এ মুহূর্তের সংবাদ

কর্ণফুলীর তীরে সবুজ শিল্পাঞ্চল ‘কেইপিজেড’

দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার প্রতীক

সুপ্রভাত ডেস্ক »

চার দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের শিল্পায়নের সঙ্গে যুক্ত এক বিদেশি উদ্যোক্তার স্বপ্নে চট্টগ্রামের কর্ণফুলীর দক্ষিণ তীরে গড়ে উঠেছে এক ভিন্নধর্মী শিল্পাঞ্চল।

কোরিয়ান নাগরিক কিহাক সাংয়ের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত কোরিয়ান এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (কেইপিজেড) এখন শুধু রপ্তানিমুখী শিল্পের কেন্দ্র নয় বরং সবুজায়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও কর্মসংস্থানের এক নতুন উদাহরণ হয়ে উঠেছে। একসময় কৃষিনির্ভর জনপদ হিসেবে পরিচিত আনোয়ারা ও কর্ণফুলী এলাকার চিত্র বদলে দিয়ে কেইপিজেড তৈরি করেছে নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতা।

২ হাজার ৪৯২ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা এই শিল্পাঞ্চলে বর্তমানে রয়েছে ৪৮টি শিল্পকারখানা। জুতা, পোশাক, টেক্সটাইলসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের রপ্তানি খাতে অবদান রাখছে কেইপিজেড। উৎপাদন শুরুর পর থেকে এখান থেকে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার রপ্তানি আয় হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

পাশাপাশি ২০ লাখের বেশি গাছ রোপণ, ৫২ শতাংশ এলাকা সবুজায়নের আওতায় রাখা, জলাধার সংরক্ষণ ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহারে কেইপিজেড গড়ে তুলেছে সবুজ শিল্পের একটি মডেল।

বর্তমানে প্রায় ৩৫ হাজার শ্রমিক-কর্মচারীর কর্মস্থল এই শিল্পাঞ্চল, যাদের বড় অংশ নারী। নতুন বিনিয়োগ ও চলমান প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে আগামী দুই বছরের মধ্যে কর্মসংস্থান ৭০ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শিল্প, প্রকৃতি ও মানুষের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা কেইপিজেড এখন দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠছে।

১৯৯৯ সালে কেইপিজেড প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আড়াই হাজার একর জমি বরাদ্দ প্রদান করা হয়। সেখানে এখন গড়ে জুতা, পোশাক, টেক্সটাইল ও বিভিন্ন শিল্পপণ্যের কারখানা। যেগুলোতে উৎপাদন শুরুর পর গত ১৩ বছরে প্রতিষ্ঠানটির রপ্তানি আয় ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বর্তমানে এটি দেশের বৃহত্তম পরিবেশবান্ধব বেসরকারি শিল্পাঞ্চলগুলোর একটি।

সবুজ শিল্পাঞ্চল 

জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) সবুজ শিল্পকে সংজ্ঞায়িত করেছে টেকসই প্রবৃদ্ধির এমন একটি পথ হিসেবে, যেখানে পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগ ও নীতিগত উদ্যোগকে উৎসাহিত করা হয়। সেই ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কেইপিজেড নিজস্ব একটি সবুজ শিল্প মডেল গড়ে তুলেছে, যা বিপুল সংখ্যক বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে। এ পর্যন্ত ২০ লাখেরও বেশি বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রোপণ করা হয়েছে। পুরো শিল্পাঞ্চলের ৫২ শতাংশ এলাকাকে সবুজায়নের আওতায় রেখে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন করা হয়েছে। এ কারণে কেইপিজেড আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও পরিবেশবান্ধব শিল্পাঞ্চল হিসেবে প্রশংসা কুড়িয়েছে। এ পর্যন্ত ইয়াংওয়ান ১৭টি জলাধার তৈরি করেছে, যা অসংখ্য অমেরুদণ্ডী প্রাণী, উভচর, সরীসৃপ, পাখি ও স্তন্যপায়ী প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে গড়ে উঠেছে। বর্তমানে কেইপিজেডের মাত্র ২০ শতাংশ এলাকা শিল্প কার্যক্রমের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে এবং বাকি ৮০ শতাংশ এলাকা প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের জন্য সংরক্ষিত রয়েছে

