এ মুহূর্তের সংবাদ

জাপানিজ এনসেফালাইটিস ভাইরাস, পরীক্ষার কেন সুযোগ থাকবে না

সম্প্রতি চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন তরুণ শিক্ষিকার আকস্মিক মৃত্যু মশাবাহিত প্রাণঘাতী রোগ ‘জাপানিজ এনসেফালাইটিস’ নিয়ে জনমনে তীব্র আতঙ্ক ও শঙ্কার জন্ম দিয়েছে। চিকিৎসকদের ধারণা, কিউলেক্স মশার মাধ্যমে ছড়ানো এই ভাইরাসটি তাঁর স্নায়ুতন্ত্র ও মস্তিষ্কে মারাত্মক আঘাত হেনেছিল। এই অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যু আমাদের সামনে একটি নির্মম সত্যকে উন্মোচিত করেছেÑতা হলো, একটি বিভাগীয় শহরের সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে এই মরণব্যাধি রোগটি শনাক্ত করার ন্যূনতম কোনো ব্যবস্থা নেই। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, নগরের কোনো হাসপাতালেই এই ভাইরাস পরীক্ষার প্রয়োজনীয় কিট নেই। রোগ নির্ণয়ের প্রাথমিক সুযোগটুকু যেখানে অনুপস্থিত, সেখানে চিকিৎসার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং যৌক্তিক।

জাপানিজ এনসেফালাইটিস কোনো নতুন রোগ নয়। কিউলেক্স মশার কামড়ে ছড়ানো এই রোগটি মূলত মানবদেহের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রমণ করে, যা রোগীকে দ্রুত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারে অথবা স্থায়ী পঙ্গুত্বের কারণ হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই রোগটি চিহ্নিত করার জন্য আরটিপিসিআর পরীক্ষার প্রয়োজন হয়, যা অত্যন্ত নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য। আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করলাম, কোভিড-১৯ মহামারির সময় যে আরটিপিসিআর প্রযুক্তি দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় ব্যাপকভাবে যুক্ত হয়েছিল, তা এখন একটি জরুরি ভাইরাস শনাক্তকরণে কিটের অভাবে অকেজো হয়ে পড়ে আছে। একটি আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থায় কিটের অভাবে পরীক্ষা বন্ধ থাকা এবং এর ফলে রোগীর মৃত্যু হওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
চট্টগ্রামের মতো একটি প্রধান বাণিজ্যিক ও জনবহুল নগরে যখন মশার উপদ্রব দিন দিন বাড়ছে, তখন স্বাস্থ্য বিভাগের এমন উদাসীনতা ও পূর্বপ্রস্তুতির অভাব অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মশা নিধনে স্থানীয় সিটি কর্পোরেশনের ভূমিকা নিয়ে বরাবরই নানা প্রশ্ন রয়েছে। নগরের ড্রেন ও জলাশয়গুলো কিউলেক্স মশার অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। অথচ এই মশাবাহিত প্রাণঘাতী ভাইরাসের প্রকোপ মোকাবিলায় মশা নিধন এবং হাসপাতালগুলোর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কোনো সমন্বিত উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। আক্রান্ত হওয়ার পর রোগ নির্ণয় করতে না পেরে যদি একের পর এক মূল্যবান প্রাণ ঝরে যায়, তবে জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তা বলে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় প্রশাসনকে এখনই যুদ্ধকালীন তৎপরতা শুরু করতে হবে। প্রথমত, অবিলম্বে চট্টগ্রামসহ দেশের সব বড় হাসপাতালের ল্যাবরেটরিগুলোতে জাপানিজ এনসেফালাইটিস শনাক্তকরণের প্রয়োজনীয় কিট সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। রোগ নির্ণয়ের ব্যবস্থা সহজলভ্য না হলে সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করা অসম্ভব। দ্বিতীয়ত, কিউলেক্স মশার বংশবিস্তার রোধে নগরজুড়ে কার্যকর ও বিশেষ ক্র‍্যাশ প্রোগ্রাম চালু করতে হবে। শুধু দায়সারা ওষুধ ছিটানো নয়, বরং মশার প্রজননস্থলগুলো চিহ্নিত করে তা ধ্বংস করতে হবে।
সর্বোপরি, এই রোগটি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। যেহেতু এই ভাইরাসের কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিষেধক বা চিকিৎসা নেই, তাই প্রতিরোধই একমাত্র উপায়। একজন সম্ভাবনাময় শিক্ষিকার মৃত্যু আমাদের যে সতর্কবার্তা দিয়ে গেল, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি এখনই স্বাস্থ্য খাত ও স্থানীয় প্রশাসন তাদের দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট না হয়, তবে আগামীতে এই সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত ঘুম ভাঙিয়ে নাগরিকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।