এ মুহূর্তের সংবাদ

পচা চামড়া নদী-খালে ফেলায় পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটবে

পবিত্র ঈদুল আজহার প্রধান অনুষঙ্গ কোরবানির পশুর চামড়া। অথচ চামড়া শিল্পের এই মূল্যবান কাঁচামালটি নিয়ে প্রতি বছরই কোনো না কোনো অপ্রীতিকর চিত্র আমাদের সামনে আসে। এবার চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা ও ফেনীসহ দেশের কিছু জায়গায় চামড়া বিক্রি করতে না পেরে, কিংবা সংরক্ষণের অভাবে পচে যাওয়া শত শত চামড়া নদী ও খালে ফেলে দেয়ার খবর পাওয়া গেছে। একই সাথে চট্টগ্রাম নগরীর সড়ক ও আড়ত এলাকাগুলোতেও হাজার হাজার পচা চামড়া ফেলে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। মৌসুমি ব্যবসায়ীদের এই দায়িত্বজ্ঞানহীন ও অপরিণামদর্শী আচরণ আমাদের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য এক মারাত্মক অশনিসংকেত।

স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর রাইখাল এবং ফেনীর দাগনভূঞার কাটাখালী নদীসহ বিভিন্ন জলাশয়ে দেদারসে পচা চামড়া ফেলা হয়েছে। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে স্থানীয় বাসিন্দারা বাধা দেয়া সত্ত্বেও ব্যবসায়ীরা তা উপেক্ষা করে খালে চামড়া নিক্ষেপ করেছেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ অত্যন্ত যৌক্তিক— এই চামড়াগুলো সময়মতো স্থানীয় মসজিদ, মাদরাসা বা এতিমখানায় দান করে দিলে হয়তো চামড়াগুলো নষ্ট হতো না এবং দীনি প্রতিষ্ঠানগুলো উপকৃত হতো। কিন্তু অধিক লাভের আশায় তা না করে, শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় ও প্রাকৃতিক সম্পদকে নদী-নালায় ফেলে ধ্বংস করা হয়েছে।
পরিবেশবিদ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, নদী বা খালে পচা চামড়া ফেলে দেয়া আমাদের সামগ্রিক প্রতিবেশ ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত মারাত্মক। চামড়া একটি পচনশীল জৈব পদার্থ। পানিতে বিপুল পরিমাণ চামড়া এভাবে পচে গেলে পানির স্বাভাবিক গুণগত মান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। চামড়া পচার ফলে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পায় এবং অ্যামোনিয়া ও অন্যান্য ক্ষতিকারক গ্যাসের সৃষ্টি হয়। এর ফলে নদীর মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণী ও জীববৈচিত্র্যের অস্তিত্ব চরম হুমকির মুখে পড়ে। তাছাড়া, এই দূষিত পানি ব্যবহারের ফলে সংলগ্ন এলাকার মানুষের চর্মরোগ ও পানিবাহিত নানাবিধ মারাত্মক ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, আড়তদারদের সিন্ডিকেট এবং যথাসময়ে উপযুক্ত দাম না পাওয়ায় তারা চামড়া বিক্রি করতে পারেননি। আবার কাঙ্ক্ষিত সময়ে লবণ দিয়ে সংরক্ষণ না করায় চামড়ায় পচন ধরেছে। ব্যবসার খাতিরে লোকসান বা অব্যবস্থাপনা হওয়া অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু তার দায় কেন একটি দেশের নদী, প্রকৃতি ও সাধারণ মানুষ নেবে? লোকসানের ক্ষোভে বা বিক্রি করতে না পেরে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিতে বর্জ্য ফেলে পরিবেশ ধ্বংস করার অধিকার কারো নেই।
সংশ্লিষ্ট প্রশাসন জানিয়েছে, ঘটনাগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। আমরা মনে করি, শুধু ‘তদন্ত’ বা ‘ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস’-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। নদী ও জলাশয় দূষণের সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। ফেনীর দাগনভূঞায় নদী দূষণের যে ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, তার ভিত্তিতে দোষী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের মুখোমুখি করা উচিত, যেন ভবিষ্যতে কেউ এভাবে জনসমক্ষে নদী বা প্রাকৃতিক জলাশয়কে ডাস্টবিন বানানোর সাহস না পায়।
একই সাথে, চামড়া খাতের এই বার্ষিক সংকট নিরসনে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর নীতি প্রণয়ন করা জরুরি। মৌসুমি ব্যবসায়ীদের সচেতনতা বৃদ্ধি, সঠিক সময়ে ন্যায্য মূল্যে চামড়া ক্রয় নিশ্চিত করা এবং লবণের সহজলভ্যতা তৈরি করতে হবে, যাতে মূল্যবান চামড়া পচে যাওয়ার পরিস্থিতিই তৈরি না হয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, নদী ও পরিবেশ বাঁচলে তবেই বাংলাদেশ বাঁচবে। সাময়িক ব্যবসায়িক ক্ষোভের বলি যেন দেশের প্রাণ-প্রকৃতি না হয়, তা নিশ্চিত করার এখনই সময়।