দ্বীপ সরকার »
ঘরটা খুব বড় নয়। এর ভেতরে এক ধরনের নীরবতা ছড়িয়ে আছে। দেয়ালগুলোর অবস্থা এমন যে, সিমেন্ট বালু ঝুর ঝুর করে পরছে। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আয়নাটা এই ঘরের সবচেয়ে প্রাচীন জিনিস। কাঠের ফ্রেমে ক্ষয়ে যাওয়া নকশা, আয়নাকে আলাদা করে তুলেছে। আয়নার এক কোণায় হালকা ফাটল, তবু তার মধ্যে অদ্ভূদ শক্তি।
এই আয়নার সামনে প্রতিদিন দাঁড়ায় জহুরা। সে আয়নাকে শুধু সাজগোজের জন্য ব্যবহার করে এমনটি নয় বরং আয়না মানে এক ধরনের সাক্ষাৎ। নিজের সঙ্গে, নিজের দেখা হওয়া। প্রতিদিন সকালে দাঁড়িয়ে সে নিজের চোখের দিকে তাকায়। দীর্ঘ সময় ধরে নিজেকে দেখে। একসময় তার মনে হয়, সে নিজেকে চেনে। আবার কখনো মনে হয়, নিজেকে চিনছে না। তার মুখ, তার দৃষ্টি, তার ভেতরের সবকিছু যেনো আয়না সুন্দর করে দেখায়। আয়না তাকে আপন মনে করে সব ঠিকটাকমতো দেখায়। আপন মনে করে বললাম এই জন্য যে, মা যেমন সন্তানের কাছে আয়নার মতোন। মা, সন্তানের সব কিছু দেখে, শাসন করে, সংশোধন করে দেয়। জহুরার আধ-ভাঙা আয়না সে রকম জহুরাকে আপন মনে করে দেখায়।
কিছুদিন পর জহুরা দেখলো, তার নিজের চেহারার সেই স্বচ্ছতা দিন দিন বদলে যাচ্ছে। তার চোখের ভেতরের আলোটা যেনো আগের মতো নেই। আয়নাতে চোখ দেখা যায় ঠিকই, কিন্তু তার গভীরতা নেই। ভাবে, হয়তো ঘুম কম হয়েছে। ইদানিং বয়স বাড়ার সাথে সাথে কেমন চোখে সহসাই ঘুম আসে না! দশটা এগারোটা বাজে, তারপর ফোনের স্ক্রিন টানতে টানতে কোন সময় ঘুমিয়ে পড়ে। হতে পারে, এটা একটা কারণ। পরদিন আয়নায় দাঁড়ালে ঠোঁটের রেখা একটু ঝাপসা লাগলো। আগে ঠোঁটে লিপিস্টিক পরলে, কী রকম ঠোঁট রঙিন হয়ে উঠতো। ভাবে, ঘরে আলো বোধহয় কম। তারপর অনেকদিন আর আয়নায় দাঁড়ায় না। স্কুল আর সংসার নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আবার একদিন বিকেলে মনে হলো আয়নার কথা। আয়নায় তাকিয়ে দেখলো, তার মুখের বলিরেখাগুলো যেনো ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে। অনেকটা অস্পষ্টতার মতোন। আয়নার চোখ আছে, কিন্তু দৃষ্টি নেই। নাক আছে, কিন্তু ছিদ্রহীন। ঠোঁট আছে, কিন্তু ডোরাকাটা দাগ নেই। এমনিতে অসুস্থ আয়না, ডানপাশে ওপরের কোণায হালকা ফাটল। হতে পারে, ফাটলের কারণে আয়না ঠিকঠাক দেখাচ্ছে না। তবু জহুরার বিশ্বাস অটল, বহুদিনের আত্নীয় আয়না তাকে ভুল সিদ্ধান্ত দিতে পারে না। এই ভেবে জহুরা আয়নার আরো কাছে এগিয়ে গেলো। আয়নার কাচে হাত রাখলো। খুব ঠাণ্ডা। সে আঁচলের কাপড় দিয়ে আয়না মুছলো ভালো মতোন। আবার মুখটা আয়নার সামনে করলো। কিছুই বদলায়নি, আগে যা দেখিয়েছে, হুবুহ তাই দেখাচ্ছে অস্পষ্ট আর ঝাপসা। মুখটা তারই, আবার তার নয়। একটি নিশ্চিত জহুরার উপস্থিত, অথচ অনুপস্থিতি। সেই দিনটা সে কারো সাথে কথা বললো না। মন খারাপ। রাতে শুয়ে থাকতে থাকতে তার মনে হলো, আমি কি আস্তে আস্তে মুছে যাচ্ছি? নাকি আয়নার বয়স বেড়েছে?
