রক্ষা পাচ্ছে সিআরবি

নগরীর ফুসফুসখ্যাত সবুজ এ অংশটি অবশেষে রক্ষা পাচ্ছে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্রী শোয়েব ফারুকীর তোলা ছবি

ভূঁইয়া নজরুল »
অবশেষে রক্ষা পেতে যাচ্ছে সিআরবি! নগরীর ফুসফুস খ্যাত সবুজে ঘেরা এই এলাকাটিকে রক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করে আসার ফল পেতে যাচ্ছে নগরবাসী। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) এর আওতায় এখানে হাসপাতাল নির্মাণের জন্য প্রকল্প গ্রহণ করে। আর মাঠ পর্যায়ে নির্মাণের প্রারম্ভিক কাজ শুরুর সাথে সাথেই চট্টগ্রামের সচেতন নাগিরক সমাজ, পরিবেশবাদী সংগঠন ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের তীব্র বিরোধিতার মুখে সিআরবির বিকল্প হতে যাচ্ছে কুমিরায় রেলের জায়গা।

হাসপাতালের বিকল্প স্থান কুমিরা : এবিএম ফজলে করিম, রেলপথ সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি


প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ : ড. অনুপম সেন, সিআরবি রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি

রেলপথ সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ২০তম সভায় সিআরবির বিকল্প হিসেবে কুমিরার নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। এবিষয়ে জানতে চাইলে রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবিএম ফজলে করিম এমপি বলেন, ‘সিআরবিতে হাসপাতাল হউক এটা যেহেতু চট্টগ্রামবাসী চায় না। কিন্তু চট্টগ্রামের জন্য আধুনিক হাসপাতালের প্রয়োজন রয়েছে। তাই হাসপাতালের জন্য বিকল্প স্থান প্রয়োজন। আমরা বিকল্প হিসেবে কুমিরার নাম প্রস্তাব করেছি।’
তাহলে কি সিআরবির পরিবর্তে কুমিরায় হাসপাতালটি নির্মিত হচ্ছে? এমন প্রশ্নের জবাবে এবিএম ফজলে করিম বলেন, ‘কোথায় নির্মিত হবে সেই সিদ্ধান্ত দিবেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। যেহেতু সিআরবিতে হাসপাতাল নিয়ে আন্দোলন হচ্ছে তাই আমরা এর বিকল্প স্থান নির্ধারণ করেছি।’
কুমিরা কোথায় জায়গা রয়েছে জানতে চাইলে পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ের প্রধান ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা সুজন চৌধুরী বলেন,‘কুমিরা রেলওয়ে স্টেশনের বিপরীতে পাহাড়ের উপরে রেলওয়ের একটি যক্ষা হাসপাতাল ছিল। প্রায় ৩০ বছর আগে থেকে হাসপাতালটি পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। সংসদীয় কমিটি সেখানে থাকা প্রায় ১৩ একর জায়গায় হাসপাতাল নির্মাণের জন্য বিকল্প প্রস্তাবনা দিয়েছে। সিআরবির বিকল্প হিসেবে এই স্থানটিকে বেছে নেয়া হয়েছে।’
এদিকে সম্প্রতি কুমিরা যক্ষা (বক্ষব্যাধি) হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, পাহাড়ের উপরের এই হাসপাতালটি লোকালয় থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। হাসপাতালের কোনো দরজা জানালা নেই। মানুষজন ভেঙে ভেঙে বিভিন্ন অংশ নিয়ে গেছে। এখান থেকে দখিনা বাতাস উপভোগ করা যায়। পশ্চিমে সাগরের বিশাল জলরাশি দেখা যায়। আর পূর্ব দিকে রয়েছে বিশাল পাহাড়ি এলাকা। ১৯৫৫ সালে ৩৯ একর জায়গার উপর এই হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।
বক্ষব্যাধি হাসপাতালটি সম্পর্কে কথা হয় পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ের প্রধান স্বাস্থ্যকর্মকর্তা ডা. আবদুল আহাদের সঙ্গে। তিনি বলেন,‘ সারাদেশের রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী যারা বক্ষব্যাধি (যক্ষা) রোগে আক্রান্ত হতো তাদেরকে সম্পূর্ণ পৃথক (আইসোলেশন) রেখে পাঁচ থেকে ছয় মাস ধরে চিকিৎসা দেয়া হতো এই হাসপাতালে।’
তিনি আরো বলেন, খোলা বাতাস ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে রোগীরাও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতো। পরবর্তীতে বিসিজি টিকা আবিষ্কারের পর এবং বক্ষব্যাধি চিকিৎসায় সারাদেশে হাসপাতাল গড়ে উঠায় এই হাসপাতালটি ১৯৯২-৯৩ সালে বন্ধ করে দেয়া হয়। এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
সংসদীয় কমিটির নতুন প্রস্তাবনার বিষয়ে কথা সিআরবি রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি ও প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. অনুপম সেন বলেন, ‘এই প্রস্তাবনা আমাদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ফসল। আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে দুই দফা লিখিত আবেদন করে জানিয়েছি চট্টগ্রামের নির্মল পরিবেশের স্বার্থে সবুজে ঘেরা সিআরবিকে রক্ষার জন্য। অবশেষে তা রক্ষা পাচ্ছে বলে সিআরবি রক্ষা আন্দোলনের পক্ষ থেকে এবং চট্টগ্রামবাসীর পক্ষ থেকে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানাই।’
উল্লেখ্য, টাইগারপাস, লালখানবাজার, স্টেডিয়াম, কদমতলী এলাকার মধ্যবর্তী সিআরবি জোনটি হেরিটেজ জোন হিসেবে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মাস্টারপ্ল্যানে উল্লেখ করা আছে। আর হেরিটেজ জোনে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করা যায় না। পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ে সদর দপ্তরের ভবনটিও পুরার্কীতি হিসেবে চিহ্নিত। শ্বাস নেওয়ার এই মনোরম জায়গাটি রক্ষার জন্য দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন কর্মসূচি পালন করে আসছিল নগরবাসী।