ফিচার শিল্প-সাহিত্য

রাতগুলি ছিলো গজলের

আমজাদ আল মামুন »

মন খারাপেরও যে একটি নিজস্ব ভূগোল আছে, তা আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে শিখেছিলাম। পৃথিবীর কোনো মানচিত্রে তার অবস্থান চিহ্নিত করা নেই, তবু মানুষ হঠাৎ করেই সেখানে গিয়ে পড়ে। চারপাশে মানুষ থাকে, কোলাহল থাকে, আকাশ থাকে, রোদ-বৃষ্টি থাকে-শুধু নিজের ভেতরে এক অদ্ভুত শূন্যতা জন্ম নেয়। সেই শূন্যতা কিসের, কেন, তার কোনো উত্তর পাওয়া যায় না।
সেদিন ছিল তেমনই একটি দিন।
বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়েছে আগের দিন। ক্যাম্পাস প্রায় ফাঁকা। বন্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে একটা অদ্ভুত প্রতিধ্বনি জন্ম নেয়। মনে হয়, কিছুক্ষণ আগেও এখানে শত মানুষের পদচারণা ছিল, হাসি ছিল, প্রেম ছিল, রাজনীতি ছিল, আর এখন হঠাৎ সবকিছু গুটিয়ে নিয়ে কেউ যেন চলে গেছে।
আমি ও আমার বন্ধু হাসান তখন চট্টগ্রাম শহরের লালখান বাজারের বাঘঘোনার একেবারে শেষ প্রান্তে একটা মেসে থাকি। জায়গাটা মোটামুটি বস্তির মতোই-সরু গলি, টিনের চাল, ভেজা কাপড়ের গন্ধ, চিরস্থায়ী রান্নার ধোঁয়া আর অগণিত মানুষের জীবনযুদ্ধের শব্দে ভরা। সেই ঘিঞ্জি জনপদের মাঝখানে পাঁচতলা একটা পাকা ভবন। ভবনটাকে খুব বিলাসবহুল বলা যাবে না, তবে ছাত্রদের থাকার জন্য যথেষ্ট ভদ্রস্থ। আমরা থাকতাম পাঁচতলায়।
আমার খাটের ঠিক পাশের খাটটায় ঘুমাত হাসান।
হাসান নোয়াখালীর ছেলে। আর আমি চট্টগ্রামের।
আমাদের বন্ধুত্বের শুরু হয়েছিল গজল দিয়ে।
প্রথম প্রথম গভীর রাতে পাশের খাট থেকে ভেসে আসত মেহেদী হাসানের কণ্ঠ-
“রঞ্জিশ হি সাহি, দিল হি দুখানে কে লিয়ে আ”
আমি বিরক্ত হয়ে বলতাম,
এইসব কান্নাকাটি গান রাতে শুনিস কেন?
অন্ধকারে শুয়ে থাকা হাসান হাসত।
গান না, গজল।
ওই একই কথা।
না। গজল আর গান এক না। গজল হচ্ছে মানুষের ভেতরের গোপন ঘরগুলোর ভাষা।
আমি বলতাম,
এসব ফালতু কথা বাদ দিয়ে বাংলায় বল।
হাসান তখন উঠে বসত। জানালা দিয়ে দূরের শহরের আলো দেখা যেত।
শোন, এই লাইনটার মানে হচ্ছে, “তুমি যদি ভালোবেসে না-ও আসো, তবু এসো। অন্তত কষ্ট দিতেও এসো।”
আমি অবাক হয়ে শুনতাম।
সেই শুরু।
তারপর গজল শুনতে শুনতে কখন যে আমি হাসানের ব্যাখ্যার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম, তা বুঝতেই পারিনি। আসলে আমি গজল যতটা শুনতাম, তার চেয়ে বেশি শুনতাম হাসানকে।
মেসের অন্য ছেলেরা অবশ্য আমাদের রাতজাগা পছন্দ করত না।
একদিন পাশের রুমের জহির রেগে গিয়ে বলল,
তোরা দুইজন মানুষ, না নিশাচর পাখি? সারারাত মেহেদী হাসান আর জগজিৎ সিং শুনলে আমরা ঘুমাবো কখন?