পরদিন স্কুলে গিয়ে জহুরা স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলো। সহকর্মীরা আগের মতোই কথা বলছে, হাসছে। কেউ তার ভেতরের বা বাহিরের পরিবর্তন টের পাচ্ছে না। কিন্তু জহুরা ঠিকই টের পাচ্ছে, আশপাশের সবকিছু দিনদিন পরিবর্তিত হচ্ছে। তার নিজের ভেতরেও কিছু একটা পরিবর্তিত হচ্ছে, কিছু একটা ভেঙে যাচ্ছে। এক সময় তার পরিচয়, তার মুখ, তার অবয়ব ছিলো স্পষ্ট, ছিলো দৃশ্যত সবুজের মতোন রঙিন ও সুন্দর।
জহুরা একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। সঙ্গত কারণে. এই পরিচয় একটি স্থির রূপ দিয়েছে তাকে। সমাজের কাছে জহুরা স্বাভাবিকভাবেই চিরন্তন ও সমাদৃত হয়ে উঠেছে। গ্রামের সকল আচার অনুষ্ঠানে তার একটা অবদান থাকেই। কিন্তু, আয়নার সামনে দাঁড়ালে সে বুঝতে পারে.এই পরিচয়গুলো তার নিছক বাইরের। ভেতরে কে আছে? ভেতরে কি ভাঙছে? এই প্রশ্নগুলো তাকে অস্থির করে তুলছে।
এক রাতে সে ঘরের সব লাইট বন্ধ করে দিয়ে শুধু টেবিলল্যাম্পটা জ্বালিয়ে টেবিলের সামনে বসলো। তারপর মনে হলো অন্ধকারে আয়না তাকে কী দেখাবে, কেমন দেখাবে। এরপর ধীরে ধীরে দেয়ালে সাটানো আয়নার সামনে এসে দাঁড়ালো। টেবিলল্যাম্প খুব কম আলো ছড়িয়েছে ঘরে। সঙ্গত কারণে মুখ তার অস্পষ্ট। আয়নার মুখোমুখি হয়ে জহুরা বললো,- তুমি কে? একরাশ নীরবতা বয়ে গেলো। চারপাশ পিনপতন। জহুরা আবার বলল,- তুমি কি আমি? আয়নাটা কিছুই বললো না। তার মনে হলো, আয়নাটা কোনো নকল বা প্রতিচ্ছবি দেখাচ্ছে না, দেখালে আমাকে দেখাতো। বরং তার ভেতরের প্রকৃত ছবি তুলে আনতে চাইছে- যা বারবার চেষ্টা করেও আয়না পারছে না। আমি কি তবে আগের মতোন নেই?
জহুরা চেয়ারে বসে পড়লো। তার মনে পড়তে লাগলো, শৈশবে তার মা বলতেন, তুমি খুব সুন্দর। কলিগরা বলতেন, তুমি খুব মেধাবী। বন্ধুরা বলতো, তুমি আসলে অন্যরকম। এইসব শব্দ দিয়ে তৈরি হয়েছিলো তার ‘আমি’। ‘আমি’ নামক পরিচিতি এবং খ্যাতি। কিন্তু যদি এই পরিচয় বা শব্দগুলো সরিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে কি থাকবে? জহুরা ভাবলো, যদি তার শিক্ষকতা এবং সমাজসেবক পরিচয় বাদ দেয়া হয়, তাহলে আয়না তার কী দেখাবে? জহুরা আসলে এভাবে কখনো নিজেকে দেখেনি। সে শুধু অন্যদের দেওয়া পরিচয়গুলোকে আয়নায় খুঁজতে চেষ্টা করেছে। জহুরার ভেতর নানান প্রশ্ন জাগ্রত হয়। টেবিল ল্যাম্পটা তখনো ধিক ধিক করে জ্বলছে। মুখে চোখে ঘুরছে দুনিয়ার অন্ধকার। চক্রাকারের জীবন কতোটা সুস্থ, কতোটা অসুস্থ। নিজেকে প্রশ্ন করে। এতোকাল আয়না কি দেখিয়েছে আমাকে? সত্য? নাকি মিথ্যা নামক বিশ্বাস?
