এ মুহূর্তের সংবাদ

শিশুধর্ষণ-হত্যা বন্ধে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে

সম্প্রতি চট্টগ্রামসহ দেশজুড়ে শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, বলাৎকার ও হত্যার নৃশংসতা যে হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, তা কেবল উদ্বেগজনক নয়, বরং চরম সামাজিক অবক্ষয়ের এক নির্মম দলিল। সংবাদপত্রের পাতা খুললেই চোখে পড়ে চার বছরের অবুঝ শিশু থেকে শুরু করে ১০-১১ বছরের কিশোর-কিশোরীদের ওপর পৈশাচিক নির্যাতনের খবর। চট্টগ্রামের হাটহাজারী কিংবা বাকলিয়ায় শিশুদের ওপর সাম্প্রতিক পাশবিকতা এবং রামিসাদের মতো অগণিত শিশুর করুণ মৃত্যু পুরো সমাজকে এক গভীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, গত ২০ মাসে দেশজুড়ে ধর্ষণ ও নির্যাতনে প্রায় ৬৪৩ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে। শুধু চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই ১৯৫ জন শিশু নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এসব অপরাধের সিংহভাগই ঘটছে পরিচিত গণ্ডির মধ্যে—কখনো প্রতিবেশীর ঘরে, কখনো বা খোদ পারিবারিক পরিবেশে। চকলেট বা খেলাধুলার প্রলোভন দেখিয়ে শিশুদের ওপর চালানো হচ্ছে বিকৃত যৌন নির্যাতন ও বলাৎকার। আর নিজেদের অপরাধ আড়াল করতে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় শ্বাসরোধ করে বা ক্ষতবিক্ষত করে হত্যা করা হচ্ছে এসব নিষ্পাপ প্রাণকে।
এই ভয়াবহ চিত্র প্রমাণ করে, আমাদের সামাজিক সুরক্ষাবলয় ও নৈতিক মূল্যবোধ আজ পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। ঘরে কিংবা বাইরে—কোথাও আজ আমাদের সন্তানরা নিরাপদ নয়। অপরাধীদের মনে আইনের প্রতি কোনো ভয় বা শ্রদ্ধা নেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ, ত্রুটিপূর্ণ তদন্ত এবং দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার মারপ্যাঁচে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিই নতুন নতুন অপরাধীদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে।
একটি সভ্য সমাজে শিশুদের এমন করুণ পরিণতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এর রাশ এখনই টানতে হবে। শুধু ফাঁকা আশ্বাস বা লোকদেখানো গ্রেফতার নয়, দরকার আইনের কঠোর ও দ্রুততম বাস্তবায়ন। শিশু নির্যাতনের প্রতিটি মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের আওতায় এনে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যেন তা ভবিষ্যতে যেকোনো অপরাধীর জন্য এক চরম হুঁশিয়ারি হয়ে দাঁড়ায়।
পাশাপাশি, প্রতিটি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনকে সচেতন হতে হবে। সন্তানদের নৈতিক শিক্ষার বিকাশ এবং অপরিচিত তো বটেই, পরিচিত পরিমণ্ডলেও তাদের গতিবিধির ওপর সতর্ক নজর রাখা জরুরি। প্রশাসনকে হতে হবে আরও বেশি তৎপর এবং জনবান্ধব। আমরা আর কোনো অভিভাবকের আহাজারি শুনতে চাই না। প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে সর্বস্তরের নাগরিকের সম্মিলিত প্রতিরোধের মাধ্যমেই কেবল আমাদের শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ ও সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব। আমাদের সম্মিলিত বিবেক যদি এখনই জাগ্রত না হয়, তবে এই দায় সমাজ কোনোদিন এড়াতে পারবে না।