তারপর থেকেই আমরা নতুন একটা আশ্রয় খুঁজে পেলাম।
আমাদের মেস ভবনের দক্ষিণ দিকে একটা খোলা বারান্দা ছিল। পাঁচতলার সেই বারান্দা যেন শহরের ওপর ঝুলে থাকা একটা ছোট্ট দ্বীপ। সামনে আর কোনো উঁচু বাড়ি ছিল না। দূরে চট্টগ্রাম শহরের আলো, আরও দূরে অন্ধকার পাহাড়ের রেখা। বর্ষার রাতে দক্ষিণের বাতাসে সমুদ্রের গন্ধ ভেসে আসত।
আমরা নিজেদের বিছানা ছেড়ে তোষক, বালিশ, চাদর টেনে নিয়ে চলে যেতাম সেই বারান্দায়।
কত রাত যে সেখানে কেটেছে!
এখনো চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই- আকাশে ভাঙা মেঘ, দূরে লালখান বাজারের কুকুরের ডাক, অনেক রাতের শেষ ট্রেনের হুইসেল, আর আমাদের মাঝখানে রাখা ছোট্ট টেপ রেকর্ডার।
মেহেদী হাসান গাইছেন-
“জিন্দেগী মে তো সবহি পেয়ার কিয়া করতে হ্যায়”
আমি বলছি,
এর মানে কী?
হাসান সিগারেটে একটা টান দিয়ে বলছে,
সব মানুষই জীবনে প্রেম করে। কিন্তু খুব কম মানুষই ভালোবাসাকে সম্মান করতে পারে।
আমি হেসে বলতাম,
কবি কি সত্যিই এইটাই বলতে চেয়েছেন?
হাসানও হাসত।
জানি না। কিন্তু আমি এইটাই বুঝি।
অনেক রাতে গজল বন্ধ হয়ে যেত। আমরা তখনও জেগে থাকতাম।
হাসান বলত,
জানিস, পৃথিবীতে কিছু বন্ধুত্বের কোনো কারণ থাকে না।
যেমন?
যেমন তুই আর আমি।
বেশি গজল শুনে তুই পাগল হয়ে যাচ্ছিস।
হাসান হেসে বলত,
হতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হওয়ার আগের রাতেও আমরা সেই বারান্দায় ছিলাম।
জগজিৎ সিংয়ের গলায় ভেসে আসছিল-
“তুমকো দেখা তো ইয়ে খেয়াল আয়া”
গান শেষ হওয়ার পর হাসান হঠাৎ বলল,
আমি যদি হঠাৎ একদিন হারিয়ে যাই, তুই কি আমাকে খুঁজতে আসবি?
আমি হেসে বললাম,
তুই কী প্রেমিকা নাকি?
তবু?
ঠিকানা না জানলে খুঁজব কীভাবে?
হাসান হাসল।
তুই আমাকে খুঁজতে আসবি না। তুই খুব অলস।
তারপর কথাটা অন্যদিকে চলে গিয়েছিল।
সত্যি বলতে কী, আমি হাসানের নোয়াখালীর বাড়ির কোনো ঠিকানাই জানতাম না। এমনকি গ্রামের নামটাও না।
শুধু একদিন চট্টগ্রাম থেকে ওকে নোয়াখালীগামী বাসে তুলে দেওয়ার সময় কন্ডাক্টরকে বলতে শুনেছিলাম-
“আমিন বাজার নামবো।”
ব্যস, ওইটুকুই।
পরে বহুবার ভেবেছি, মানুষ কখনো কখনো কী ভয়ংকর সামান্য তথ্যের ওপর ভর করেই কত বড় যাত্রায় বেরিয়ে পড়ে!
বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হওয়ার দুদিন পর, এক বর্ষণমুখর দুপুরে, হঠাৎ আমার ভীষণ মন খারাপ হলো।
কোনো কারণ ছাড়াই।
বাইরে বৃষ্টি হচ্ছিল। মেসের ঘরটা অসহ্য লাগছিল। দক্ষিণের বারান্দাটা ফাঁকা পড়ে আছে। টেপ রেকর্ডারটা নীরব।
হঠাৎ মনে হলো, হাসানের কাছে যাই।
কোনো পরিকল্পনা নেই। কোনো খবর দেওয়া নেই।
ব্যাগে দুটো জামা গুঁজে নিয়ে উঠে বসলাম নোয়াখালীগামী বাসে।
সারাপথ বৃষ্টি।
বাসের জানালার কাচে জলধারা নেমে আসছিল। মনে হচ্ছিল, কেউ আকাশের গায়ে অদৃশ্য কোনো চিঠি লিখছে, কিন্তু শেষ লাইনটা লিখতে পারছে না।
বিকেলের দিকে বাস আমিন বাজারে নামিয়ে দিল।
নামতেই বুঝলাম, আমি পৃথিবীর এক জলমগ্ন প্রান্তে এসে পড়েছি।
চারদিকে থৈ থৈ পানি। আকাশ নিচু হয়ে এসেছে। দূরের তালগাছগুলোকে কুয়াশার মতো লাগছে।
একজন রিকশাওয়ালাকে বললাম,
মিয়াপুর যাবেন?
