মতামত সম্পাদকীয়

জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় আর কত উদাসীনতা

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্রীষ্মের আগমন মানেই যেন এক অগ্নিপরীক্ষা। তাপমাত্রা বৃদ্ধির পারদ প্রতিনিয়ত নিজের রেকর্ড নিজেই ভাঙছে। তীব্র দাবদাহে জনজীবন বিপর্যস্ত, আর এর সবচেয়ে মারাত্মক পরিণতি হিসেবে দেখা দিচ্ছে ‘হিটস্ট্রোক’। জলবায়ু পরিবর্তনের এই নির্মম বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, প্রকৃতির ওপর মানবজাতির দীর্ঘদিনের অত্যাচার এখন এক ভয়াবহ মানবিক সংকটে রূপ নিয়েছে। অথচ এই পরিবেশ সুরক্ষায় আমাদের ক্রমাগত ব্যর্থতা পরিস্থিতিকে দিন দিন আরও জটিল করে তুলছে।
তীব্র গরমে শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে হিটস্ট্রোক ঘটে। এটি একটি জীবনঘাতী জরুরি অবস্থা। হিটস্ট্রোক থেকে বাঁচতে এবং এর চিকিৎসায় আমাদের তাৎক্ষণিক কিছু করণীয় রয়েছে। প্রথমত, তীব্র রোদে যথাসম্ভব বাইরে বের হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। প্রয়োজনে বের হলে ছাতা, টুপি এবং হালকা রঙের ঢিলেঢালা সুতির পোশাক ব্যবহার করা উচিত। শরীরকে হাইড্রেটেড রাখতে প্রচুর পরিমাণে নিরাপদ পানি, ডাবের পানি বা স্যালাইন পান করতে হবে। যদি কেউ হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হন—যেমন শরীরের তাপমাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়া, অচেতন হয়ে পড়া বা তীব্র মাথাব্যথা দেখা দেওয়া—তবে তাকে দ্রুত শীতল বা ছায়াযুক্ত স্থানে নিয়ে যেতে হবে। ভেজা কাপড়ে শরীর মুছে দেওয়া এবং ফ্যানের বাতাস করার পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া আবশ্যক।
কিন্তু চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া কিংবা সাময়িক সতর্কতা অবলম্বন করা এই সংকটের স্থায়ী সমাধান নয়। প্রশ্ন হলো, আমরা আজ এই চরম আবহাওয়ার মুখোমুখি কেন? উত্তরটা পরিষ্কার—পরিবেশ সুরক্ষায় আমাদের চরম ব্যর্থতা।
উন্নয়ন ও নগরায়ণের নামে আমরা প্রতিনিয়ত উজাড় করছি বনাঞ্চল, ভরাট করছি জলাশয়। কংক্রিটের জঙ্গল তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে আমরা ভুলে গেছি যে, গাছপালাই পৃথিবীর ফুসফুস। অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, কালো ধোঁয়া এবং প্লাস্টিকের অবাধ ব্যবহার বায়ুমণ্ডলকে গ্রিনহাউস গ্যাসের চাদরে ঢেকে দিচ্ছে। ফলে আটকা পড়ছে সূর্যের তাপ, বাড়ছে বৈশ্বিক উষ্ণতা। আমাদের এই আত্মঘাতী আচরণের মাশুল দিতে হচ্ছে তীব্র দাবদাহ ও হিটস্ট্রোকের মতো স্বাস্থ্যঝুঁকি দিয়ে।
এই বিপর্যয় থেকে বাঁচতে হলে এখনই আমাদের যুদ্ধকালীন তৎপরতায় করণীয় নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। পরিবেশ সুরক্ষায় প্রথম ও প্রধান পদক্ষেপ হলো ব্যাপক হারে বৃক্ষরোপণ। প্রতিটি খালি জায়গায়, ছাদ-বাগানে এবং রাস্তার পাশে গাছ লাগাতে হবে। বনায়ন বৃদ্ধি পেলে তা প্রাকৃতিকভাবেই তাপমাত্রা কমিয়ে আনতে সাহায্য করবে। দ্বিতীয়ত, শহরের জলাশয় ও পুকুরগুলো সংরক্ষণ করতে হবে, যা স্থানীয় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে স্পঞ্জের মতো কাজ করে।
পাশাপাশি, কার্বন নিঃসরণ কমাতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। প্লাস্টিক বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনা এখন সময়ের দাবি। শুধু আইন করে বা সরকারের দিকে তাকিয়ে থেকে এই সংকট সমাধান সম্ভব নয়; সাধারণ জনগণের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।
প্রকৃতি আমাদের বেঁচে থাকার উপাদান দেয়, কিন্তু তার সহনশীলতার একটা সীমা আছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং হিটস্ট্রোকের এই মহামারি আসলে প্রকৃতির এক চূড়ান্ত সতর্কবার্তা। আমরা যদি এখনই আমাদের ব্যর্থতাগুলো শুধরে নিয়ে পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ না নিই, তবে আগামী প্রজন্মের জন্য এই পৃথিবী সম্পূর্ণ বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।