শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
ফিচার শিল্প-সাহিত্য

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় : বাঙালি হৃদয়ের চিরন্তন কথাকার

অরূপ পালিত »

শরৎচন্দ্র বড় হয়েছিলেন এমন এক পরিবারে, যেখানে জীবনের সার্থকতা মানেই সামাজিক প্রতিষ্ঠা-আর সেই প্রতিষ্ঠার পথ উকিল হওয়া। পরিবারের ইচ্ছায় প্রবেশিকা পাশ করে এফ.এ-তে ভর্তি হলেও, তাঁর মন বাঁধতে পারেনি আইনের বইয়ে। বরং বাঁধা পড়েছিল প্রকৃতির কাছে, মানুষের কাছে, আর এক উড়নচণ্ডী বন্ধুর মুক্তচিন্তার কাছে। শরৎচর্ন্দের জীবনের প্রথম বড় আঘাত আসে ১৮৯৫ সালে, মায়ের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। ভুবনমোহিনীর চলে যাওয়া শরৎচন্দ্রের ভিতরটা একেবারে শূন্য করে দেয়। মাতৃহীন সন্তানের সেই গভীর শূন্যতা আজীবন বহন করেছেন তিনি। পিতার সঙ্গে খঞ্জরপুর গ্রামে আশ্রয় নিলেও, সংসারের স্থায়িত্ব তাঁর জীবনে অধরাই রয়ে যায়। সেখানেই সমবয়সিদের নিয়ে গড়ে ওঠে সাহিত্যচক্র। গল্প লেখা, পড়া, আলোচনা-এই সবকিছুই তাঁকে ধীরে ধীরে জীবনের মূল স্রোত থেকে সাহিত্যের দিকে টেনে নেয়। ‘অভিমান’ গল্পটি পাঠের পর থেকেই বোঝা গিয়েছিল-এই তরুণের কলমে আলাদা একটা আগুন আছে। কিন্তু সেই আগুনের তাপে পুড়ল তাঁর পড়াশোনা। এফ.এ পরীক্ষায় ফল ভালো হলো না। পরিবারের দিকে তাকিয়েও শেষ পর্যন্ত তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন-এই সমাজের নির্ধারিত পথে নয়, তিনি হাঁটবেন নিজের পথেই। কলেজ জীবনের ইতি টেনে সাহিত্যই হয়ে উঠল তাঁর আশ্রয়, আবার তাঁর অনিশ্চয়তার উৎসও। হাতে লেখা পত্রিকা ‘ছায়া’, কুঁড়ি সাহিত্যিক’ সভা-সবই ছিল তাঁর প্রাণের খোরাক, পেটের নয়। সংসার চলে না কেবল সাহিত্য দিয়ে। এই নির্মম সত্যের মুখোমুখি হয়ে তাঁকে চাকরি নিতে হয়। কিন্তু শরৎচন্দ্রের মন কখনোই চাকরির খাঁচায় বন্দি ছিল না। বাবার সঙ্গে বিরোধ, গৃহত্যাগ, অজানা পথে যাত্রা- এই সব মিলিয়ে তিনি যেন নিজেই হয়ে উঠছিলেন তাঁর উপন্যাসের ভবঘুরে নায়ক।
ভাগ্য যেন ইচ্ছে করেই তাঁকে আড়ালে রেখেছিল। শরৎচন্দ্র রেঙ্গুন যাওয়ার দু-একদিন আগে কলকাতার বৌবাজারে সুরেন মামা ও গিরীন মামার সঙ্গে দেখা করতে গেলে গিরীন মামার অনুরোধে ’কুন্তলীন’ প্রতিযোগিতায় একটা গল্প লিখে পাঠিয়েছিলেন। গল্পের নাম ’মন্দির’। কিন্তু গল্পটিতে নিজের নাম না দিয়ে মামা সুরেনবাবুর নাম দিয়েছিলেন। দেড়শ গল্পের মধ্যে ’মন্দির” সর্বশ্রেষ্ঠ গল্প হিসাবে বিবেচিত হয়েছিল।
রেঙ্গুন যাত্রা ছিল তাঁর জীবনের মোড় ঘোরানো অধ্যায়। প্রবাসে গিয়ে প্রথমবারের মতো কিছুটা স্থিতি এল জীবনে। শরৎচন্দ্র রেঙ্গুনে থাকার সময় বেশির ভাগ সময়টাই থেকেছেন শহরের উপকণ্ঠে বোটাটং-পোজনডং অঞ্চলে। এখানে শহরের কলকারখানার মিস্ত্রীরাই প্রধানত থাকত। শরৎচন্দ্র মিস্ত্রীদের সঙ্গে অবাধে মেলামেশা করতেন। উনি এদের নিয়ে একটা সঙ্কীর্তনের দলও করেছিলেন।
