সুপ্রভাতের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) থেকে নিজস্ব ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টের বিদ্যুৎ অবৈধভাবে স্থানীয় বাজার ও বসতবাড়িতে সরবরাহের যে তথ্য উঠে এসেছে, তা কেবল উদ্বেগের নয়—বরং রাষ্ট্রীয় সম্পদ হরিলুটের এক জঘন্য দৃষ্টান্ত। কারখানাটি চালুর মূল উদ্দেশ্য যেখানে ইউরিয়া ও অ্যামোনিয়া উৎপাদন করে দেশের কৃষিখাতে অবদান রাখা, সেখানে মূল উৎপাদন বন্ধ রেখে কারখানার বিদ্যুৎ বাইরে বেচাকেনা করা একটি মারাত্মক রাষ্ট্রীয় অপরাধ।
১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত দৈনিক ১,৭০০ মেট্রিক টন উৎপাদন ক্ষমতার এই বৃহৎ সার কারখানাটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রায় সারা বছরই বন্ধ থাকছে। কিন্তু আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, কারখানার উৎপাদন বন্ধ থাকলেও থেমে নেই স্টিম টারবাইন জেনারেটর (এসটিজি)। কারখানার অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা রক্ষার নিমিত্তে সর্বোচ্চ ২৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে অনিয়মের এক চক্র গড়ে তোলা হয়েছে। রাঙ্গাদিয়া বাজারের শতাধিক দোকান ও আবাসিক ভবনে তিনটি মিটারের মাধ্যমে সিইউএফএলের বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে, যা থেকে প্রতি মাসে প্রায় টাকা লেনদেন হচ্ছে।
বিদ্যুৎ আইন ও ‘ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়-বিক্রয়ের নীতিমালা-২০০৭’ অনুযায়ী, নিজস্ব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বাইরে বিক্রির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)-এর অনুমোদন, ট্যারিফ নির্ধারণ ও বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থার অনুমতি বাধ্যতামূলক। সিইউএফএল কর্তৃপক্ষ বিসিআইসি বা বিইআরসি-র কোনো বৈধ অনুমোদন ছাড়াই সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে এই বিদ্যুৎ বাণিজ্য চালিয়ে আসছে।
সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো প্রশাসনিক উদাসীনতা ও দায় এড়ানোর প্রবণতা। কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক যখন বলেন, “আমি আসার অনেক আগে থেকেই এই ব্যবস্থা চলে আসছে, কী নিয়মে শুরু হয়েছে জানি না”—তখন তা প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও অনিয়মকে প্রশ্রয় দেওয়ারই নামান্তর। অন্যদিকে প্রশাসন বিভাগের দায়িত্বশীলদের মুখ থেকে “শুরু থেকেই এই বিদ্যুৎ দেওয়া হচ্ছে” জাতীয় বক্তব্য প্রমাণ করে যে, এই অবৈধ কর্মকাণ্ড সেখানে নিয়মেই পরিণত হয়েছে।
একটি রাষ্ট্রীয় ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান এভাবে নিজস্ব বিদ্যুৎ বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে অপব্যবহার করবে এবং শীর্ষ কর্মকর্তারা বছরের পর বছর তা দেখেও না দেখার ভান করবেন—তা গ্রহণযোগ্য নয়। এতে কেবল রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির আর্থিক ক্ষতিই হচ্ছে না, বরং বিসিআইসির সার্বিক তদারকি ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন দাঁড়িয়েছে।
তদন্তের যে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, তা যেন ফাইল বন্দি না হয়। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে এই অনিয়মের সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কার বিদ্যুৎ সংযোগে কার পকেটে টাকা গেছে—তা উন্মোচন করে দায়ী কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে এবং অবিলম্বে এই অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হবে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যক্তির বা চক্র বিশেষের লাভের হাতিয়ার হতে পারে না।
মতামত সম্পাদকীয়





















































