মতামত

আল-আকসা ও লোহিত সাগর: কোরআনের আলোকে বর্তমান ভূ-রাজনীতি

রিদুয়ানুল হক

অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

---------

সমসাময়িক আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং বিশ্ব অর্থনীতির খবরাখবর যারা রাখেন, তারা জানেন মধ্যপ্রাচ্য এবং বিশেষ করে লোহিত সাগর অঞ্চল বর্তমানে কতটা উত্তপ্ত। এই বৈশ্বিক উত্তাপ ও সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জেরুজালেমের আল-আকসা এবং এর চারপাশের অঞ্চল। আজ থেকে চৌদ্দশ বছর আগে পবিত্র কোরআনের সূরা বনি ইসরাইলের (সূরা ইসরা) প্রথম আয়াতে এই অঞ্চলের অভাবনীয় ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বের একটি সুনির্দিষ্ট ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল।

আয়াতটির শুরুতে বলা হয়েছে: “তিনি পরম পবিত্র ও মহিমাময়, যিনি তাঁর বান্দাকে রাত্রিকালীন ভ্রমণ করিয়েছেন মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত—যার চতুর্পাশকে তিনি করেছেন বরকতময়…”। মক্কার মাসজিদুল হারাম থেকে জেরুজালেমের মাসজিদুল আকসার দূরত্ব প্রায় বারোশো কিলোমিটার। সপ্তম শতাব্দীর যোগাযোগ ব্যবস্থায় উটের কাফেলায় এই দুর্গম পথ পাড়ি দিতে সময় লাগত প্রায় এক মাস। অথচ রাতের একটি ক্ষুদ্র অংশে নবীজি (সা.)-এর এই সুদীর্ঘ পথ অতিক্রম করা তৎকালীন মানুষের সীমিত বিচারবুদ্ধির কাছে ছিল ধারণাতীত। তাই আল্লাহ তাআলা আয়াতটি শুরু করেছেন ‘সুবহানা’ শব্দটি দিয়ে—অর্থাৎ তিনি স্থান, কাল ও দূরত্বের সকল সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে। তবে বর্তমান বিশ্ববাস্তবতায় আয়াতটির সবচেয়ে গবেষণাধর্মী অংশ হলো—“যার চতুর্পাশকে তিনি করেছেন বরকতময়”।

ঐশী ‘বরকত’ এবং তিন মহাদেশের কৌশলগত সংযোগস্থল

শাস্ত্রীয় মুফাসসিরগণ এই ‘বরকত’ বলতে ঐতিহাসিকভাবে শামের (ফিলিস্তিন, সিরিয়া, জর্ডান, লেবানন) উর্বর ভূমি, কৃষিজ ফলনের প্রাচুর্য এবং অসংখ্য নবী-রাসূলের পদচারণাকে বুঝিয়েছেন। কিন্তু আধুনিক ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মানচিত্রের দিকে তাকালে এই ঐশী ‘বরকতে’র আরও এক বিস্তৃত ও বিস্ময়কর রূপ উন্মোচিত হয়।

ভৌগোলিকভাবে আল-আকসাকে ঘিরে থাকা সমগ্র আরব উপদ্বীপ হলো এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপ—এই তিন মহাদেশের ঐতিহাসিক সংযোগস্থল। বিশ্বস্রষ্টা এই বলয়ের ভূগর্ভেই গচ্ছিত রেখেছেন পৃথিবীর সর্ববৃহৎ প্রাকৃতিক জ্বালানি (তেল ও গ্যাস) ভাণ্ডার। প্রাচীনকালের সিল্ক রোড (রেশম পথ) থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের সবচেয়ে ব্যস্ততম সমুদ্রপথগুলো এই অঞ্চলকে ঘিরেই আবর্তিত। সুতরাং, কোরআনে বর্ণিত ‘বরকত’ কেবল ফলের বাগানে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।

বিশ্ববাণিজ্যের প্রাণভোমরা

হরমুজ, বাবেল মান্দেব ও সুয়েজ খাল হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক রাজনীতির মূলকেন্দ্র।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক ক্ষমতা আরও স্পষ্ট হয়। পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগরের সাথে যুক্ত করা ‘হরমুজ প্রণালী’ দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেলের প্রায় ২০-২১ শতাংশ (দৈনিক প্রায় ২ কোটি ব্যারেল) পরিবাহিত হয়। অন্যদিকে লোহিত সাগরকে ভারত মহাসাগরের সাথে যুক্ত করেছে ‘বাবেল মান্দেব’। বৈশ্বিক কন্টেইনার বাণিজ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ এবং মোট সামুদ্রিক বাণিজ্যের ১২ শতাংশ এই পথ দিয়েই পরিচালিত হয়।

