শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
ফিচার শিল্প-সাহিত্য

মনিরুল মনির : সাহিত্যের সুবর্ণ আলোয় এক প্রাজ্ঞ শব্দশিল্পী

দেবব্রত সেন »

সাহিত্যের আঙিনায় একজন অসাম্প্রদায়িক চেতনার কবি মনিরুল মনিরের দশকের পর দশক পথচলা কেবল কিছু পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা শব্দ বুনে যাওয়া নয়; বরং সমাজ, মানুষ এবং মহাকালের মনস্তত্ত্বকে সুনিপুণ ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলার এক দীর্ঘ সাধনা। গত কয়েক দশকে তিনি তাঁর লেখা কবিতায়, শিল্পে, সৃজনে, সম্পাদনায়, প্রকাশনায়, মুদ্রণে, সংগঠনে এবং আন্দোলনের ভেতর দিয়ে আমাদের চিন্তাভাবনাকে সমৃদ্ধ করেছেন, শিখিয়েছেন জীবনের ভিন্ন এক রূপ দেখতে। আজ তাঁর এই পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে আমরা কেবল একজন ব্যক্তির বয়স উদযাপন করছি না, বরং উদযাপন করছি বাংলা সাহিত্যের একটি সমৃদ্ধ অধ্যায়কে।
একজন মানুষের আসল পরিচয় তাঁর বয়সে নয়, বরং তাঁর সৃষ্টিতে। সমাজের রূঢ় বাস্তবতা কিংবা রাজনৈতিক টানাপোড়েনের ভেতর দিয়েও কবি মনিরুল মনির তাঁর সৃিষ্টশীলতায় সমাজকে যেভাবে এগিয়ে নেওয়ার মহান ব্রতে আত্মমগ্ন রয়েছেন তা এই সময়ে সত্যিই বিরল। তাঁর কলমে যেমন উঠে এসেছে প্রান্তিক মানুষের হাহাকার, মধ্যবিত্তের টানাপোড়েন, সামাজিক সংকট তেমনি প্রতিধ্বনিত হয়েছে শোষিত শ্রেণীর কণ্ঠস্বর । সমসাময়িক যেকোনো অন্যায় কিংবা মানবিক বিপর্যয়ে তাঁর কলম কখনো স্তব্ধ থাকেনি। তাঁর লেখার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো মননশীলতা, প্রচ্ছন্ন গভীরতা এবং পরিমিত শব্দচয়নের এক নিপুণ রসায়ন । মানুষের মনের গহীনের অবদমিত ক্ষোভ, ভালোবাসা, হতাশা আর স্বপ্নকে তিনি যেভাবে শব্দের ফ্রেমে বন্দি করেছেন, তা পাঠকদের বারবার মুগ্ধ করে।
কবি মনিরুল মনিরের প্রথম কাব্যগ্রন্থ- ঘরবদলের মানচিত্র প্রকাশিত হয় ২০০৭ এ, এর পর দীর্ঘ বিরতি, ২০১০ এর বই মেলায় প্রকাশিত হয়েছে -শব্দের অনন্ত অন্তর। আবারও বিরতি দিয়ে ২০১৪ ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত হয়-নোঙরের মাতাল দরজা ।
সমস্ত জাগতিক চঞ্চলতা ও বিভেদ ভুলে পরম শান্তিময় অদ্বৈত চেতনায় ‘নির্বিকল্পে’ ফিরে আসার আহ্বান বারবার ধ্বনিত হয়েছে তাঁর কবিতায়।
“আগুনের রঙ দেখতে-দেখতে/ আগুন উধাও/আলো আগুনের অনুতাপ/ঘন অন্ধকারে শোনার মতো/ আর কোনও গল্প নাই/গল্পের রেশ ঘিরে রেখেছে/সকল অন্ধকারকে/ফিরে এসো নির্বিকল্পে/খুঁজে নেবো ঘরবদলের মানচিত্র”
নিদারুণ ছদ্মবেশে উদ্বাস্তু, মাতাল জীবনের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে এসে আত্মোপলব্ধির মাধ্যমে সমস্ত অন্ধকার মুছে সুন্দর এক পৃথিবী নির্মাণের স্বপ্নে বিভোর কবি বাতিঘরে বসে রাত্রির প্রহর গুনছেন । হিংসা জর্জরিত মহাকালের গর্ভে বিকল মানচিত্রে ভালোবাসা খুঁজে ফেরেন কবি মনিরুল মনির, কারণ তিনি এটা উপলব্ধি করতে পেরেছেন যে, মানুষ প্রকৃতির সামান্য একটা উপাদান মাত্র, প্রকৃতির মাঝেই বিলীন হয়ে যেতে হবে। আর এই রূপবতী নিসর্গের জালে ভালোবাসাময় পৃথিবীর স্বপ্নে তিনি নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন অকাতরে। জীবনের মধ্যাহ্ন বেলায় এসে হয়তো নিজেকে খুঁজে পেয়েছেন শব্দের অনন্ত অন্তরে।