কেইপিজেডে শিল্পকারখানা থেকে নির্গত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য আধুনিক ইটিপি (এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে তরল বর্জ্য পরিশোধনের পর পরিবেশসম্মত উপায়ে তা নিষ্কাশন করা হয়। পাশাপাশি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পানি পুনঃব্যবহার এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সুপারনিউমারি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামাল হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, টেকসই শিল্পায়নের জন্য অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে কোরিয়ান এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন দেশের সবুজ শিল্পায়নের একটি উল্লেখযোগ্য ।

তিনি আরও বলেন, কেইপিজেড কতৃপক্ষ ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বোটানিক্যাল গার্ডেনে বর্তমানে প্রায় ১,৩০০ প্রজাতির বৃক্ষ, গুল্ম, লতা, বিরুৎ, জলজ ও ম্যানগ্রোভ প্রজাতির উদ্ভিদ সংরক্ষণ করা হচ্ছে। মোট ১৬টি ভিন্ন সেকশনে এসব চারা রোপণ করা হয়েছে।

গত ১৬ জুন চবি ফরেস্ট বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা জানান, এখানে দেশি-বিদেশি বিরল প্রজাতির সমাহার তাদের মুগ্ধ করেছে। তারা মত দেন, এটি বাংলাদেশের উদ্ভিদ বৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। গার্ডেনটি ২০২৬–২০২৭ সালের মধ্যে উদ্ভিদ প্রজাতির সংখ্যা দুই হাজারে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় গত ১৬ জুন কেইপিজেড কর্তৃপক্ষ ২০২৬ সালে দুই লাখ দেশীয় গাছ লাগানোর একটি বৃহৎ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কেইপিজেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহজাহান। চিকরাশি চারা রোপণের মাধ্যমে কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয় এবং কেইপিজেডের বিভিন্ন কর্মকর্তা এতে অংশ নেন। কর্মসূচিতে জাম, গামার, গর্জন, চাপালিশ, চিকরাশি, লোহাকাঠ, সেগুন ও চম্পা প্রজাতির দেশীয় গাছ লাগানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব প্রজাতির বনায়ন কেইপিজেডের বর্তমান প্রায় ৫২ শতাংশ সবুজায়ন আরও সম্প্রসারণ ও টেকসই করবে।

জিডিপিতে কেইপিজেড’র গুরুত্বপূর্ণ অবদান

কেইপিজেড সূত্র জানায়, উৎপাদন শুরুর পর থেকে ধারাবাহিকভাবে রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে ইয়ংওয়ান গ্রুপের নিজস্ব বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত ৪৮টি শিল্পকারখানা চালু রয়েছে। এসব কারখানায় জুতা, পোশাক, ব্যাগ, টেক্সটাইল, সুতা ও বিভিন্ন ধরনের রপ্তানিমুখী পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানান, ২০১২ সালে উৎপাদন শুরু হওয়ার পর  ১৩ বছরে কেইপিজেড থেকে মোট রপ্তানি আয় ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি এসেছে। বর্তমানে কেইপিজেড ও ইয়ংওয়ান গ্রুপ দেশের শীর্ষ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম।

কেইপিজেড বাংলাদেশের রপ্তানি ও জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। যদিও কেইপিজেডের জন্য আলাদা সরকারি জিডিপি হিসাব প্রকাশ করা হয় না, তবে ইয়াংওয়ান করপোরেশন ও কেইপিজেডের বার্ষিক রপ্তানি আয় প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা বলে বিভিন্ন সময়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইয়াংওয়ান গ্রুপের কারখানাগুলো থেকে বছরে প্রায় ২.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ পণ্য রপ্তানি হয়, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার সমান। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়ছে। যা দেশের উৎপাদনশীলতা ও জিডিপি বৃদ্ধিতে অবদান রাখছে। বাংলাদেশে কোরিয়ার বিনিয়োগের একটি বড় অংশ এই ইপিজেড কেন্দ্রিক, যা অনুযায়ী দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগের (৩০.৭০ শতাংশ) একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।

এ বিষয়ে কেইপিজেডের উপ-মহাব্যবস্থাপক মুশফিকুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, প্রতিষ্টালগ্ন থেকে কেইপিজেড থেকে প্রায় আড়াই বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। নতুন বিনিয়োগ এলে এ অর্জন আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। চালু রয়েছে ১৪ মিলিয়ন ডলারের তিন বিদেশি প্রতিষ্ঠান। ইয়ংওয়ানের নিজস্ব ৪৮টি শিল্পকারখানার পাশাপাশি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির তিনটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান কেইপিজেডে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আমেরিকাভিত্তিক অ্যামেরিকান অ্যান্ড এফার্ড সুতা উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। একই দেশের পেক্সার বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ উৎপাদন করছে। জার্মানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এনজেলবার্ড গার্মেন্টস খাতে বিনিয়োগ করেছে। তিনটি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

