এ মুহূর্তের সংবাদ

হারিয়ে যাচ্ছে পাহাড় ঝুঁকিতে চট্টগ্রাম

একসময় সবুজ পাহাড়ে ঘেরা চট্টগ্রাম ছিল দেশের অন্যতম প্রাকৃতিক ও সৌন্দর্যের নগরী। অথচ মানুষের অপরিনামদর্শী লোভ, অনিয়ন্ত্রিত পাহাড় কাটা এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে এই ঐতিহ্যবাহী নগরী আজ এক ভয়াবহ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে চট্টগ্রামের পাহাড় বিলুপ্তির যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা কেবল উদ্বেগজনক নয়, বরং এক আসন্ন পরিবেশগত ও মানবিক বিপর্যয়ের অশনিসংকেত। যে পাহাড় একসময় চট্টগ্রামকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে আগলে রাখত, জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে মানুষেরই সীমাহীন লোভের কারণে সেই পাহাড় এখন বর্ষা এলেই সাধারণ মানুষের জন্য একেকটি মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে।
গত দুই দশকে আবাসন নির্মাণ, অবৈধ দখল আর প্রভাবশালী মহলের বাণিজ্যিক স্বার্থে যেভাবে পাহাড় কাটা হয়েছে, তার কোনো যৌক্তিক বা আইনি ভিত্তি থাকতে পারে না। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা, স্যাটেলাইট চিত্র এবং চট্টগ্রাম মহানগরের মাস্টার প্ল্যানের তথ্য বিশদভাবে প্রমাণ করছে যে, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে চট্টগ্রাম তার ভৌগোলিক ভারসাম্য সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে ফেলবে। গবেষণায় দেখা গেছে, চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকার প্রায় ৭৮ থেকে ৭৯ শতাংশ এখন উচ্চ থেকে অতি উচ্চ ভূমিধস ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে লালখান বাজার, মতিঝর্না বা বাটালি হিলের মতো এলাকাগুলোর ভেতরের আলগা বালুর স্তর বর্ষার বৃষ্টিতে কোহেশন বা অভ্যন্তরীণ শক্তি হারিয়ে মুহূর্তেই ধসে পড়ার অপেক্ষায় রয়েছে। ৭০ থেকে ৯০ ডিগ্রি খাড়া কোণে পাহাড় কাটার এই অপকর্ম কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
এর চেয়েও বড় শঙ্কার বিষয় হলো, চিটাগং মেট্রোপলিটন মাস্টার প্ল্যানের তথ্যানুযায়ী, মহানগরের মূল অংশে এখন মাত্র ৫ হাজার ৯৮৫ একরের মতো পাহাড় অবশিষ্ট আছে। অথচ ১১ থেকে ২৫ মিটার উচ্চতার নিচু পাহাড়গুলোকে নিশানা করে প্রতিনিয়ত সাবাড় করা হচ্ছে। বেইজিং ফরেস্ট্রি ইউনিভার্সিটির গবেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই ধ্বংসযজ্ঞ থামানো না গেলে ২০৪৮ সালের মধ্যে চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক ভারসাম্য সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে। পাহাড় কাটার এই ধ্বংসাত্মক প্রভাব শুধু ভূমিধসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি নগরের জলাবদ্ধতা বৃদ্ধি, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নামিয়ে দেওয়ার জন্য সরাসরি দায়ী।
প্রশ্ন হলো, দেশের প্রচলিত আইন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের চোখ ফাঁকি দিয়ে কীভাবে দিনের পর দিন এই কর্মকাণ্ড চলছে? বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড় কাটার পেছনে মূলত কাজ করছে প্রভাবশালী ভূমিদস্যুদের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সিন্ডিকেট। বর্ষা এলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু লোক দেখানো উচ্ছেদ অভিযান কিংবা মাইকিং করা হয়, কিন্তু মূল অপরাধীরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। এই সংকটের স্থায়ী সমাধান কেবল সাময়িক উচ্ছেদে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত মহাপরিকল্পনা।
আমরা মনে করি, অবিলম্বে পাহাড়ে সব ধরনের অবৈধ বসতি স্থাপন ও অবকাঠামো নির্মাণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে। পাহাড় কাটার সাথে জড়িত প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। একই সাথে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরত ছিন্নমূল ও সাশ্রয়ী আবাসনের সন্ধানে আসা মানুষদের জন্য টেকসই পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, পাহাড় বাঁচলে বাঁচবে চট্টগ্রাম। প্রকৃতির সাথে এই আত্মঘাতী যুদ্ধ এখনই বন্ধ না হলে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এক অবাসযোগ্য ও মৃত্যুপুরী চট্টগ্রাম উপহার দেওয়ার দায় আমাদেরই নিতে হবে। আমরা আশা করি, নীতিনির্ধারকেরা দ্রুত এই বিষয়ে কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন।

-advertise-