দেবালয়ে ঈশ^রের বদলে ভুত দেখে অনন্ত অন্তর থেকে উৎসারিত শব্দে তিনি সমাজকে আঘাতের পর আঘাতে করেছেন, “পতন দেখেছি বহুবিধ সমাজপতিদের/লজ্জা নেই বলে তারা বারবার আসেন” অথবা “চেতনাকে বাতাসে উড়িয়ে শ্মশান করেছে দেশ”- এই সাধারণ শব্দগুলোর বিন্যাস এবং কবিতার মূল নির্যাস এমন এক গভীরতা তৈরি করে, যা বোদ্ধা পাঠকের চিন্তাকে আলোড়িত করে, নিমজ্জিত করে গভীর মগ্নতায় ।
‘বিকারগ্রস্তদের আড্ডা’ কবিতায় কবি মনিরুল মনির সমকালীন আধুনিক সমাজের নৈতিক অবক্ষয়, পুঁজিবাদী আগ্রাসন এবং প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার অন্তঃসারশূন্যতার বিরুদ্ধে এক তীব্র নান্দনিক ও দ্রোহাত্মক উচ্চারণ করেেছন। কবি এখানে সমাজ-বাস্তবতার এমন এক নগ্ন রূপকে উন্মোচিত করেছেন, যেখানে সুস্থ জীবনবোধ ও মননশীলতার চরম আকাল দৃশ্যমান।
“নারী ও নগ্নতা ছাড়া আড্ডা জমে ওঠে না,.. বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ড, অনুন্নত বুকের ঢেউ, প্রসাধনের মরণ-কামড় তুলতে ভাটা এসে পড়ে মহা সমুদ্রে,.. হয়তোবা একদিন পৃথিবীর পাঠশালায় রবে না ইস্কুল নামক উৎপাত।”
মনিরুল মনিরের কবিতায় বাস্তবতার সমান্তরালে এক পরাবাস্তব জগতের দেখা মেলে। তিনি চেনা চারপাশকে অচেনা ও প্রতীকী রূপে উপস্থাপন করতে পছন্দ করেন। তীক্ষè সমাজ চেতনার পাশাপাশি তাঁর কবিতায় এক ধরণের অন্তর্নিহিত একাকীত্ব, মমতার সংকট, স্মৃতিকাতরতা এবং বিষাদের অপূর্ব কোলাজ তৈরি হয় যা পাঠক মনে শিহরণ সৃষ্টি করে। গ্রাম, প্রকৃতি, আগুন, নদী, ঘুম, সিংহাসন, মৃতমুদ্রা, চিতা, অন্ধকার, ঘাসফড়িং, রক্ত, প্রজাপতি, রাত, ব্যাঙ, অ্যানাটমি, বুদবুদ, ছাদ, ইতিহাস, মরু, পাহাড়, ঈশ^র, মহাকাল প্রতীকগুলো তাঁর কাব্যে বারবার ফিরে আসে এক অলৌকিক মায়া তৈরিতে।
‘ঈমানদার খুঁজে পাবে না’ কবিতাটি পাঠে পাঠক সহজেই একজন মনিরুল মনিরকে আন্দাজ করতে পারবেন:
“এ নাস্তিকের শহরে অনেকে পাপ করে
কেঁদে কেঁদে ধর্ষণে যায় সুবোধ বালকেরা
আজ বৃষ্টির দিনেও কোন সড়ক ভেজা থাকে না
রোদের হাহাকারে ঘুম ভাঙে কোনও কোনও রমণীর
বর্ণহীন সকালে পাখির জন্য খাবার হাতে
দাঁড়িয়ে থাকেন কম্যিউনাল পুরুষ”
কবি মনিরুল মনির এ কবিতায় মূলত সমকালীন সমাজের এক চরম নৈতিক বিপর্যয়, মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা এবং মানবচরিত্রের ভেতরকার ভয়ঙ্কর দ্বিচারিতার এক নির্মম ব্যবচ্ছেদ। সাহিত্যের পরিভাষায় এটি এক আধুনিক অবক্ষয়িত সমাজের রূপক, যেখানে চেনা বাস্তবতার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অচেনা আর কুৎসিত বিবেকহীনতা।’নাস্তিকের শহর’ এবং ‘ঈমানদার’ খোঁজার যে আপাত-বৈপরীত্য তুলে ধরেছেন, তা আসলে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের বিতর্ক নয়; বরং এটি মানুষের ভেতরের শাশ্বত নৈতিকতা ও বিশ্বাসের চরম আকালকে নির্দেশ করে। এই শহরে বাহ্যিক ধার্মিকতা বা প্রগতির আড়ালে মানুষের আত্মিক শূন্যতা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে পবিত্রতা এক মরীচিকা। সবচেয়ে তীব্র ও বিষাক্ত আঘাতটি কবি হেনেছেন সমাজের তথাকথিত ‘সুবোধ বালক’দের ওপর। ‘কেঁদে কেঁদে ধর্ষণে যায়’Ñএই চরণে লুকিয়ে আছে এক ভয়ঙ্কর মনস্তাত্ত্বিক সত্য। এটি মানুষের অবদমিত কাম, অপরাধবোধ এবং একই সাথে সেই অপরাধে লিপ্ত হওয়ার এক বিকৃত খতিয়ান।
