রেবা হাবিব »
সন্ধ্যার দিকে ফরাশগঞ্জের গলিগুলো কেমন যেন ঘোলাটে হয়ে আসে। মানুষের মুখ ফিকে হয়ে যায়, আর আলো ঠিকঠাক জ্বলে না। রেজাউল মাঝে মাঝে নিজের মুদির দোকানটা বন্ধ করে গলির মাথায় দাঁড়িয়ে থাকে, চুপচাপ। কে যেন আসবে বলে মনে হয়। কেউ আর আসে না, তবু সে দাঁড়িয়ে থাকে। এই দোকানটা ওর বাবার ছিল। পরে ওর। এখন কেবল নামেই ওর।
ঘরের ভিতর সারা বিকেল হুইলচেয়ারে বসে থাকে ওর মা, অতিকা বেগম। কোনোদিন অভিযোগ করে না। শুধু রাতে ঘুমুতে যাওয়ার আগে একবার জিজ্ঞেস করে, ‘আজও ওর কোনো খবর নাই, না রেজু?’
রেজাউল মাথা নাড়ে। বলে না, ‘ওর খবর আসবে না মা।’
ওর মানে- তামান্না। ওর বোন। তিন বছর আগে একদিন বলল, ‘মা, আমি একটু পল্টন যাচ্ছি, একটা প্রজেক্টে দেরি হচ্ছে।’ তারপর আর ফেরেনি। কোত্থেকে যেন একটা মেসেজ এসেছিল- ‘ভালো থেকো। এই ভালো থাকা বোঝার জন্যই বেরিয়েছি।’
পুলিশ কিছু করতে পারেনি। রেজাউল নিজেই কন্টাক্টে ছিল এক সাবেক র্যাব সদস্যের সঙ্গে, কাজ হয়নি। তামান্না নিজেই যেন নিখোঁজ হতে চেয়েছিল। রেজাউল জানে, কেউ তাকে ধরে নেয়নি। সে গেছে। স্বেচ্ছায়।
এই শহরের মানুষ নিখোঁজ হয় দুইভাবে- কেউ হঠাৎ হারিয়ে যায়, আর কেউ দিনে দিনে মুছে যায়। রেজাউলের বন্ধুবান্ধব ছিল না এমন না। কলেজে সে সবার পছন্দের। আড্ডা দিতো, গল্প করতো, গান গাইতো। কিন্তু তামান্না চলে যাওয়ার পর থেকে সে কেমন গুটিয়ে গেল। আব্বা মারা যাওয়ার পর দোকানটাকে আঁকড়ে ধরেছে। মা ছাড়া আর কিছু নেই। এই শহরে তার আর কিছু নেই।
একদিন সন্ধ্যায় দোকানের সামনে এক ছেলেমেয়ে দাঁড়ায়। মেয়েটা বলল, ‘ভাইয়া, চানাচুর দিমু?’
রেজাউল তাকায়। মেয়েটির গলায় চন্দ্রমল্লিকা ফুলের গন্ধ। তারপর চোখ যায় ছেলেটার দিকে- গায়ে পাতলা ফতুয়া, চোখে আতঙ্ক। ছেলেটা আচমকা বলল, ‘আপনে রেজাউল ভাই না?’
রেজাউল চমকে ওঠে, ‘তুই কে?’
ছেলেটা বলল, ‘আমি ওদের সঙ্গে থাকি। তামান্না আপুর কথা জানি।’
এক মুহূর্তে যেন চারদিক থমকে যায়। তিন বছর পর এই নামটা কারো মুখে শুনে রেজাউল ঠক করে ওঠে।
‘তুই কি ওর খোঁজ জানিস?’
ছেলেটা চোখ নামিয়ে ফেলে।
‘একসময় জানতাম। এখন আর জানি না। ওরা জায়গা বদলায়।’
‘কারা “ওরা”?’
ছেলেটা মুখ তোলে।
‘আপনার বোন এমন কিছু খুঁজছিল, যা এখানে পাওয়া যায় না। সে আমাদের সঙ্গে কাজ করতো। এখন তার অবস্থান জানলে বলতাম না ভাই।’
রেজাউল বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে।
‘তুই আমাকে নিয়ে যেতে পারিস? যেখানে সে ছিল একসময়?’
