এ মুহূর্তের সংবাদ

কারণ অনুসন্ধান ও প্রতিরোধ জরুরি

ক্যান্সার বাড়ছে

বাংলাদেশে নীরব ঘাতক হিসেবে ক্যান্সারের বিস্তার এখন এক আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক তথ্য এবং বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ গবেষণা প্রতিবেদন আমাদের সামনে যে চিত্র তুলে ধরেছে, তা কেবল উদ্বেগজনক নয়, বরং এক জনস্বাস্থ্য সংকটের স্পষ্ট পূর্বাভাস। দেশে বর্তমানে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত, এবং প্রতি বছর এক লাখ ৬৭ হাজারের বেশি নতুন রোগী এই তালিকায় যুক্ত হচ্ছে। মৃত্যুর মিছিল ছাড়িয়ে গেছে এক লাখ ১৬ হাজার। চিকিৎসকদের মতে, মাঠপর্যায়ের প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ।
এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ক্যান্সারের বিস্তার রোধে এখনই সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা রাষ্ট্রের জন্য এক জরুরি দায়িত্ব হয়ে পড়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের মানুষ ৩৮ ধরনের ক্যান্সারে আক্রান্ত হলেও মূলত পাঁচটি ক্যান্সার সবচেয়ে দ্রুত বাড়ছে। পুরুষদের মধ্যে ফুসফুস, খাদ্যনালি, মুখ ও ঠোঁটের ক্যান্সার এবং নারীদের মধ্যে স্তন ও জরায়ুমুখের ক্যান্সার সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। একই সাথে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে শিশু ক্যান্সার রোগীর সংখ্যাও। এই সুনির্দিষ্ট ক্যান্সারগুলো বৃদ্ধির পেছনে আমাদের জীবনযাত্রা, পরিবেশ এবং অসচেতনতা সরাসরি দায়ী।
পুরুষদের মধ্যে ফুসফুস, মুখ ও খাদ্যনালির ক্যান্সার বৃদ্ধির প্রধান কারণ তামাক ও ধূমপানের উচ্চ হার। জর্দা, গুল বা খৈনির মতো ধোঁয়াবিহীন তামাকের অবাধ ব্যবহার মুখের ক্যান্সারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও বায়ুদূষণ, যা আমাদের ফুসফুসকে প্রতিনিয়ত বিষাক্ত করে তুলছে। অন্যদিকে, নারীদের স্তন ও জরায়ুমুখের ক্যান্সার বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে সচেতনতার অভাব, স্ক্রিনিং বা প্রাথমিক পরীক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং বাল্যবিবাহ বা অনিরাপদ যৌন আচরণের মতো সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত কারণ। এছাড়া সামগ্রিকভাবে খাদ্যে ভেজাল, রাসায়নিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, স্থূলতা এবং কায়িক শ্রমহীন জীবনযাপন পুরো সমাজকে ক্যান্সারের ঝুঁকিতে ফেলছে। ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণে আমাদের কৌশল হতে হবে দ্বিমুখী: প্রথমত, সচেতনতা ও প্রতিরোধ; দ্বিতীয়ত, প্রাথমিক অবস্থায় রোগ শনাক্তকরণ।
ক্যান্সার প্রতিরোধে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে তামাকের বিরুদ্ধে। তামাকজাত পণ্যের ওপর কর বৃদ্ধি এবং আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা ছাড়া ফুসফুস ও মুখের ক্যান্সার কমানো অসম্ভব। খাদ্যে রাসায়নিকের ব্যবহার বন্ধে কঠোর মনিটরিং এবং বায়ুদূষণ রোধে দীর্ঘমেয়াদি নীতি গ্রহণ করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রাথমিক অবস্থায় রোগ শনাক্ত করা। জরায়ুমুখের ক্যান্সার প্রতিরোধের জন্য কিশোরীদের মাঝে এইচপিভি (HPV) টিকাদান কর্মসূচিকে আরও বেগবান করতে হবে। প্রতিটি জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে স্তন ও জরায়ুমুখের ক্যান্সার স্ক্রিনিং (যেমন- ভায়া টেস্ট, ম্যামোগ্রাফি) বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে সহজলভ্য করা প্রয়োজন। কারণ, প্রাথমিক ধাপে ক্যান্সার ধরা পড়লে তা প্রায় শতভাগ নিরাময়যোগ্য।
জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউটে উপচে পড়া রোগীর ভিড় প্রমাণ করে, আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থা এই বিশাল চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। দেশের প্রতিটি বিভাগীয় পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার চিকিৎসাকেন্দ্র গড়ে তোলার পাশাপাশি ক্যানসার সচেতনতাকে পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে গণমাধ্যমে বাধ্যতামূলক করা এখন সময়ের দাবি। ক্যান্সার শুধু একটি জীবন কেড়ে নেয় না, একটি পরিবারকে আর্থিকভাবে ধ্বংস করে দেয়। এই মরণব্যাধির বিস্তার রোধে রাষ্ট্র, সমাজ এবং নাগরিককে যৌথভাবে এখনই দায়িত্ব নিতে হবে—নতুবা আগামী দিনের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা এক অপূরণীয় বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।