সনেট দেব »
পৃথিবীর প্রাণীদের মধ্যে যদি কারও গলা সবচেয়ে লম্বা হয়, তবে সে হলো জিরাফÑআফ্রিকার সুবিশাল সাভানায় দাঁড়িয়ে থাকা এক অনন্য বিস্ময়। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, সে যেন আকাশ ছুঁতে চায়, মেঘের সঙ্গে গল্প করছে। লম্বা গলা, চকচকে বাদামি-কমলা দাগ, আর রাজসিক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা জিরাফ যেন প্রকৃতির হাতে আঁকা এক জীবন্ত চিত্রকর্ম।
আফ্রিকার বিস্তীর্ণ তৃণভূমিতে যখন রোদে ঝলসে ওঠে ধুলো, তখন ঘাসের গন্ধে ভরা বাতাসে দেখা যায়Ñজিরাফেরা ধীরে ধীরে হাঁটছে, মাথা উঁচু করে গাছের ডাল থেকে পাতা ছিঁড়ে খাচ্ছে। যেন তারা পৃথিবীর নয়, অন্য কোনো শান্ত গ্রহের অতিথি। তাদের উচ্চতা অবিশ্বাস্যÑএকজন পূর্ণবয়স্ক পুরুষ জিরাফের উচ্চতা প্রায় ১৮ ফুট, অর্থাৎ তিনতলা বাড়ির সমান! স্ত্রী জিরাফ তুলনামূলক কিছুটা ছোট হলেও তবু ১৪ থেকে ১৫ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। শুধু গলাই থাকে প্রায় ছয় ফুটÑএকজন মানুষের সমান।
কিন্তু প্রশ্ন জাগেÑএত লম্বা গলার দরকারই বা কী? প্রকৃতি কখনো কিছুই অযথা দেয় না। আফ্রিকার সাভানায় যখন ঘাস শুকিয়ে যায়, তখন অধিকাংশ প্রাণী খাবারের অভাবে দিশেহারা হয়ে পড়ে। কিন্তু জিরাফ তখনও নিশ্চিন্তে গাছের উঁচু ডালের কচি পাতা খায়। বিশেষ করে বাবলা গাছের কোমল পাতা তার প্রিয় খাদ্য। অন্য প্রাণীরা যেখানে পৌঁছাতে পারে না, সেখানে জিরাফ সহজেই পৌঁছে যায়Ñতার লম্বা গলার কারণেই। তাই এই গলাটিই তার বেঁচে থাকার শক্তি, প্রকৃতির দান করা আশ্চর্য সুবিধা। তবে জানো কি, জিরাফের গলায় হাড়ের সংখ্যা মানুষের মতোই মাত্র সাতটি? পার্থক্য শুধু একটাইÑপ্রতিটি হাড়ই মানুষের তুলনায় অনেক দীর্ঘ। এই গঠনই তার গলাকে করেছে এত লম্বা ও নমনীয়।
শুধু গলাতেই নয়, জিরাফের শরীরের ভেতরেও রয়েছে বিস্ময়। এত উঁচু গলার মস্তিষ্কে রক্ত পৌঁছে দিতে তাদের হৃদপি-কে করতে হয় বিরাট কাজ। তাই জিরাফের হৃদপি-ের ওজন প্রায় ১১ কিলোগ্রাম! মাথা নিচু করলে রক্তচাপ হঠাৎ বেড়ে না যায়Ñসে জন্য তাদের শরীরে আছে বিশেষ রক্তনালীর ব্যবস্থা। এই বুদ্ধিদীপ্ত শারীরিক কাঠামো প্রকৃতির এক অপূর্ব সৃষ্টিকৌশল। জিরাফের চামড়ার দাগও কেবল সৌন্দর্যের জন্য নয়। বাদামি দাগের নিচে থাকে অসংখ্য রক্তনালী, যা শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। তাই তপ্ত আফ্রিকার সূর্যের নিচেও জিরাফ থাকে নিরুদ্বিগ্ন, যেন সে গরমকে উপেক্ষা করে নিজের রাজ্যে রাজা হয়ে ঘুরে বেড়ায়।
জিরাফরা সাধারণত দলে দলে ঘোরে। স্ত্রী ও বাচ্চারা থাকে একসঙ্গে, পুরুষ জিরাফরা থাকে আলাদা দলে। তবে পুরুষদের মধ্যে লড়াই হলে সেটি হয় সত্যিই চমৎকার দৃশ্য। তারা তাদের গলা ও মাথা দোলায়, যেন দুই দৈত্য নাচছে। এই লড়াইয়ের নামই “নেকিং”Ñগলা দোলানোর যুদ্ধ। এতে যে জয়ী হয়, সেই পায় দলের নেতৃত্ব। খাবার খাওয়া জিরাফের প্রিয় কাজ। দিনে প্রায় ১৬ থেকে ২০ ঘণ্টা তারা পাতা চিবোতে চিবোতে কাটিয়ে দেয়। অথচ তারা পৃথিবীর সবচেয়ে কম ঘুমানো প্রাণীÑমাত্র ২০ মিনিট থেকে ২ ঘণ্টা ঘুমেই তাদের দিন চলে যায়! তারা প্রায় সব সময় দাঁড়িয়ে ঘুমায়, যেন সতর্ক প্রহরী।
জিরাফের বাচ্চার জন্মের গল্প আরও বিস্ময়কর। মা জিরাফ দাঁড়িয়ে থেকেই বাচ্চা প্রসব করেÑফলে বাচ্চাটি প্রায় ছয় ফুট ওপরে থেকে মাটিতে পড়ে যায়! এই পতনই তাকে প্রথম শিক্ষা দেয় টিকে থাকার। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাচ্চাটি হাঁটতে শেখে, কারণ সাভানার চারপাশে ওত পেতে থাকে সিংহ, হায়েনা, চিতা। বাঁচতে হলে শক্ত হতে হয়, দ্রুত দৌড়াতে হয়। জিরাফ শান্ত স্বভাবের হলেও বিপদে পড়লে এক লাথিতেই শত্রুকে দূরে পাঠাতে পারে। তাদের পায়ের শক্তি এমন যে এক আঘাতে সিংহও মাটিতে লুটিয়ে পড়তে পারে। তাই বড় জিরাফদের শিকার করতে সাহস করে না অধিকাংশ প্রাণী। আজ পৃথিবীতে রয়েছে নয়টি প্রজাতির জিরাফ। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বন উজাড় ও শিকারিদের কারণে তাদের সংখ্যা ক্রমে কমছে। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে এখন জিরাফ সংরক্ষণে নেওয়া হচ্ছে বিশেষ উদ্যোগÑকারণ এই প্রাণীটি শুধু সাভানার সৌন্দর্য নয়, এটি প্রকৃতির ভারসাম্যের প্রতীক।
জিরাফ আমাদের শেখায় এক গভীর সত্যÑভিন্নতা কখনো দুর্বলতা নয়, বরং শক্তি। তার লম্বা গলা যেমন তাকে আলাদা করেছে, তেমনি সেই আলাদা গুণই তাকে টিকিয়ে রেখেছে পৃথিবীতে। তাই জিরাফ কেবল এক লম্বা প্রাণী নয়; সে যেন আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা এক স্বপ্নের প্রতীক। জীবনে যতই কঠিন সময় আসুক, তার মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়াও, নিজের গুণে আলাদা হও, আর প্রকৃতির সঙ্গে সুর মিলিয়ে এগিয়ে চলোÑসবসময় উপরের দিকে, আকাশের দিকে।





















