কবিরা কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমারেখার গণ্ডিতে আবদ্ধ নন; তাঁরা সমগ্র পৃথিবীর সন্তান। তাদের হৃদয়ের ক্যানভাসে কোনো খণ্ডিত দেশ, ধর্ম, বর্ণ বা সম্প্রদায়ের সংকীর্ণতা থাকে না। বিশ্বজনীন মানবতাই তাঁদের একমাত্র ধর্ম এবং মুক্তির পথ। মানবের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না আর যাপিত জীবনের স্পন্দনকে ধারণ করেই কবিরা তাঁদের সৃষ্টির আলো জ্বালান। তাই মানুষের যেকোনো সংকটে, অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে এবং দুঃখ-কষ্টে সান্ত্বনা ও আশার আলো নিয়ে পাশে দাঁড়ানোই তাঁদের পরম নৈতিক দায়িত্ব। কবিদের কোনো পাসপোর্ট বা সীমানা থাকে না। তাঁদের কবিতার ভাষা হয়ে ওঠে সারা পৃথিবীর নিপীড়িত ও সাধারণ মানুষের মুক্তির গান।
কবি মনিরুল মনির সম্পাদনা করেছেন ছোটকাগজ ‘কাকাতিতা’ (গ্রাম বিষয়ক), ‘খড়িমাটি’, ‘এনেসথেসিয়া’ (ফালগুনী রায় সংখ্যা)। পত্রিকার বাইরেও সম্পাদক ও সংগঠক হিসেবে সাহিত্য পরিমণ্ডল আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ও বিশেষ সংখ্যার মাধ্যমে বিস্তৃত। নান্দনিক প্রচ্ছদে সমৃদ্ধ সংখ্যাগুলোর মধ্যে আহমদ ছফা, আদিবাসী, শামসুর রাহমান, বিনয় মজুমদার, মানিক বন্ধ্যোপাধ্যায়, বিষ্ণু দে, সঞ্জয় ভট্টাচার্য্য, আবদুল মান্নান সৈয়দ, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, সুচরিত চৌধুরী, সুমন প্রবহণ, শহীদ কাদরী, আসাদ মান্নান, সিদ্দিক আহমেদ, জিললুর রহমান, ভাগ্যধন বড়ুয়া, অভীক ওসমান সহ বিশেষ কিছু ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হয়। সম্পাদনা করেছেন-ইতিহাস-ঐতিহ্য : ‘চট্টগ্রাম’ (২০১৭) কলকাতা, ‘চট্টগ্রামের আড্ডা চর্চার ইতিহাস’, ‘চট্টগ্রামের মুদ্রণ শিল্পের ইতিহাস’। জীবনী-প্রবন্ধ করেছেন- ‘প্রফেসর জামাল নজরুল ইসলাম’, ‘ডা. এম এ হাসেম’এর ওপর।
তাঁর সম্পাদিত এই প্রকাশনাগুলো বাংলা সাহিত্যের ছোটকাগজ আন্দোলনে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব রেখে চলেছে। সস্তা জনপ্রিয়তার পেছনে না ছুটে সাহিত্যের খাঁটি মান বজায় রাখতে তিনি সবসময়ই সচেতন। মনিরুল মনির কেবল নিয়মিত পত্রিকা প্রকাশেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। সমকালীন সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ বাঁকগুলোকে চিহ্নিত করতে তিনি ‘খড়িমাটি’র বেশ কিছু ঐতিহাসিক ও সংকলন সংখ্যা সম্পাদনা করেছেন। দুই বাংলার প্রতিশ্রুতিশীল ও নিরীক্ষাধর্মী তরুণ কবিদের কবিতা নিয়ে তিনি একাধিক সংকলন প্রকাশ করেছেন, যা নতুন কণ্ঠস্বর তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। প্রকাশ করেছেন বিশেষ প্রবন্ধ ও সমালোচনা সংখ্যা যেখানে সমকালীন কবিতার গতিপ্রকৃতি, পরাবাস্তববাদ এবং সাহিত্যের তাত্ত্বিক দিকগুলো নিয়ে প্রথিতযশা লেখকদের চিন্তাশীল প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে।
পঞ্চাশের এই মাহেন্দ্রক্ষণ কবি মনিরুল মনিরের জীবনে নিয়ে আসুক আরো গভীর জীবনবোধ। অভিজ্ঞতার কষ্টিপাথরে ঘষে তিনি যে প্রজ্ঞা অর্জন করেছেন, তা তাঁর শব্দকে করবে আরও শানিত। তিনি এখন জীবনকে দেখবেন বিস্তীর্ণ ক্যানভাস হিসেবে, যেখানে ভালো-মন্দের সাদা-কালো ভেদাভেদ ছাপিয়ে মানুষের ধূসর অনুভূতিগুলো প্রাধান্য পাবে আরো বেশি।

---------