সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে বজ্রপাত একটি ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ ও এপ্রিল মাসেই বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন ৩২ জন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশজুড়ে যখন তীব্র তাপপ্রবাহ বইছে, ঠিক তখনই বজ্রপাতের এই তাণ্ডব জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। এক সময় একে কেবল ‘প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা’ মনে করা হলেও, এখন এটি জাতীয় দুর্যোগের পর্যায়ে চলে গেছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, বজ্রপাত বাড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো ‘বৈশ্বিক উষ্ণায়ন’। তাপমাত্রা যত বাড়ছে, বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ তত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা শক্তিশালী ‘কিউমুলোনিম্বাস’ মেঘ তৈরি করছে। এই মেঘ থেকেই মূলত বজ্রপাতের উৎপত্তি। এ ছাড়া দেশের বিশাল এলাকা জুড়ে বনাঞ্চল কমে যাওয়া এবং বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় উঁচু গাছের (যেমন তাল বা নারিকেল গাছ) অভাব বজ্রপাত সরাসরি মানুষের ওপর পড়ার হার বাড়িয়ে দিয়েছে। আগেকার দিনে উঁচু গাছগুলো ‘লাইটেনিং অ্যারেস্টার’ বা বিদ্যুৎ পরিবাহক হিসেবে কাজ করত, যা এখন প্রায় নেই বললেই চলে। উন্মুক্ত মাঠ বা হাওর অঞ্চলে কাজ করা কৃষক ও জেলেরা তাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছেন।
মার্চ-এপ্রিল মাসে বজ্রপাতে মৃত্যুর হার বেশি হওয়ার প্রধান কারণ হলো এটি কৃষিকাজের মৌসুম। হাওর ও উত্তরাঞ্চলে এ সময় বোরো ধান কাটার ধুম পড়ে। কৃষকরা খোলা মাঠে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন। হঠাৎ আবহাওয়া খারাপ হলে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পর্যাপ্ত সময় বা জায়গা তারা পান না। আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার এবং মোবাইল ফোনের মতো ইলেকট্রনিক ডিভাইসের সংস্পর্শও অনেক সময় ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সচেতনতার অভাব। মেঘের গর্জন শোনার পরও অনেকে খোলা মাঠে কাজ চালিয়ে যান, যা প্রাণঘাতী প্রমাণিত হচ্ছে।
বজ্রপাত যেহেতু ঠেকানো সম্ভব নয়, তাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত অভিযোজন এবং জীবনরক্ষা। এক্ষেত্রে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো জরুরি: সরকারের পক্ষ থেকে যে তালগাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা আরও জোরদার করতে হবে। রাস্তার পাশে এবং ফসলের মাঠের ধারে প্রচুর উঁচু প্রজাতির গাছ লাগাতে হবে। হাওর ও উপকূলীয় অঞ্চলের খোলা মাঠে নির্দিষ্ট দূরত্ব অন্তর ‘বজ্রপাত আশ্রয়কেন্দ্র’ বা বজ্রনিরোধক দণ্ড সংবলিত টাওয়ার স্থাপন করতে হবে। আবহাওয়া অধিদপ্তরকে আরও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অন্তত ৩০ মিনিট আগে নির্দিষ্ট এলাকায় বজ্রপাতের পূর্বাভাস পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। মোবাইল অ্যাপ বা স্থানীয় মসজিদের মাইকের মাধ্যমে দ্রুত সতর্কবার্তা প্রচার করা যেতে পারে।
আকাশ কালো হয়ে এলে বা মেঘ ডাকলে দ্রুত পাকা দালানের নিচে আশ্রয় নিতে হবে। খোলা মাঠে থাকলে নিচু হয়ে বসে পড়তে হবে, কিন্তু মাটিতে শুয়ে পড়া যাবে না। এ সময় বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও পানি থেকে দূরে থাকা অত্যাবশ্যক।
বজ্রপাতকে এখন আর অবহেলা করার সুযোগ নেই। এটি একটি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংকট। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা এবং সাধারণ মানুষকেও এই দুর্যোগ মোকাবিলায় এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে কৃষকদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কৃষি যান্ত্রিকীকরণ আরও নিরাপদ করার দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
মতামত সম্পাদকীয়





















