সামিট ও ইয়াং ওয়ান চেয়ারম্যানকে নাগরিকত্ব

৭৮ বছর বয়সী কিহাক সাং প্রায় চার দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত। আশির দশকে তৈরি পোশাক শিল্পে বিনিয়োগের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে তিনি ইয়ংওয়ান বাংলাদেশ লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে সেই বিনিয়োগের সম্প্রসারণ ঘটিয়ে গড়ে তোলেন কেইপিজেড। বাংলাদেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি খাতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে সম্প্রতি সম্মানসূচক বাংলাদেশি নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়।

বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট সামিটকে কেন্দ্র করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ, ইয়ংওয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান ও কেইপিজেডের প্রতিষ্ঠাতা কিহাক সাংয়ের সম্মানসূচক বাংলাদেশি নাগরিকত্ব লাভ করেন। বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট সামিটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস তার হাতে এই সম্মাননা তুলে দেন।

২৫ সালে ঢাকায় এই বিনিয়োগ সম্মেলনে বিশ্বের ৫০টি দেশের ৫৫০ জনের বেশি বিনিয়োগকারী ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল। সামিটের অংশ হিসেবে বিনিয়োগকারীরা চট্টগ্রামের কোরীয় রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (কেইপিজেড) পরিদর্শনে যান।

বিদেশি বিনিয়োগে আগ্রহী 

এ ছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কেইপিজেডের টেকভিশন আইটি প্রকল্প ইতোমধ্যে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

অর্ধশতাধিক বিদেশি বিনিয়োগকারীর পদচারণা

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) উদ্যোগে আয়োজিত বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট সামিট-২০২৫ উপলক্ষ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীরা কেইপিজেড পরিদর্শন করেন।

চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য, ভারতসহ প্রায় ৪০টি দেশের ৬০ জনের বেশি বিদেশি ও দেশীয় বিনিয়োগকারী প্রতিনিধি দল কেইপিজেডের বিভিন্ন শিল্পকারখানা, কেপিপি, আর্ট গ্যালারি, আইটি পার্ক, মেডিকেল সেন্টার, টেক্সটাইল ইউনিভার্সিটি ও অন্যান্য স্থাপনা ঘুরে দেখেন।

পরিদর্শন শেষে অনেক বিনিয়োগকারী কেইপিজেডের পরিবেশ ও অবকাঠামো দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং ভবিষ্যতে বিনিয়োগে আগ্রহের কথাও জানান।

নেদারল্যান্ডসের এক বিনিয়োগকারী প্রতিনিধি রিক বলেন, কোরিয়ান ইপিজেডের পরিবেশ ও অবকাঠামো অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এখানে শিল্প বিনিয়োগের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।

চীন থেকে আসা বিনিয়োগকারী কেভিন মুও বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে শ্রম ব্যয় তুলনামূলক কম। পাশাপাশি বিনিয়োগের পরিবেশও ভালো। ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি লাভজনক গন্তব্য হতে পারে।

বিনিয়োগের প্রধান বাধা প্রশাসনিক জটিলতা

বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এক চীনা প্রতিনিধি কিহাক সাংয়ের কাছে বাংলাদেশে বিনিয়োগের প্রধান বাধা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রশাসনিক জটিলতা বিদেশি বিনিয়োগের অন্যতম বড় বাধা। তবে এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ লাভজনক বিনিয়োগের জন্য একটি সম্ভাবনাময় দেশ।

তিনি বলেন, দীর্ঘ চার দশকের অভিজ্ঞতায় তিনি বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল এবং সে কারণেই তিনি ধারাবাহিকভাবে ব্যবসা সম্প্রসারণ করে যাচ্ছেন।

৫২ শতাংশ সবুজে ঘেরা পরিবেশবান্ধব শিল্পাঞ্চল 

২ হাজার ৪৯২ একর আয়তনের কেইপিজেডের প্রায় ৮২৩ একর এলাকা সবুজায়নের জন্য সংরক্ষিত রয়েছে। উন্মুক্ত স্থান রয়েছে প্রায় ৫০০ একর। বর্তমানে মাত্র ৪০০ একর জায়গাজুড়ে ৪৮টি শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিদেশি কিংবা ইয়ংওয়ানের নিজস্ব বিনিয়োগের জন্য আরও প্রায় ৪০০ একর জমি প্রস্তুত রয়েছে।