পরদিন স্কুল থেকে ফিরে সন্ধ্যার পর আবার আধ-অন্ধকারে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করলো। নিজেকে অনুভব করার চেষ্টা করলো। চোখ খুলতেই, মুখ প্রায় অদৃশ্য, একবোরে ঝাপসা। সে ভয় পেলো। সেই ভয় গভীর কোনো উপলব্ধির দিকে ঠেলে দিলো। ‘আমি কি আসলে কোনো নির্দিষ্ট রূপ?’ নাকি ফেইক? এই প্রশ্ন তাকে থেমে দিলো না বরং অনুভূতির অতলে নিয়ে যায়। প্রশ্নের ভেতর দিয়ে যেতে থাকে বহুদূর। ফের আয়নার নিকটে যায় এবং আয়নাকে দেয়াল থেকে নামিয়ে মেঝেতে পিছনে কিছু ঠ্যাস দিয়ে খাড়া করে রাখলো। এরপর ঘনঘন শ্বাস নিতে লাগলো। হৃদ স্পন্দন উঁচু নিচু হচ্ছে। কিন্তু আয়না আগের মতোই দেখাচ্ছে। তার শ্বাস গ্রহণ, হৃদস্পন্দন উঁচু নিচু এতোকিছু ঘটে গেলো- তার কিছুই দেখালো না। আয়না ক্রিয়াকলাপ দেখায় না, শুধু খণ্ড খণ্ড ঘটনার ছবি ভিন্ন ভিন্ন চিত্রে দেখায়। অক্সিজেন নাাকের ভেতর দিয়ে কোথায় যাচ্ছে, কীভাবে যাচ্ছে, কোন রাস্তা ধরে যাচ্ছে। সেগুলোর সংকেত দিচ্ছে না। জহুরা নিজেকে প্রশ্ন করলো, আয়না কি তবে এগুলোর ‘মুখ’ খুঁজে পাচ্ছে না?
জহুরা ভাবে, ‘আমি’ মানে একটা প্রাণ, একটা ছবি এবং সেই ছবির ক্রিয়াশীল সত্ত্বা আছে। যেমন, কেউ একজন গাছে পানি ঢালছে। আয়না সেখানে কি গাছের পানি শোষন দেখাবে? না। অবশ্যই না। আয়না দেখাবে একটি মানুষের ছবি, একটি গাছের ছবি এবং বালতি ও পানি ভিন্ন ভিন্ন চিত্রে। অথচ গাছের ভেতরে আয়না ঢুকতে পারছে না। জহুরা বুঝতে পারলো, তার ভেতরেও আয়না ঢুকতে পারছে না।
দিন যেতে লাগলো দিনের গতিতে। জহুরা ধীরে ধীরে বদলাতে লাগলো আরো। সে আর আয়নায় নিজের রূপ খুঁজতে চেষ্টা করে না। বরং সে তার অনুভূতিগুলো অনুসরণ করতে শুরু করলো। একদিন ক্লাস নিতে গিয়ে সে ছাত্রদের জিজ্ঞেস করল,
তোমরা কি জানো, তোমরা কে?
ছাত্ররা হেসে বললো,
আমরা তো ছাত্র।
জহুরা মৃদু হাসলো। হাসি এক কোণায় রেখে দিয়ে বললো,
‘ছাত্র’ তোমাদের পরিচয়। কিন্তু তোমরা কি শুধু এইটুকুই?