লোকটা কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে মাথা নাড়ল।
রিকশা চলতে শুরু করল।
কাঁচা রাস্তা। হাঁটুসমান কাদা। কয়েক জায়গায় রিকশাওয়ালাকে নেমে ঠেলতে হলো।
একসময় সে একটা ছোট্ট চায়ের দোকানের সামনে রিকশা থামাল।
একটু জিরাই।
আমি বিরক্ত হয়ে রিকশার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকালাম।
আর তারপরই পৃথিবীর সবচেয়ে অসম্ভব ঘটনাগুলোর একটি ঘটল।
বাঁশের বেঞ্চে বসে, হাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ, বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে আছে হাসান।
যেন সে জানত আমি আসব।
আমি চিৎকার করে উঠলাম
হাসান!
হাসান মুখ তুলে তাকাল।
তারপর চায়ের কাপটা ওর হাত থেকে মাটিতে পড়ে ভেঙে গেল।
ও উঠে দাঁড়াল। কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর প্রায় ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল।
কিন্তু আশ্চর্য, সেই আলিঙ্গনে আনন্দের সঙ্গে আরেকটা অনুভূতিও ছিল- যেটাকে আমি তখন চিনতে পারিনি।
আজ মনে হয়, সেটা ছিল ভয়।
তুই?
হ্যাঁ।
সত্যি সত্যি তুই?
—না, আমার ভূত।
হাসান হাসল না।
শুধু বলল,
কখন রওনা হয়েছিস?
আজ দুপুরে।
কাউকে বলে আসছিস?
না।
হাসান দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
ভালো করিসনি।
আমি হেসে ফেললাম।
কেন?
এমনিই।
হাসানদের বাড়িতে আমি একদিনের জন্য গিয়েছিলাম।
থেকে গেলাম ছয় দিন।
ছয়টি দিন, যা আজও আমার জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল স্মৃতিগুলোর মধ্যে একটি।
রাতে আমরা জোনাকি জ্বলা মেঠোপথ ধরে হাঁটতাম। গ্রামের টং দোকানে বসে চা খেতাম। হাসান গজলের শের আবৃত্তি করত।
এক রাতে ধানক্ষেতের আল ধরে হাঁটতে হাঁটতে সে বলল,
শোন,
“কৌন কহতা হ্যায় মোহাব্বত কি জুবাঁ হোতি হ্যায়”
আমি বললাম,
অর্থ?
ভালোবাসার আলাদা কোনো ভাষা নেই।
বেশি গজল শুনে তুই সত্যি সত্যি কবি হয়ে গেছিস।
হাসান হেসে বলল,
িেকছু ভালোবাসা প্রেম না। কিছু ভালোবাসা শুধু বন্ধুত্ব।
তারপর আর কিছু বলেনি।
পঞ্চম রাতের ঘটনা।
সেদিন আকাশে বৃষ্টি ছিল না। আমরা উদ্দেশ্যহীন হাঁটতে হাঁটতে গ্রামের শেষ প্রান্তে একটা পুরোনো বটগাছের নিচে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম।
হঠাৎ দূর থেকে ভেসে এলো গজলের সুর।
খুব ক্ষীণ।
কিন্তু নিঃসন্দেহে মেহেদী হাসানের কণ্ঠ।
“রঞ্জিশ হি সাহি”
আমি অবাক হয়ে বললাম,
এত রাতে এখানে কে গজল শুনছে?
হাসানের মুখ হঠাৎ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
চল, ফিরে যাই।
কেন?
চল।
কিন্তু আমি এগিয়ে গেলাম।
বটগাছের নিচে একজন বৃদ্ধ বসে আছেন। সামনে হারমোনিয়াম।
গান শেষ হলে তিনি ধীরে ধীরে চোখ খুললেন।
সরাসরি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
অবশেষে এলে?
