একটি রাষ্ট্র যখন কাঠামোগত ও অর্থনৈতিকভাবে বিকেন্দ্রীকরণের দিকে এগিয়ে যাওয়ার কথা, তখন বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র| দেশের একমাত্র জ্বালানি তেল নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় সরিয়ে নেওয়ার সাম্প্রতিক তোড়জোড় কেবল দুঃখজনকই নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সংবিধান ও সুষম উন্নয়নের ধারণার পরিপন্থী| চট্টগ্রামকে কাগজে-কলমে ‘বাণিজ্যিক রাজধানী’ বলা হলেও, বাস্তবে একের পর এক রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর রাজধানীতে নিয়ে যাওয়ার এই প্রবণতা আঞ্চলিক ˆবষম্যকে আরও তীব্র করছে|
বিপিসির সদর দপ্তর ঢাকায় স্থানান্তরের পেছনে যেসব কারণ বা যুক্তি দেখানো হচ্ছে, তা কোনোভাবেই জনকল্যাণমুখী নয়| অভিযোগ রয়েছে, সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরেই চট্টগ্রামবিমুখ| তারা মাসজুড়ে ঢাকায় লিয়াজোঁ অফিসেই সময় কাটান এবং চট্টগ্রামে নিজেদের মূল কার্যালয়ে উপস্থিত হতে অনীহা প্রকাশ করেন| মূলত, কর্মকর্তাদের নিজ¯^ সুযোগ-সুবিধা, ঢাকায় থাকার আরাম-আয়েশ এবং নীতিনির্ধারকদের কাছাকাছি থাকার ব্যক্তিকেন্দ্রিক মানসিকতাই এই স্থানান্তরের মূল কারণ| উপরন্তু, জ্বালানি খাতের একটি বড় অংশের বেসরকারি ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের সুবিধা করে দিতে এবং তদারকি এড়াতেই এই ঢাকাকেন্দ্রীকতার তোড়জোড় চলছে বলে সচেতন মহলের সংশয় অমূলক নয়|
সবচেয়ে বড় পরিহাস হলো, চট্টগ্রামের সার্সন রোডের জয়পাহাড়ে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে বিপিসির নিজ¯^ পাঁচতলা আধুনিক ভবন নির্মাণকাজ প্রায় শেষ| যেখানে ঈদের পর নতুন ভবনে কার্যক্রম শুরু করার কথা, সেখানে বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ঘটিয়ে কার্যালয় ঢাকায় সরিয়ে নেওয়ার পেছনে কোনো যৌক্তিকতা থাকতে পারে না|
বিপিসির আওতাধীন আটটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান—যার মধ্যে ইস্টার্ন রিফাইনারি, পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েলের মতো বিশাল পরিধির জ্বালানি তেল বিপণন সংস্থা রয়েছে—সবগুলোর অবস্থান চট্টগ্রামে| বছরে ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি, খালাস ও সরবরাহের পুরো কর্মযজ্ঞ পরিচালিত হয় এই বন্দরনগরী থেকে| অথচ, অপারেশনাল কেন্দ্রবিন্দু থেকে শত মাইল দূরে বসে প্রধান কার্যালয় পরিচালনা করলে কাজের গতিশীলতা কমবে, প্রশাসনিক জটিলতা এবং আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য বাড়বে|
বাংলাদেশের সংবিধানে সুষম উন্নয়ন ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের যে নির্দেশনা রয়েছে, এই সিদ্ধান্ত তার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক| এর আগে রেলওয়ের সদর দপ্তরও একইভাবে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে| এই ধরনের একের পর এক হঠকারী সিদ্ধান্ত চট্টগ্রামের প্রতি এক ধরনের বিমাতাসুলভ আচরণ|
সবকিছু ঢাকাকেন্দ্রীক করার এই আত্মঘাতী প্রবণতা ঢাকাকে যেমন বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে, তেমনি চট্টগ্রামকে অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বহীন করার সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের অংশ বলে মনে হচ্ছে| চট্টগ্রামের বিশিষ্টজন ও নগর পরিকল্পনাবিদদের গভীর ক্ষোভ ও উদ্বেগ অত্যন্ত যৌক্তিক|
চট্টগ্রামকে সত্যিকারের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে বিপিসির সদর দপ্তর স্থানান্তরের এই প্রক্রিয়া অবিল¤ে^ বন্ধ করতে হবে| কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত সুবিধার চেয়ে রাষ্ট্রীয় ¯^ার্থ এবং আঞ্চলিক সুষম উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া সরকারের ˆনতিক দায়িত্ব| আমরা আশা করি, সরকার এই আত্মঘাতী তোড়জোড় বন্ধ করে চট্টগ্রামে নির্মিত নতুন ভবনেই বিপিসির পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম নিশ্চিত করবে|
এ মুহূর্তের সংবাদ

















