এই মিস্ত্রীপল্লীতে থাকার সময় তাঁর বাসার নিচেই চক্রবর্তী উপাধিধারী এক মিস্ত্রী থাকত। ঐ মিস্ত্রীর ’শান্তি’ নামে একটি কন্যা ছিল। চক্রবর্তী এক প্রোঢ় ও মাতাল মিস্ত্রীর সঙ্গে তার কন্যার বিয়ে দেবার ব্যবস্থা করে। চক্রবর্তীর কন্যার কিন্তু এই বিবাহে ঘোর আপত্তি থাকে, তাই চক্রবর্তীর কন্যা একদিন তাকে ঐ বিপদ থেকে রক্ষা করবার জন্য শরৎচন্দ্রের পায়ে পড়ে বিয়ে করার জন্য অনুরোধ করে। তখন শরৎচন্দ্র বাধ্য হয়ে তাঁকে বিয়ে করেছিলেন।
শরৎচন্দ্র স্ত্রী শান্তি দেবীকে নিয়ে বেশ সুখেই ছিলেন। তাঁদের একটি পুত্র সন্তান হয়। পুত্রের বয়স যখন এক বৎসর, সেই সময় রেঙ্গুনেই প্লেগে আক্রান্ত হয়ে শান্তি দেবী এবং শিশুপুত্র উভয়েরই মৃত্যু হয়। প্রিয়তমা পত্নী ও সন্তানকে হারিয়ে শরৎচন্দ্র মর্মাহত ও দিশেহারা হয়ে যান।
শান্তি দেবীর মৃত্যুর অনেকদিন পরে শরৎচন্দ্র রেঙ্গুনেই দ্বিতীয়বার বিবাহ করেন। বিবাহের সময় দ্বিতীয়া স্ত্রীর নাম ছিল ’মোক্ষদা’। বিবাহের পর শরৎচন্দ্র তাঁর মোক্ষদা নাম বদলে হিরণ¥য়ী নাম দিয়েছিলেন।
শরৎচন্দ্র রেঙ্গুনে চাকরি করার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে প্রচুর পড়াশুনা, গান-বাজনা এবং সাহিত্য-চর্চাও করতেন। প্রথম দিকে অনেক দিন ছবিও এঁকেছেন। মিস্ত্রী-পল্লীতে বোটাটং-এর ল্যান্সডাউন স্ট্রীটে যখন তিনি একটা কাঠের বাড়ির দোতলায় থাকতেন, সেই সময় ১৯১২ খ্রীষ্টাব্দের ৫ই ফেব্রুয়ারী তাঁর বাসার নিচেরতলায় আগুন লাগে। সেই আগুনে তাঁর কয়েটি বইয়ের পান্ডুলিপি, কিছু অয়েল পেন্টিং এবং এক সাহেবের কাছ থেকে কেনা একটি লাইব্রেরী-সমেত তাঁর বাসাটিও পুড়ে ছাই হয়ে যায়। রেঙ্গুনে থাকাকালে ১৯১২ খ্রীষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে শরৎচন্দ্র একবার অফিসে এক মাসের ছুটি নিয়ে দেশে আসেন। এই সময় মাতুল উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের মারফত যমুনা-সম্পাদক ফণীন্দ্রনাথ পালের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। পরিচয় হলে ফণীবাবু তাঁর কাগজে লিখবার জন্য শরৎচন্দ্রকে বিশেষভাবে অনুরোধ করেন। শরৎচন্দ্র রেঙ্গুনে গিয়ে লেখা পাঠিয়ে দেবেন বলে কথা দেন।
কথা অনুযায়ী শরৎচন্দ্র রেঙ্গুনে গিয়ে তাঁর ‘রামের সুমতি’ গল্পটি পাঠিয়ে দেন। ফণীবাবু এই গল্প তাঁর কাগজে ১৩১৯ সালের ফাল্গুন ও চৈত্র সংখ্যায় প্রকাশ করেন। রামের সুমতি যমুনায় প্রকাশিত হলে শরৎচন্দ্র এক গল্প লিখেই একজন মহাশক্তিশালী লেখক হিসাবে সাহিত্যিক ও পাঠক মহলে পরিচিত হন।
