টপ নিউজ

প্রাণিসম্পদ খাতে ২৭ কোটি টাকারও বেশি ক্ষতি

গোখাদ্য , গবাদিপশুর মৃত্যু নিয়ে বিপাকে খামারি

সুপ্রভাত ডেস্ক »

গত এক সপ্তাহের টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। জেলার দক্ষিণাঞ্চলের সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলায় বন্যার তীব্রতা সবচেয়ে বেশি।

-advertise-

এছাড়া চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, বোয়ালখালী, পটিয়া ও আনোয়ারা উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। উত্তর চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ, মিরসরাই, রাউজান, ফটিকছড়ি ও সীতাকুণ্ড উপজেলার নিম্নাঞ্চলও প্লাবিত হয়েছে।

বন্যার কারণে হাজারো মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করলেও গবাদিপশু নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন প্রান্তিক খামারিরা। বন্যার পানিতে খামার তলিয়ে যাওয়ায় অনেকেই গরু-ছাগল নিয়ে উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। ইতোমধ্যে মুরগির খামার, খামারিদের ছাগাল, গরু বন্যার পানির কারণে মারা গেছে। বিশেষ করে গবাদি পশুর খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, কোথাও আশ্রয়কেন্দ্রের পাশে, কোথাও সড়কের ওপর, আবার কোথাও বাঁধের ওপর গবাদিপশু বেঁধে রাখা হয়েছে। পর্যাপ্ত গোখাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে পশুগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে। অনেক খামারি বাধ্য হয়ে স্বল্পমূল্যে গবাদিপশু বিক্রির চেষ্টাও করছেন।

চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, চলমান বন্যায় প্রাণিসম্পদ খাতে এ পর্যন্ত আনুমানিক ২৭ কোটি ১৮ লাখ ১০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে।

জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের সূত্র জানায়, বন্যায় ইতোমধ্যে ২৩টি গরু মারা গেছে, যার আনুমানিক মূল্য ২০ লাখ ৭০ হাজার টাকা। এছাড়া ৮৪টি ছাগল মারা গেছে, যার আনুমানিক ক্ষতির পরিমাণ ৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পোলট্রি খাত। জেলার ৬৫টি মুরগির খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ৪৩ হাজার মুরগি মারা গেছে বা নষ্ট হয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য ৮৯ লাখ টাকা।

এছাড়া প্রায় ৫ হাজার একর ঘাসের প্লট পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। এর আনুমানিক ক্ষতির পরিমাণ ১০ কোটি টাকা। একই সঙ্গে প্রায় ৫০ হাজার টন গবাদিপশুর শুকনো খাদ্য নষ্ট হয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য ১৬ কোটি টাকা।

খামারিরা বলছেন, শুধু প্রাণীর মৃত্যু নয়, খাদ্যসংকট, রোগের ঝুঁকি এবং খামারের অবকাঠামোগত ক্ষতির কারণে আগামী কয়েক মাস এ খাতের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পরও খামারগুলো পুনরুদ্ধারে দীর্ঘ সময় লাগবে।

ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের একজন বাঁশখালী উপজেলার খামারি ফরহাদুল ইসলাম। তিনি বলেন, টানা বৃষ্টি ও ঝড়ের সময় একটি গাছ তার খামারের ওপর ভেঙে পড়ে। এতে পুরো খামারটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তার খামারে ফ্রিজিয়ান জাতের ১২টি গরু ছিল। গাছচাপায় তিনটি গরু মারা গেছে, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৮ লাখ টাকা। এছাড়া আরও চারটি গরু আহত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এই বন্যায় আমি অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। আমার সব শেষ হয়ে গেছে।

চট্টগ্রাম জেলা ডেইরি অ্যান্ড ফ্যাটেনিং ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সাধারণ সম্পাদক তানভীর হোসেন বলেন, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের বন্যায় জেলার অধিকাংশ ডেইরি ও ফ্যাটেনিং খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক খামারের গোখাদ্য নষ্ট হয়েছে, গবাদিপশু নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে খামারিদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। একই সঙ্গে দুধ সরবরাহও ব্যাহত হচ্ছে।

তিনি বলেন, বন্যার পানি নেমে গেলে ক্ষুরা রোগ, নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের পুনর্বাসনে জরুরি ভিত্তিতে আর্থিক প্রণোদনা, পশুখাদ্য, ওষুধ, ভ্যাকসিন এবং ভেটেরিনারি সহায়তা দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

এদিকে জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ জানায়, বন্যাকবলিত এলাকায় প্রাণিসম্পদ বিভাগের ভেটেরিনারি টিম কাজ শুরু করেছে। অসুস্থ গবাদিপশুর চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় ওষুধ বিতরণ এবং খামারিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের দাবি, ক্ষতি পুষিয়ে নিতে জরুরি ভিত্তিতে গোখাদ্য, পশুচিকিৎসা সেবা এবং সরকারি আর্থিক প্রণোদনা প্রয়োজন। তা না হলে অনেক প্রান্তিক খামারি স্থায়ীভাবে খামার বন্ধ করতে বাধ্য হবেন।

চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আলমগীর বলেন, বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত করা হবে। পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।