করে বেঁধে রাখা বা ওঝা-কবিরাজের ওপর নির্ভর না করে দ্রুত হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্যপ্রাণী-সরীসৃপ বিশেষজ্ঞ ড. মো. ফরিদ আহসান বলেন, বন্যার সময় সাপের স্বাভাবিক আবাসস্থল পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় তারা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বাড়িঘর, রাস্তা, বাঁধ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আশ্রয়কেন্দ্রে চলে আসে। অনেক সাপ পানির স্রোতে ভেসে এমন এলাকাতেও পৌঁছে যায়, যেখানে আগে সাপের উপস্থিতি খুবই কম ছিল।
তিনি বলেন, বন্যার পানিতে ঝোপঝাড়ে, ধ্বংসস্তূপে, খড়ের গাদায়, কাঠের স্তূপে ও জমে থাকা আবর্জনায় সাপ আশ্রয় নেয়। শ্বাস নেওয়ার জন্য তাদের শুকনো জায়গার প্রয়োজন হয়। তাই সাপ দেখলে আতঙ্কিত না হয়ে নিরাপদ স্থানে সরে গিয়ে স্থানীয় বন বিভাগ, ফায়ার সার্ভিস বা প্রশিক্ষিত সাপ উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে যোগাযোগ করাই সবচেয়ে নিরাপদ।
















































