সুপ্রভাত ডেস্ক »
সামিট গ্রুপসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি ও মানিলন্ডারিংয়ের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধানে নথিপত্র তলব করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
সম্প্রতি দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে সংস্থাটির উপপরিচারক ও যৌথ টিম প্রধান মো আলমগীর হোসেনে সই করা পাঠানো পৃথক চিঠির সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। চিঠিতে আগামী ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সরবরাহ করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) দুদক উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম বলেন, সামিট গ্রুপ সংক্রান্ত দুর্নীতি ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে একটি বিশেষ অনুসন্ধান টিম কাজ করছে। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে সম্প্রতি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) কাছে কিছু রেকর্ডপত্র চাওয়া হয়েছে। দুদক রেকর্ডপত্র সংগ্রহ সাপেক্ষে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
যেসব নথিপত্র তলব করা হয়েছে
দুদক থেকে বিপিসি ও বিউবোর কাছে পাঠানো আলাদা আলাদা চিঠিতে বেশ কিছু নথিপত্র চাওয়া হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে প্রাইভেট পাওয়ার প্ল্যান্টের (আইপিপি) জ্বালানি হিসেবে আমদানি করা এইচএফও (এইচএফও)-এর জ্বালানি খরচের উপাদানের সঠিকতা যাচাইয়ের জন্য বিপিসি নির্ধারিত ফরম্যাট বিষয়ক নথিপত্র।
বিউবো ও সামিট পাওয়ার লিমিটেডের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী, বিপিসি যদি জ্বালানি আমদানিতে অপারগ হয় তবে অন্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আমদানির ক্ষেত্রে কোনো ছাড়পত্র বা অনুমতি দেওয়া হয়েছে কি না, তার রেকর্ডপত্র।
পাওয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্ট অনুযায়ী প্রতিটি ফুয়েল কার্গোর ক্যালকুলেশন শিট ও মূল সামারি শিট।
আমদানি করা এইচএফও’র ক্ষেত্রে হ্যান্ডলিং কমিশন, পোর্ট ডিউস/রিভার ডিউস এবং সার্ভে ফি’র অনুমোদিত হার ও নীতিমালা।
আমদানি করা এইচএফও-এর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য টার্মিনাল চার্জ ও ভ্যাট সংক্রান্ত রেকর্ডপত্র।
সামিট পাওয়ার লিমিটেডের এইচএফও ভিত্তিক আইপিপি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জ্বালানি আমদানি ও বিল পরিশোধ সংক্রান্ত চুক্তি অনুযায়ী প্রতিটি ফুয়েল কার্গোর ক্যালকুলেশন শিট, মূল সামারি শিট, বিল অব লেডিং, লন্ডন ট্যাংকার ব্রোকারস প্যানেল সার্টিফিকেট এবং ব্যাংক অ্যাডভাইস ও পোর্ট ডিউসের সত্যায়িত ছায়ালিপি।
দুদক সূত্রে জানা যায়, সামিট গ্রুপ এবং তাদের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং মানিলন্ডারিংয়ের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ রয়েছে। ইতোমধ্যে যৌথ টিম প্রায় সাড়ে দশ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকির মামলা দায়ের করেছে। ২০২৫ সালের ২৬ আগস্ট টিম সদস্য ও দুদকের সহকারী পরিচারক নাছরুল্লাহ হোসাইন বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন।
মামলায় সরকারের ১০ কোটি ২৪ লাখ ৫২ হাজার ৬৫২ টাকার রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগে আনা হয়েছে। যেখানে সামিট কমিউনিকেশনস লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ফরিদ খানসহ মোট ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। মামলার অন্যান্য আসামিরা হলেন—বিটিআরসির প্যানেল আইনজীবী খন্দকার রেজা-ই-রাকিব, বিটিআরসির সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. মহিউদ্দিন আহমেদ, সাবেক কমিশনার (আইন) মো. আমিনুল হক বাবু, সাবেক কমিশনার (স্পেকট্রাম) শেখ রিয়াজ আহমেদ, সাবেক কমিশনার (অর্থ, হিসাব ও রাজস্ব) ড. মুশফিক মান্নান চৌধুরী, সাবেক কমিশনার (সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস) মো. দেলোয়ার হোসাইন।
দুদকের এজাহারে বলা হয়, বিটিআরসির কর্মকর্তা ও লেক্স কাউন্সিলের প্যানেল আইনজীবীর সহযোগিতায় সামিট কমিউনিকেশনস বেআইনিভাবে ১৪ কোটি ২০ লাখ ৮৮ হাজার ১৩৬টি নতুন অর্ডিনারি শেয়ার ইস্যু করে। যার মধ্যে ৯ কোটি ৪৪ লাখ ৮৮ হাজার ৯১১টি শেয়ার দেওয়া হয় সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক গ্লোবাল এনারিং-এ, যা মুহাম্মদ আজিজ খান ও তার পরিবারের মালিকানাধীন। ৪ কোটি ৪ লাখ ৯৫ হাজার ১১৯টি শেয়ার দেওয়া হয় মরিশাসভিত্তিক প্রতিষ্ঠান সেকুওয়া ইনফ্রা টেক লিমিটেডকে। বাকি ৭১ লাখ ৪ হাজার ৪০৬টি শেয়ার দেওয়া হয় পূর্বের শেয়ারহোল্ডার মো. আরিফ আল ইসলামের অনুকূলে। এই শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে কোম্পানির মূলধন প্রায় চার গুণ বৃদ্ধি পেয়ে মোট শেয়ার সংখ্যা ৫.০৭ কোটি থেকে বেড়ে ১৯.২৮ কোটিতে পৌঁছে। ফলে মোহাম্মদ ফরিদ খানের মালিকানা ৯৫ শতাংশ থেকে নেমে ২৫ শতাংশ এ আসে।
অন্যদিকে দুই বিদেশি প্রতিষ্ঠানের যৌথ মালিকানা দাঁড়ায় ৭০ শতাংশ। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০০১-এর ধারা ২৪ অনুযায়ী, শেয়ার হস্তান্তর বা মালিকানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে, বিক্রিত শেয়ারের মূল্যের ৫.৫% রাজস্ব পরিশোধ করতে হয়। ২০২২ সালে একই কোম্পানির শেয়ার হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সরকারি রাজস্ব আদায়ে ওই আইনের প্রয়োগ থাকলেও এক্ষেত্রে বিটিআরসির আইনজীবী খন্দকার রেজা-ই-রাকিব সামিট কমিউনিকেশন থেকে অবৈধ সুবিধা নিয়ে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ওই ৫.৫% মূল্য পরিশোধ সামিট কমিউনিকেশনস লিমিটেডের জন্য প্রযোজ্য নয় মর্মে মতামত দেন। এই মতামতের ভিত্তিতে বিটিআরসির তৎকালীন চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট কমিশনাররা মিলে অবৈধ সুবিধা নিয়ে শেয়ারের অনুমোদন দেন, ফলে সরকার প্রায় ১০ কোটি ২৪ লাখ টাকা রাজস্ব হারায়।













