ছেলেটা দ্বিধা করে। তারপর বলল, ‘চেষ্টা করব ভাই। কিন্তু আপনি গেলে আপনার ভেতরের কিছু জিনিস নষ্ট হয়ে যাবে। ওইখানে গিয়ে কেউ ফিরতে পারে না আগের মতো।’
রেজাউল বলল, ‘আমি তো আগের মতো নই-ই। যাওয়ার মতো কিছু বাকি আছে?’
এক রাতে ছেলেটা এসে দাঁড়ায়।
‘চলেন, আজ চলেন।’
রেজাউল দোকান বন্ধ করে, মা-কে খাবার দিয়ে চাবি গলায় ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়ে। রিকশা করে তারা পৌঁছায় পুরান ঢাকার এক উপকণ্ঠে, যেখানে চুল্লির গন্ধ আর শীতল মরচে মিশে থাকে বাতাসে। একটা তিনতলা পুরোনো বাড়ি। নিচতলায় একটা পত্রিকা অফিস ‘তরফদার প্রিন্টিং হাউজ’। কিন্তু রাত দশটায়ও এখানে আলো জ্বলে। রেজাউল ভিতরে ঢোকে। পেছনের সিঁড়ি বেয়ে ওঠে ছেলেটার সঙ্গে। একটা ঘরে ঢুকতেই সে দেখে দশ-বারোজন ছেলেমেয়ে বসে আছে গোল হয়ে। তারা কেউই তাকায় না রেজাউলের দিকে।
একজন মধ্যবয়স্ক নারী ধীর গলায় কিছু পড়ছে- ‘আমরা যা জানি, তার বাইরেও কিছু থাকে। ঠিক যেমন শব্দের বাইরে থাকে স্তব্ধতা, আর নিয়মের বাইরে থাকে প্রতিবাদ। আমরা সেই স্তব্ধতা খুঁজি।’
রেজাউলের হঠাৎ যেন নিজেকে ছোট মনে হয়। এই ঘরের মানুষেরা চুপচাপ। তারা চোখে চোখ রাখে। তারা একে-অপরকে ছুঁয়ে দেখে না, অথচ জানে কে কখন ব্যথায়।
একসময় ছেলেটা বলে, ‘এই ঘরে আপনার বোন বসে থাকতো। চুপচাপ। সে আমাদের শেখাতো না, কিন্তু আমরা শিখতাম।’
‘সে কোথায়?’
এক তরুণী মুখ তুলে তাকায়, ‘কেউ কোথাও থাকে না চিরকাল। তবে যেখানেই সে আছে, তার মতো কেউ কেউ এখনো এখানে আসে। তার মতো করেই বোঝে, কীভাবে একদিন ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হয়।’
রেজাউল ফেরে। একদিন, দু’দিন, সপ্তাহ। মা জিজ্ঞেস করে না কিছু। শুধু একদিন মেঝেতে ধুলো দিতে দিতে বলে, ‘তুই এখন তামান্নার মতো কথা বলিস রে।’
রেজাউল তাকায় না, তবু জানে মায়ের চোখে কিছু একটা চমক আছে। পুরনো শহরের গভীরে গড়ে ওঠা এই নিঃশব্দ কমিউনিটিগুলো কারো নজরে পড়ে না, তারা কাউকে বিপ্লব শেখায় না। শুধু শেখায়, নিজেকে প্রশ্ন করতে। তাদের বিশ্বাস শিক্ষা মানে নম্বর নয়, ভালো থাকা মানে নিয়ম মানা নয়, আর বেঁচে থাকা মানে প্রতিদিন কিছু না-কিছু হারানোও নয়।
রেজাউল এখন মাঝে মাঝে দোকানের পেছনে বসে, ছোট ছেলেমেয়েদের কাগজে কিছু আঁকতে শেখায়। জানিয়ে দেয় না কিছু, তবু তারা শিখে নেয় ‘বাইরে যাওয়ার সাহস’ মানেই ভুল নয়।
তামান্না আর ফিরবে না। কিন্তু তার রেখে যাওয়া চুপ করে থাকা তাকে ফিরিয়ে দেয় রেজাউলের চোখে। এখন সন্ধ্যায় গলি ধূসর হয় ঠিকই, তবে আলোর নিচে একেকটা মুখ আজকাল আর ফিকে লাগে না।
২