বাবেল মান্দেব দিয়ে লোহিত সাগর পেরোলেই সুয়েজ খাল। ১৮৬৯ সালে উন্মুক্ত হওয়া এই খাল এশিয়া ও ইউরোপের বাণিজ্যপথের দূরত্ব হাজার হাজার মাইল কমিয়ে দিয়েছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এই সুয়েজ খাল ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে অনেক রক্তক্ষয়ী অধ্যায়। ১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকট এবং ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর টানা আট বছর এই খাল বন্ধ থাকায় বিশ্ব অর্থনীতিতে ভয়াবহ মন্দা নেমে এসেছিল।

আজকের বাস্তবতাও একই সুতোয় গাঁথা। লোহিত সাগর ও বাবেল মান্দেব এলাকায় চলমান সামরিক সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে এখন বাধ্য হয়ে পুরো আফ্রিকা মহাদেশ (কেপ অব গুড হোপ) ঘুরে যাতায়াত করতে হচ্ছে। এর ফলে পণ্য পরিবহনে সময় বাড়ছে ১০ থেকে ১৪ দিন, আকাশচুম্বী হচ্ছে জ্বালানি খরচ এবং বিশ্বজুড়ে হু হু করে বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম। এর ঠিক মাঝামাঝি অবস্থানে থাকা সৌদি আরবের জেদ্দা ইসলামিক পোর্ট শত শত বছর ধরে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে যে কৌশলগত লজিস্টিক সাপোর্ট দিয়ে আসছে, বর্তমান সংঘাতে তা-ও ঝুঁকিতে পড়ছে।

সম্পদের প্রাচুর্য বনাম উম্মাহর কৌশলগত দৈন্য

এখানেই মুসলিম বিশ্বের সামনে সবচেয়ে বড় এবং তিক্ত প্রশ্নটি এসে দাঁড়ায়। যে পবিত্র ভূমি ও তার চতুর্পাশকে আল্লাহ স্বয়ং ‘বরকতময়’ ঘোষণা করেছেন, যেখানে জমা আছে বিশ্বের অধিকাংশ জ্বালানি সম্পদ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূল নিয়ন্ত্রক পথ—সেই ভূমির উত্তরাধিকারী মুসলিম উম্মাহ আজ এত অসহায় কেন?

দুঃখজনক হলেও সত্য, এই অভাবনীয় ভৌগোলিক ও কৌশলগত শক্তিকে মুসলিম বিশ্ব নিজেদের সামগ্রিক কল্যাণে ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয়েছে। স্রেফ কাগুজে মুদ্রা বা ডলারের বিনিময়ে এই অমূল্য সম্পদ তুলে দেওয়া হয়েছে অন্যদের হাতে। নিজেদের ক্ষমতার রেষারেষি ও তথাকথিত নিরাপত্তার অজুহাতে পরাশক্তির সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে খোদ আরবের মাটিতে। এর চরম পরিণতি আজ আমাদের চোখের সামনে দৃশ্যমান—আল-আকসা আজ বেহাত, ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ মানুষ আগ্রাসন ও অনাহারে ধুঁকে মরছে, অথচ বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা হাতে থাকা সত্ত্বেও মুসলিম বিশ্ব নির্বিকার দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মেরাজের ঐতিহাসিক রুট এবং বায়তুল মুকাদ্দাস সংলগ্ন অঞ্চলের ওপর আল্লাহ যে অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক বরকত রেখেছেন, তা কেবল আবেগের বশবর্তী হয়ে নয়, বরং বস্তুনিষ্ঠভাবে অনুধাবন করা আজ মুসলিম বিশ্বের জন্য সবচেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক দাবি। আয়াতটির সমাপ্তি ঘটেছে একটি ঘোষণার মাধ্যমে: “নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” বিশ্বমোড়লরা দৃশ্যমান বা অদৃশ্য যত চক্রান্তই করুক না কেন, স্রষ্টার নজর এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। তবে এই ঐশী নিদর্শনগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ, প্রজ্ঞাবান ও কৌশলগতভাবে শক্তিশালী ভবিষ্যৎ নির্মাণ করার দায়িত্ব উম্মাহর কাঁধেই বর্তায়।