আমি অবাক হয়ে বললাম,
আপনি আমাকে চেনেন?
বৃদ্ধ মৃদু হাসলেন।
চেনা-অচেনা সবই সময়ের ভুল বোঝাবুঝি।
তারপর হাসানের দিকে তাকালেন।
আমি বলেছিলাম না, সে আসবে?
হাসান কোনো উত্তর দিল না।
আমি প্রথমবার লক্ষ্য করলাম, ওর হাত কাঁপছে।
বৃদ্ধ হারমোনিয়ামের ওপর রাখা একটি পুরোনো খাম আমার হাতে দিলেন।
খামের ভেতরে একটি বিবর্ণ সাদা-কালো ছবি।
দুজন তরুণ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।
একজনকে দেখে আমার বুক ধক করে উঠল।
ছেলেটি দেখতে অবিকল আমার মতো।
অন্যজন- হাসানের মতো।
ছবির পেছনে লেখা-
“মিয়াপুর, আগস্ট ১৯৭১। গজল শেষ হয়নি। আবার শোনা হবে।”
আমি মাথা তুলে কিছু বলতে গেলাম।
কিন্তু বৃদ্ধ নেই।
হারমোনিয়াম নেই।
বটগাছের নিচে শুধু বাতাস।
সেই রাতে আমরা আর কোনো কথা বলিনি।
পরদিন ভোরে আমার ঘুম ভাঙল বৃষ্টির শব্দে।
হাসান উঠোনে দাঁড়িয়ে ছিল।
আমাকে দেখে বলল,
আজ চলে যাবি?
হ্যাঁ। বিশ্ববিদ্যালয় খুলতে তো আর বেশি দেরি নেই।
হাসান মাথা নেড়ে বলল,
দক্ষিণের বারান্দাটার কথা মনে রাখিস।
আমি হেসে বললাম,
আবার তো দেখা হবেই।
হাসান উত্তর দিল না।
শুধু আমার ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিল।
আমাকে আমিন বাজার পর্যন্ত পৌঁছে দিতে এল।
বাস ছাড়ার আগে সে বলল,
যদি কোনোদিন খুব মন খারাপ হয়, একটা গজল চালিয়ে দিবি। আমি শুনব।
আমি হেসে বললাম,
নোয়াখালী থেকে?
হাসানও হাসল।
কিন্তু সেই হাসির মধ্যে কেমন যেন একটা বিদায়ের রং ছিল।
বিশ্ববিদ্যালয় খুলল।
আমি মেসে ফিরে এলাম।
দক্ষিণের বারান্দা আগের মতোই আছে। আকাশও আছে।
শুধু হাসান আর ফিরল না।
প্রথমে ভাবলাম, হয়তো বাড়িতে কোনো সমস্যা হয়েছে।
এক সপ্তাহ।
দুই সপ্তাহ।
এক মাস।
কোনো খবর নেই।
অবশেষে একদিন বিভাগের অফিসে গেলাম।
অনেক খোঁজাখুঁজির পর ক্লার্ক ভদ্রলোক বললেন,
কামরুল হাসান এই নামে তো আমাদের বিভাগে কোনো ছাত্র নেই।
আমি ভেবেছিলাম, তিনি ভুল করছেন।
কিন্তু সেদিন রাতে দক্ষিণের বারান্দায় গিয়ে আমি আরেকটা অদ্ভুত জিনিস দেখলাম।
যেখানে হাসান শুত, সেখানে একটা পুরোনো ক্যাসেট পড়ে আছে।
ক্যাসেটের গায়ে হাসানের হাতের লেখা-
“রঞ্জিশ হি সাহি”
আমি টেপ রেকর্ডারে ক্যাসেটটা চালালাম।
প্রথমে শুধু বৃষ্টির শব্দ।
তারপর খুব ক্ষীণ একটা কণ্ঠ-
অর্থটা তোকে এখনো বলা হলো না
তারপর আবার শুধু বৃষ্টি।
আজও বর্ষার রাতে, খুব মন খারাপ হলে, আমি দক্ষিণমুখী কোনো বারান্দায় বসে গজল শুনি।
আর কখনো কখনো মনে হয়, ঠিক আমার পাশেই কেউ খুব আস্তে করে শের এর অর্থ বুঝিয়ে দিচ্ছে।