শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
মতামত সম্পাদকীয়

চুয়েটের পুকুরে ডুবে মৃত্যু : মূল সমস্যা কোথায়

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) একটি পুকুরে মাত্র ১৬ দিনের ব্যবধানে ৩ তরুণ প্রাণ অকালে ঝরে পড়ার খবর কেবল শোকাচ্ছন্ন করে না, বরং দেশের প্রকৌশল শিক্ষা ও পরিচালনা ব্যবস্থার এক চরম বৈপরীত্যকে উম্মোচিত করে। কবি কাজী নজরুল ইসলাম হলের সংলগ্ন যে পুকুরটি তা দুর্ঘটনার পর কর্তৃপক্ষের একমাত্র চটজলদি সমাধান ছিল পানি সেচে শুকিয়ে ফেলা। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, দেশের অন্যতম শীর্ষ প্রকৌশল বিদ্যাপীঠের একটি জলাশয় এত বড় ‘মৃত্যুকূপ’ হয়ে উঠল কীভাবে?
আমাদের দেশে গ্রাম-বাংলা থেকে শহর জুড়ে লাখ লাখ পুকুর ছড়িয়ে রয়েছে। শত শত বছর ধরে বহাল তবিয়তে থাকা এসব সনাতন জলাশয়ে কোনো আধুনিক সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং প্রযুক্তির ছোঁয়া ছিল না, ছিল না কোনো ১:৩ বা ১:৪ ঢালের সুনির্দিষ্ট অঙ্ক। তবুও প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষ সেসব পুকুরে অনায়াসে সাঁতার কেটেছে, দৈনন্দিন জীবন যাপন করেছে। সেখানে সাধারণ নিরাপত্তার বোধটুকু কাজ করত প্রাকৃতিকভাবে। অথচ চুয়েটের মতো একটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা খরচ করে, নির্দিষ্ট নকশা মেনে এলজিইডির সংস্কারকৃত একটি পুকুর এভাবে এক মরণফাঁদে পরিণত হওয়া মারাত্মক বিস্ময়কর। ১:২ ঢালের খাড়া নকশা, পাড় ঘেঁষেই হুট করে ১০-১২ ফুট গভীরতার বিপজ্জনক খাদ এবং সঠিক তদারকির অভাব প্রমাণ করে যে, কাগজে-কলমের আধুনিকতা এখানে কাজের জায়গায় চরম অদক্ষতা ও দায়িত্বহীনতার জন্ম দিয়েছে।
দুর্ঘটনার পরপরই অদূরদর্শী চিন্তাভাবনা থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দাবি উঠেছে পুকুরটি ভরাট করে ফেলার। কিন্তু কোনো বিশৃঙ্খলা বা নকশাগত ত্রুটির সমাধানে জলাশয় ভরাট করে দেওয়া কেবল পরিবেশগত অপরাধই নয়, বরং মূল সমস্যা থেকে মুখ লুকিয়ে পালানোর শামিল। পুকুর তো কোনো ক্ষতিকর সত্তা নয়; মূল গলদ ছিল এর ভুল নকশা, তদারকির অবহেলা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাবে। সমস্যার গোড়ায় হাত না দিয়ে পুকুর ভরাট করে ফেলাটা কোনো যুক্তিসঙ্গত সমাধান হতে পারে না।
প্রথম শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর কর্তৃপক্ষের যে নিস্পৃহতা দেখা গেছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। নিরাপত্তা সংকেত টানানো তো দূরের কথা, কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেরি করার মাশুল দিতে হয়েছে আরও দুটি তরতাজা প্রাণের বিনিময়ে। প্রথম দুর্ঘটনার পরপরই সতর্কতামূলক কঠোর পদক্ষেপ নিলে পরবর্তী ট্র্যাজেডি হয়তো এড়ানো যেত।
এখন প্রয়োজন একটি সুনির্দিষ্ট ও জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ। চুয়েট কর্তৃপক্ষের উচিত হবে কোনো অযৌক্তিক ভরাট অভিযানে না গিয়ে পুকুরটির স্থাপত্য ও পুরকৌশলগত পুনর্নিমাণ নিশ্চিত করা। নিরাপদ ঢাল (১:৩ বা ১:৪) প্রয়োগ করে পুকুরের গভীরতা জনবান্ধব ও সহনশীল মাত্রায় ফিরিয়ে আনতে হবে। সেই সাথে সমগ্র দেশেই যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্পে প্রকৌশলগত নিরাপত্তা ও সঠিক তদারকি নিশ্চিত করার মাধ্যমে এমন মর্মান্তিক গাফিলতির পুনরাবৃত্তি বন্ধ করতে হবে।

---------