ছাত্ররা চুপ করে গেলো। সেই নীরবতার ফাঁকে জহুরা নিজের প্রশ্নের ইঙ্গিত খুঁজে পেলো। বাড়ি ফিরে সে আবার আয়নার সামনে দাঁড়ালো। এইবার দেখতে পেলো, কোন মুখই নেই আয়নায়। শুধু এক ধোঁয়াটে উপস্থিতি টের পেলো। কিন্তু সে ভয় পেলো না। বরং তার মনে হলো, এই শূন্যতাই সত্য। কারণ, কোনো নির্দিষ্ট রুপ নেই মানেই, সে সীমাবদ্ধ নয়। সে নিজেকেই ফিসফিস করে বলে, আমি কি তবে তৈরি হচ্ছি প্রতিদিন? প্রতিদিন ভাঙছি? পরিবর্তিত হচ্ছি? এই প্রশ্নের মধ্যে জহুরা এক ধরনের মুক্তি খুঁজে পায়। কারণ, পরিবর্তন মানে চলমান। চলমান মানে অস্তিত্ব। সে বুঝতে পারলো, অস্তিত্ব মানে কোনো স্থির সত্ত্বা নয়। বরং প্রতিনিয়ত নিজেকে তৈরি করা। কিন্তু এই তৈরি করার দায়ও তার নিজের।
এই উপলব্ধি জহুরাকে ভারী করে তুললো। কারণ এখন আর সে কারো ওপর নিজের পরিচয় চাপাতে চান না। না পরিবারের কাছে, না সমাজের কাছে। সে নিজেই দায়ী, নিজের জন্য। এক রাতে, সে স্বপ্ন দেখলো, আয়নার ভেতরে সে দাঁড়িয়ে আছে আবার, বাইরে দাঁড়িয়ে আছে আরেকজন। যে তাকে সর্বদা দেখছে এবং অনুসরন করছে।
স্বপ্নকে সে জিজ্ঞেস করলো,
কে আসল? ভেতরের আমি নাকি বাইরের আমি?
স্বপ্ন উত্তর দিলো না। ঘুম ভাঙার পর বুঝলো, এই প্রশ্নের উত্তর নেই। কারণ “আসল” বলেও কিছু নেই, নকল বলেও কিছু নইে। শুধু আছে, দেখা আর বিশ্বাস এর পরিবর্তিত রূপ। অনেকদিন জহুরা আয়নার সাথে আড়ি মনে করে আয়নার সামনে আর দাঁড়ায় না। আয়নার সাথে দূরত্ব বাড়ে দিন দিন। তারপর কোনো এক সকালে, বহুদিন পর, প্রায় মাস ছয়েক পর জহুরা প্রথমবার আয়নায় হাত রাখলো। কাচ ঠাণ্ডা লাগে। আয়নাকে বললো, তুমি কখনোই অন্ধ ছিলে না। অন্ধ ছিলো আমার আকাঙ্খার চোখ। আমার আকাঙ্খা ভেঙে গেছে, আমার বিশ্বাস ভেঙে গেছে। আমিও ভেঙে গেছি ঢের। বিশ্বাস ভেঙে গেলে, প্রতিফলনও ভেঙে যায়।
সন্ধ্যায় জহুরা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। আকাশে হালকা অন্ধকার নামছে। ভাবে, এই পৃথিবীটা এক বিশাল আয়না। যেখানে আমরা নিজেদের প্রতিফলন দেখি। মানুষের চোখে, কথায়, সম্পর্কের ভেতর আমরা টিকে থাকি। প্রতিটি টিকে থাকার ভেতর পরির্বতন আছে। পরিবর্তন বেড়ে গেলে আমরা আয়নাকে অন্ধ বলি। পরিবর্তন বেড়ে গেলে, আয়না কী দেখাবে? কোনটা দেখাবে? আগেরটা নাকি পরেরটা? জহুরা আকাশের দিকে তাকিয়ে হাসলো। বুঝতে পারলো, নিজেকে চেনা মানে নিজের একটি নির্দিষ্ট ছবি খুঁজে পাওয়া নয়। বরং মেনে নেওয়া যে, সে পরিবর্তনশীল। ভাবতে ভাবতে চারদিকে অন্ধকার নেমে আসলো।





















































