এ মুহূর্তের সংবাদ

সংকটে চট্টগ্রামের বিদ্যুৎ খাত, অর্থনীতিতে ধাক্কা

সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ২৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৫টি পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ফলে এই অঞ্চলের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা নেমে এসেছে প্রায় অর্ধেকের নিচে। এই চিত্র কেবল একটি কারিগরি বিপর্যয় নয়, বরং এটি জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদী দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ।
চট্টগ্রামের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা যেখানে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াটের উপরে, সেখানে বর্তমান উৎপাদন ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের আশেপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে। ২৩টির মধ্যে ৫টি কেন্দ্র পুরোপুরি স্থবির হয়ে থাকা এবং বাকিগুলোর অধিকাংশ সক্ষমতার চেয়ে অনেক কম উৎপাদন করা নির্দেশ করে যে, সমস্যাটি কেবল সাময়িক নয়। এর প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে, বিশেষ করে গ্যাস ও কয়লার তীব্র ঘাটতি, পুরনো কেন্দ্রগুলোর সংস্কারে দীর্ঘসূত্রতা যার কারণে বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমদানিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
চট্টগ্রাম মানেই ভারী শিল্প, দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর এবং হাজার হাজার রফতানিমুখী কারখানা। বিদ্যুৎ উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসার সরাসরি প্রভাব পড়ছে এই খাতগুলোতে। লোডশেডিংয়ের কারণে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, ফলে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা বাংলাদেশের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে, চট্টগ্রামের অসহ্য গরমে সাধারণ মানুষের জনজীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং কেবল নাগরিক দুর্ভোগই বাড়াচ্ছে না, বরং জনস্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিপুল অর্থ ব্যয়ে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হলেও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা একটি বড় কৌশলগত ভুল ছিল। কেন্দ্র আছে কিন্তু তেল, গ্যাস বা কয়লা নেই—এই অদ্ভুত পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে আমাদের পরিকল্পনা ছিল অবকাঠামো-কেন্দ্রিক, জ্বালানি-কেন্দ্রিক নয়। চট্টগ্রামের পিডিবি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ গ্যাসের অভাবকে দায়ী করছেন, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী এলএনজি সরবরাহ বা বিকল্প জ্বালানির সংস্থান কেন পর্যাপ্ত ছিল না, সেই দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।
বিদ্যুৎ খাতের এই নাজুক অবস্থা থেকে উত্তরণে কেবল জোড়াতালি দিয়ে চলা সম্ভব নয়। আমাদের প্রয়োজন একটি সুসংহত এবং বাস্তবমুখী পদক্ষেপ।

চট্টগ্রামের বিদ্যুৎ সংকট কেবল এই অঞ্চলের সমস্যা নয়, এটি জাতীয় অগ্রগতির পথে এক বড় অন্তরায়। সক্ষমতার অর্ধেক বিদ্যুৎ নিয়ে একটি আধুনিক বাণিজ্যিক নগরী সচল রাখা অসম্ভব। সরকার ও সংশ্লিষ্ট বিভাগকে এখনই যুদ্ধের তৎপরতায় এই সংকট সমাধানে নামতে হবে। আমরা যদি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সচল করতে না পারি, তবে শিল্পায়ন স্থবির হয়ে যাবে এবং যার চূড়ান্ত মূল্য দিতে হবে সাধারণ জনগণকে। সময় এসেছে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে আনার। চট্টগ্রামের বাতি না জ্বললে বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকাও সচল থাকবে না।