ইতিপূর্বে ১৩১৪ সালে ভারতী পত্রিকায় শরৎচন্দ্রের ‘বড়দিদি’ প্রকাশিত হয়েছিল। তখন অনেকের মত রবীন্দ্রনাথও এই লেখা পড়ে শরৎচন্দ্রকে প্রতিভাবান লেখক বলে বুঝেছিলেন।
১৯১৬ খ্রীস্টাব্দের গোড়ার দিকে শরৎচন্দ্র হঠাৎ দুরারোগ্য পা-ফোলা রোগে আক্রান্ত হন। তখন তিনি স্থির করেন অফিসে এক বছরের ছুটি নিয়ে কলকাতায় এসে কবিরাজী চিকিৎসা করাবেন। অফিসে শেষ দিনে ছুটি চাইতে যাওয়ায় উপরওয়ালা সাহেবের সঙ্গে ঝগড়া হয়। ফলে শরৎচন্দ্র চাকরিতে ইস্তফা দিয়েই বরাবরের জন্য রেঙ্গুন ছেড়ে দেশে চলে আসেন। চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি সাহিত্যকে বেছে নিলেন। ‘চরিত্রহীন’, ‘নারীর মূল্য’, ‘রামের সুমতি’-এই সব রচনায় তিনি সমাজের মুখোশ খুলে দেখালেন বিশেষ করে নারীর যন্ত্রণার ভাষা দিলেন। তাঁর উপন্যাস ‘দেবদাস’-এই একটি নামই যথেষ্ট শরৎচন্দ্রকে বোঝাতে।
দেবদাস কোনো একক চরিত্র নয়; সে বাঙালি সমাজের দ্বিধাগ্রস্ত, সাহসহীন পুরুষমানসের প্রতীক। পার্বতী তার সম্পূর্ণ বিপরীত-সাহসী, স্পষ্টবাদী, ভালোবাসায় অকুতোভয়। কিন্তু সমাজ, জাত, অর্থ, মর্যাদার দেওয়াল তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়ে। দেবদাসের সবচেয়ে বড় অপরাধ তার কাপুরুষতা। সে ভালোবাসে, কিন্তু দাঁড়াতে পারে না। সিদ্ধান্ত নেয়, আবার ভেঙে পড়ে। এই দ্বিধাই তাকে ঠেলে দেয় আত্মবিনাশের পথে। চন্দ্রমুখী-যাকে সমাজ পতিতা বলে দূরে সরিয়ে রাখে। সেই মেয়েটিই হয়ে ওঠে দেবদাসের জীবনের সবচেয়ে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। শরৎচন্দ্র এখানেই সমাজকে আয়না দেখান-নৈতিকতার নামে আমরা কাদের অপমান করি, আর কাদের মাথায় তুলে রাখি। দেবদাসের মৃত্যু কোনো রোমান্টিক ট্র্যাজেডি নয়। এ এক ব্যর্থ সমাজব্যবস্থার মর্মান্তিক পরিণতি। পার্বতীর বন্ধ দরজার সামনে তার মৃত্যু যেন হাজারো অপূর্ণ ভালোবাসার প্রতীক হয়ে থাকে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাঙালিকে প্রেম করতে শিখিয়েছেন, আবার সেই প্রেমের দায়ও বুঝিয়েছেন। তাঁর সাহিত্য আমাদের কাঁদায়। কিন্তু দুর্বল করে না-বরং প্রশ্ন করতে শেখায়। এই কারণেই তিনি কেবল একজন জনপ্রিয় লেখক নন, তিনি বাঙালি আত্মার ইতিহাসবেত্তা।
শরৎচন্দ্রের প্রবন্ধগুলোর মধ্যে ‘নারীর মূল্য’ নিঃসন্দেহে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও যুগান্তকারী রচনা। এই প্রবন্ধে তিনি নারীকে করুণার পাত্র হিসেবে নয়, মানুষের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। তাঁর বক্তব্য ছিল স্পষ্ট, নারীকে সমাজ দয়া করে বাঁচতে দেয়, কিন্তু সম্মান দিয়ে বাঁচতে দেয় না। তিনি আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছেন এই সমাজ নারীর সতীত্বকে তার একমাত্র পরিচয় বানিয়ে ফেলেছে। অথচ পুরুষের ক্ষেত্রে এমন কোনো কঠোর নৈতিক মাপকাঠি নেই। এই দ্বিচারিতার বিরুদ্ধে তাঁর ভাষা ছিল দৃপ্তও নির্মম সত্যনিষ্ঠ। তিনি বিশ্বাস করতেন, নারীকে মুক্ত করতে হলে আগে পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের প্রয়োজন।
