বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ৩০, ২০২৬
এ মুহূর্তের সংবাদ

২৯ এপ্রিলের ক্ষত ও চট্টগ্রামের উপকূল রক্ষার দাবি

আজ থেকে ৩৫ বছর আগে, ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের সেই কালরাত আজও উপকূলীয় মানুষের স্মৃতিতে এক দুঃস্বপ্ন হয়ে আছে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার তাণ্ডবে প্রকৃতির রুদ্ররূপ কেড়ে নিয়েছিল ১ লাখ ৩৮ হাজারেরও বেশি তাজা প্রাণ। বাতাসের গতিবেগ যখন ঘণ্টায় ২২৫ কিলোমিটারে পৌঁছাল আর ২০ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস যখন জনপদ ভাসিয়ে নিয়ে গেল, তখন পুরো চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার উপকূল এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। সর্বস্ব হারায় প্রায় ১ কোটি মানুষ। ওই ঘূর্ণিঝড়ে আনোয়ারা উপজেলার উপকূলীয় এলাকার হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। সুপ্রভাতে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পর ৩৫ বছর পেরিয়ে গেলেও আনোয়ারার উপকূলীয় এলাকাগুলো এখনো পুরোপুরি টেকসই বেড়িবাঁধের আবরণে সুরক্ষিত হয়নি। যার কারণে আজও উপকূলীয় অঞ্চলের বাসিন্দারা ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের খবর শুনলে আঁতকে ওঠে।

গতকাল সে ভয়াবহ স্মৃতির ৩৫তম বার্ষিকীতে আলোচনা হয়েছে গত সাড়ে তিন দশকে আমরা চট্টগ্রামের উপকূল রক্ষায় কতটা দীর্ঘমেয়াদী সক্ষমতা অর্জন করেছি?
চট্টগ্রাম কেবল দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী নয়, এটি আমাদের জাতীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। অথচ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই অঞ্চলটি জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতি বছরই ছোট-বড় জলোচ্ছ্বাস আর জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হচ্ছে পতেঙ্গা, হালিশহর, আনোয়ারা ও বাঁশখালীর বিস্তীর্ণ এলাকা। ১৯৯১ সালের সেই ধ্বংসযজ্ঞ থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা সাইক্লোন শেল্টার তৈরি করেছি এবং দুর্যোগকালীন সতর্কবার্তা প্রচারের সক্ষমতা বাড়িয়েছি সত্য, কিন্তু স্থায়ী ও টেকসই উপকূলীয় সুরক্ষা কাঠামো গড়তে আমরা আজও পুরোপুরি সফল হতে পারিনি।
চট্টগ্রামের উপকূলীয় অঞ্চল রক্ষায় বর্তমানে যে পদক্ষেপগুলো সবচেয়ে জরুরি তা হলো, নামমাত্র মাটির বাঁধ দিয়ে বঙ্গোপসাগরের শক্তিশালী জলোচ্ছ্বাস ঠেকানো সম্ভব নয়। পতেঙ্গা থেকে বাঁশখালী পর্যন্ত প্রতিটি বাঁধে ব্লক ও সিসি ঢালাইয়ের মাধ্যমে স্থায়ী সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে আনোয়ারার রায়পুর এবং বাঁশখালীর গণ্ডামারা ও খানখানাবাদ এলাকায় বাঁধের নাজুক অবস্থা দ্রুত মেরামত করে উচ্চতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে সমুদ্র তটরেখা বরাবর কেওড়া, বাইন ও ঝাউ গাছের ঘন বনায়ন তৈরি করতে হবে। এই বনায়ন জলোচ্ছ্বাসের প্রাথমিক ধাক্কা ও গতি কমিয়ে দিতে জাদুর মতো কাজ করে। উপকূলীয় বন উজাড় রোধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
জোয়ারের পানি লোকালয়ে ঢোকা আটকাতে এবং বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য আধুনিক স্লুইচ গেট ও পাম্প হাউজ স্থাপন করতে হবে। বিশেষ করে কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলোতে পরিকল্পিত শহর রক্ষা বাঁধের কাজ দ্রুত শেষ করা জরুরি।
কর্ণফুলী নদী ও উপকূলীয় মোহনাগুলোতে পলি জমে তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি ধারণক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। নিয়মিত ড্রেজিং না করলে জলোচ্ছ্বাসের বাড়তি পানি সহজেই তীরে উপচে পড়বে।
১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল আমাদের শিখিয়েছিল প্রকৃতির তাণ্ডবে জনপদ মুহূর্তেই বিলীন হয়ে যেতে পারে। কিন্তু আধুনিক প্রকৌশল ও সঠিক পরিকল্পনার সমন্বয়ে এই ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব। উপকূল রক্ষা কেবল একটি প্রকল্প নয়, এটি এই অঞ্চলের লাখো মানুষের বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা।
আমরা আর কোনো ‘ভয়াল ২৯ এপ্রিল’ দেখতে চাই না। সরকারের উচিত উপকূলীয় সুরক্ষা প্রকল্পগুলোকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।