ফিচার এলাটিং বেলাটিং

বাবা নামের বটগাছ

ফারুক হোসেন সজীব »

রিমন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। সে খুব চঞ্চল আর হাসিখুশি ছেলে। তার বাবা ছিলেন একজন সাধারণ মানুষ। একটি ছোট দোকানে কাজ করতেন। ভোরে বের হতেন আর সন্ধ্যায় ফিরতেন। রিমনের মনে হতো, তার বাবা যেন সব সময় ব্যস্ত থাকেন। তাই মাঝে মাঝে সে অভিমান করত। বন্ধুদের বাবারা তাদের নিয়ে ঘুরতে যায়। খেলাধুলা করে। কিন্তু তার বাবা যেন সব সময় কাজ নিয়েই থাকেন। একদিন স্কুলে শিক্ষক একটি রচনা লিখতে দিলেন। বিষয় ছিল আমার জীবনের প্রিয় মানুষ। সবাই মাকে, দাদুকে বা বন্ধুদের নিয়ে লিখতে শুরু করল। রিমনও খাতা খুলল। কিন্তু সে বুঝতে পারল, সে বাবাকে নিয়ে খুব বেশি কিছু জানে না। তখন সে ঠিক করল, আজ থেকে বাবাকে একটু ভালোভাবে দেখবে। সেদিন রাতে বাবা বাড়ি ফিরলেন খুব ক্লান্ত হয়ে। তবু তিনি রিমনের পাশে বসে পড়াশোনার খোঁজ নিলেন। রিমন লক্ষ্য করল, বাবার শার্টটি পুরোনো হয়ে গেছে। জুতোটাও বেশ ক্ষয়ে গেছে। অথচ কয়েক দিন আগেই বাবা তার জন্য নতুন স্কুলব্যাগ কিনে দিয়েছেন। বিষয়টি ভাবতেই রিমনের ভীষণ কষ্ট হলো। পরের দিন স্কুল থেকে ফিরে সে দেখল, বাবা ছুটির দিনেও বাড়িতে নেই। মা বললেন, দোকানে অতিরিক্ত কাজ এসেছে। তাই বাবা দোকানে গেছেন। রিমন শুনে চুপ হয়ে রইল। সন্ধ্যায় বাবা ফিরে এলে রিমন দেখল, বাবার মুখে ক্লান্তি। কিন্তু তাকে দেখেই বাবা হেসে বললেন, রিমন বাবা কিছু বলবে? বাবা ম্লান হাসি হাসতে লাগলেন। সেই হাসিতে কোনো অভিযোগ ছিল না। কিছুদিন পর স্কুলে একটি শিক্ষা সফরের আয়োজন হলো। যেতে হলে টাকা দিতে হবে। রিমন খুব যেতে চাইল। কিন্তু সে জানত, বাড়ির অবস্থা খুব ভালো নয়। তাই কাউকে কিছু বলল না। কিন্তু তার মন খারাপ হয়ে গেল। বাবা বিষয়টি বুঝতে পারলেন। অনেক জিজ্ঞেস করার পর রিমন সব বলল। দুই দিন পরে বাবা তাকে টাকাটা দিলেন। রিমন অবাক হয়ে গেল। সে জানত, এই মাসে অনেক খরচ আছে। তবু বাবা তার জন্য টাকা জোগাড় করেছেন। শিক্ষা সফরে গিয়ে রিমন খুব আনন্দ করল। ফেরার পথে সে বাবার জন্য একটি কলম কিনল। এটাই ছিল তার সামর্থ্যের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর উপহার। বাবা কলমটি হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, এটা আমি সব সময় কাছে রেখে দেব। সেই মুহূর্তে রিমনের মনে হলো, এত ছোট একটি উপহার পেয়ে বাবা যেন পৃথিবীর সবচেয়ে দামি জিনিস পেয়েছেন। কয়েক দিন পর রচনা জমা দেওয়ার দিন এলো। রিমন লিখল, আমার জীবনের প্রিয় মানুষ আমার বাবা। তিনি সব সময় আমাদের জন্য কাজ করেন। নিজের প্রয়োজনের আগে আমাদের কথা ভাবেন। আমি যখন কষ্ট পাই, তিনি আমাকে সাহস দেন। আমি যখন কিছু চাই, তিনি চেষ্টা করেন তা পূরণ করতে। কিন্তু তিনি আমাদের পরিবারের সবার জন্য বটবৃক্ষ ছায়া! রচনার শেষে সে লিখল, বটগাছ যেমন ঝড়-বৃষ্টি থেকে সবাইকে রক্ষা করে, আমার বাবাও তেমন আমাদের আগলে রাখেন। তাই আমার কাছে বাবা মানে একটি বটগাছ।
শিক্ষক রচনাটি পড়ে খুব খুশি হলেন। তিনি পুরো ক্লাসের সামনে রিমনের লেখা পড়ে শোনালেন। সবাই হাততালি দিল। সেদিন বাড়ি ফিরে রিমন বাবার হাতে রচনাটি তুলে দিল। বাবা মন দিয়ে পুরো লেখাটি পড়লেন। তারপর ছেলের মাথায় হাত রেখে মৃদু হেসে বললেন, তুমি আমাকে এত বড় সম্মান দিয়েছ! যা আমি কোনো দিন ভুলব না। সেদিন রাতে রিমন অনেক কিছু বুঝতে পারল। বাবা শুধু সংসারের উপার্জনকারী নন। তিনি পরিবারের ভরসা, সাহস আর আশ্রয়। হয়তো তিনি সব সময় পাশে বসে গল্প করেন না, কিন্তু তার প্রতিটি পরিশ্রমের মধ্যে লুকিয়ে থাকে ভালোবাসা। সেই দিনের পর থেকে রিমনের বাবা হয়ে উঠলেন একটি বিশাল বটগাছ! যার ছায়ায় দাঁড়িয়ে পুরো পরিবার নিরাপদে বেঁচে আছে!