‘স্বদেশ ও সাহিত্য’ প্রবন্ধে তিনি দেশপ্রেমের কৃত্রিম উচ্ছবাসের বিরোধিতা করেছেন। তাঁর মতে, স্বদেশপ্রেম মানে কেবল স্লোগান দেওয়া নয়। নিজের সমাজের দুঃখ-দুর্দশা বোঝা এবং তার প্রতিকার করা। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন-যে সাহিত্য মানুষের দুঃখকে উপেক্ষা করে, সে সাহিত্য দেশপ্রেমিক হতে পারে না। সাহিত্যিকের দায়িত্ব মানুষের পাশে দাঁড়ানো, তাদের যন্ত্রণাকে ভাষা দেওয়া। এই প্রবন্ধে শরৎচন্দ্র সাহিত্যকে নৈতিক দায়বদ্ধতার জায়গায় দাঁড় করিয়েছেন।
সাহিত্যও জীবনের সম্পর্ক ‘সাহিত্যের কথা’ প্রবন্ধে শরৎচন্দ্র সাহিত্যকে কল্পনার বিলাসিতা থেকে টেনে এনে জীবনের মাটিতে বসিয়েছেন। তাঁর মতে, সাহিত্য জীবনের বাইরে দাঁড়িয়ে কিছু বলতে পারে না। মানুষের হাসি-কান্না, ব্যর্থতা, ভালোবাসা-এই সবই সাহিত্যের প্রাণ। তিনি সমসাময়িক কিছু সাহিত্যিকের কৃত্রিম আভিজাত্য ও দুর্বোধ্য ভাষার সমালোচনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, যে সাহিত্য সাধারণ মানুষের হৃদয়ে পৌঁছায় না, সে সাহিত্য দীর্ঘজীবী হয় না। এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে জনমানুষের লেখক করে তুলেছে। ‘নৈতিকতা’ বিষয়ে শরৎচন্দের দৃষ্টিভঙ্গি শরৎচন্দ্রের প্রবন্ধে নৈতিকতা কোনো ধর্মীয় বিধান নয়, বরং মানবিক অনুভূতির ফল। তিনি দেখিয়েছেন, সমাজ যাকে অনৈতিক বলে দাগিয়ে দেয়, তার পেছনে প্রায়শই থাকে সামাজিক ভণ্ডামি। ‘চরিত্রহীন’ উপন্যাসের মতোই তাঁর প্রবন্ধেও নৈতিকতার মুখোশ খুলে পড়ে। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, নৈতিকতা কি কেবল নারীর জন্য? পুরুষের ভুল কি সমাজ এত সহজে ক্ষমা করে দেয় না? এই প্রশ্নগুলো আজও সমান প্রাসঙ্গিক। শরৎচন্দ্রের প্রবন্ধভাষা ও শৈলী শরৎচন্দ্রের প্রবন্ধভাষা সহজ, সরল কিন্তু গভীর। তিনি জটিল তত্ত্বে যাননি, বরং জীবনের উদাহরণ টেনে এনেছেন। তাঁর ভাষায় আবেগ আছে, কিন্তু আবেগ যুক্তির জায়গা দখল করে নেয় না। এই ভারসাম্যই তাঁর প্রবন্ধকে পাঠযোগ্য ও প্রভাবশালী করে তুলেছে। তিনি কখনোই উপদেশের সুরে কথা বলেননি। বরং পাঠকের সঙ্গে এক ধরনের আত্মীয়তার সম্পর্ক তৈরি করেছেন-যেন তিনি পাশে বসে ধীরে ধীরে কথা বলছেন। প্রবন্ধ ও কথাসাহিত্যের মিলনবিন্দু শরৎচন্দ্রের প্রবন্ধ ও উপন্যাস পরস্পরের বিরোধী নয়; বরং একে অপরের পরিপূরক। প্রবন্ধে তিনি যে প্রশ্নগুলো তুলেছেন, উপন্যাসে সেগুলোর মানবিক রূপ দিয়েছেন।

---------