রেজাউল এখন শহরের সবচেয়ে নিঃশব্দ দোকানির নাম। সে বেশি কথা বলে না, তবু আশেপাশের কিছু তরুণ-তরুণী সন্ধ্যা হলে তার দোকানের সামনে এসে বসে। কেউ কথা বলে না, কেবল বসে থাকে। কখনও রেজাউল একটা আধা-ফাঁকা বাক্স এগিয়ে দেয়। ভেতরে পুরনো বই, কিছু অপঠিত পত্রিকা, কিছু অক্ষর-ছিঁড়ে-যাওয়া খাতা। তারা পড়ে না, শুধু নাড়াচাড়া করে, যেন খুঁজছে অদৃশ্য কিছু। একদিন, এমন এক শুকনো দুপুরে, যেদিন শহরের বাতাসও ক্লান্ত। একজন মধ্যবয়স্ক নারী আসে দোকানে। ঘোমটা টেনে মুখ ঢাকা, চোখে গাঢ় চশমা। তার হাতে একটা পুরনো কাপড়ের ব্যাগ। ভেতর থেকে বের করে রেজাউলের দিকে এগিয়ে দেয় এক সাদা খাম। চিঠি নয়। ভেতরে একটা ছবি। ছবিটা তোলা হয়েছিল পাঁচ বছর আগে। তামান্নার জন্মদিনে, তারা তিনজন। রেজাউল, তামান্না আর অতিকা বেগম। একসঙ্গে বসে আছে বারান্দায়। মেয়েটা চশমা খুলে ফেলে। কোনো কথা না বলে শুধু চেয়ে থাকে।
রেজাউল প্রথমে চিনতে পারে না। কিন্তু এরপর একটা হাসি ভেসে ওঠে মেয়েটির ঠোঁটে। একেবারে সেই রকম, যেমনটা তামান্না হেসে বলত, ‘তুই বেশি চিন্তা করিস, রেজু।’
রেজাউলের গলা শুকিয়ে যায়। সে কিছু বলতে পারে না। শুধু ফিসফিসিয়ে বলে, ‘তুই?’
তামান্না মাথা নাড়ে।
‘না রেজু, আমি ফিরিনি। আমি কোনোদিন ফিরবো না। আমি শুধু দেখতে এসেছি, তুই কোথায় দাঁড়িয়ে আছিস।’
‘তুই কোথায় ছিলি এতদিন?’
তামান্না তাকায় তার চোখে।
‘আমার জায়গা এই শহরের বাইরে। যেখানে মানুষ নিজেকে খুঁজে পেতে চায়, যেটাকে তুমি এখনও নাম দিতে শেখোনি।’
রেজাউল কাঁপা গলায় বলে, ‘তুই কেন চলে গেছিলি? মা কী দোষ করেছিল?’
তামান্নার চোখে এক রকম অদ্ভুত ক্লান্তি।
‘আমি শুধু বুঝতে চেয়েছিলাম- আমি কে। সেই প্রশ্ন একাডেমি শেখায় না রেজু। শেখায় না আমাদের সমাজ, আমাদের ধর্ম, আমাদের নিয়ম। আমি যে রকম ছিলাম, সেটা কারও পছন্দ হয়নি। তাই আমাকেই বদলাতে হয়েছিল।’
রেজাউল কিছু বলে না। তামান্না ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।
‘তুই আমাকে খুঁজে পেয়েছিস, ঠিকই। কিন্তু আমি তোকে কখনো চাইনি খুঁজে পেতে। আমি শুধু চাই তুই নিজেকে খুঁজে ফেল।’
‘তুই কি আবার আসবি?’
তামান্না একবার হাসে।
‘আমি আসি না রেজু, শুধু থেকে যাই। ঠিক যেমন নদীর ওপারে কেউ থাকে। দেখা যায় না, কিন্তু ভাবা যায়।’
সে চলে যায়। একটা সাদা সালোয়ার-কামিজে, ধুলোয় ভেজা পায়ের শব্দ রেখে। আর রেজাউল দাঁড়িয়ে থাকে, ছবিটা হাতে নিয়ে, আর চুপ করে থাকা শিরীষ
গাছটার দিকে তাকিয়ে থাকে।
কয়েক সপ্তাহ পরে… একদিন রেজাউল আর দোকান খোলে না। কেউ জানে না সে কোথায় গেছে। তাকে দেখা যায়নি শহরের কোনো প্রান্তে, কোনো থানায়, কোনো লিস্টে। শুধু শিরীষ গাছটার নিচে একটি ছোট খোদাই পাওয়া যায়। পাথরে লেখা ছিল- ‘যে নিজেকে খুঁজে পায়, সে আর কাউকে হারায় না।’



















