নিজস্ব ৪০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প

কেইপিজেডের অন্যতম বড় শক্তি হলো এর নিজস্ব সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা। ৪০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এই প্রকল্প থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের মধ্যে বর্তমানে প্রায় ১৬ মেগাওয়াট নিজেদের শিল্পকারখানায় ব্যবহার করা হচ্ছে। বাকি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। ফলে বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে বিনিয়োগকারীদের কোনো উদ্বেগ নেই। পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দর, যোগাযোগ অবকাঠামো ও তুলনামূলক কম শ্রম ব্যয়ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা হিসেবে কাজ করছে।

শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ

শিল্পায়নের পাশাপাশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ করছে কোরিয়ান এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (কেইপিজেড)। হাসপাতাল, নার্সিং কলেজ ও টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় শিল্পাঞ্চলের পাশাপাশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও বিনিয়োগ করছে কেইপিজেড। শিল্পাঞ্চলকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ইতোমধ্যে কেইপিজেডে একটি হাসপাতাল ও নার্সিং কলেজ চালু হয়েছে, যা স্থানীয় জনগণ ও শিল্পাঞ্চলের কর্মীদের স্বাস্থ্যসেবা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে টেক্সটাইল খাতের দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্যে একটি টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতি চলছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক মানের আরও একটি আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। শিক্ষা বিস্তারের অংশ হিসেবে স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রকল্পও বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব উদ্যোগ শুধু শিল্পাঞ্চলের প্রয়োজন মেটাবে না, বরং আনোয়ারা ও কর্ণফুলীসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বর্তমানে কর্মরত ৩৫ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী 

বর্তমানে কেইপিজেডে ৩৫ হাজারের বেশি শ্রমিক-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। চলমান শিল্পপ্রকল্পগুলো উৎপাদনে গেলে আগামী দুই বছরের মধ্যে কর্মসংস্থানের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে ৭০ হাজার ছাড়িয়ে যাবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

কেইপিজেডে কর্মরত কর্মচারীরা মনে করেন, কিহাক সাংয়ের নেতৃত্বে ইয়ংওয়ান ও কেইপিজেড দেশের রপ্তানি খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে এবং ভবিষ্যতে এ অবদান আরও বাড়বে।

কতৃপক্ষ বলছে কোরিয়ান এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন নারী শ্রমিকদের সঠিক কর্ম পরিবেশ নিশ্চিত করেছে। বর্তমানে কেইপিজেডের বিভিন্ন সেক্টরে ৩৫ হাজর শ্রমিক কর্মরত আছেন, যার মধ্যে ৮০ শতাংশ নারী শ্রমিক। শুক্রবার এবং অন্যান্য ছুটি মিলিয়ে কোরিয়ান এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোনের বার্ষিক ১০৮দিনের ছুটি রয়েছে। এর বাইরেও কেউ কোনো কারণে ছুটি নিতে চাইলে সেই ছুটি নেওয়ারও সুবিধা রয়েছে।

হাইলধর ইউনিয়নের মাহবুব নামের এক নির্মাণশ্রমিক বলেন, আমাদের বিয়ে হয়েছে আজ ১৪ বছর। একটা মেয়ে আর দুই ছেলেসন্তান রয়েছে। মেয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে আর বড় ছেলে ৪র্থ  শ্রেণি এবং ছোট ছেলেটা নার্সারিতে পড়ে। বিয়ের ৭ বছরের মধ্যে অসুস্থতার কারণে আমি কাজকর্ম করতে অক্ষম হয়ে পড়ি। পরবর্তীতে আমার স্ত্রী কেইপিজেডে কাজ করা শুরু করে। সে থেকে আমার স্ত্রীর রোজগার দিয়ে আমাদের পরিবার এবং ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ চলে। আর আমি ঘরে থেকে কাজকর্ম করি। এমন একজন জীবন সঙ্গী পেয়ে আমি ধন্য।

স্থানীয়দের জীবনমান উন্নয়নে প্রভাব 

আনোয়ারা ও কর্ণফুলীর এই অঞ্চলে অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন এসেছে। স্থানীয়দের মতে, কেইপিজেড প্রতিষ্ঠার পর আনোয়ারার আর্থ-সামাজিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন হয়েছে।

চাতুরী ইউনিয়নের স্থানীয় বাসিন্দা ইকবাল বাহার বলেন, বিপুলসংখ্যক নারী-পুরুষের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি গ্রামে গ্রামে নতুন নতুন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। বিকেলে কারখানা ছুটির পর বাজার ও ব্যবসা কেন্দ্রগুলো প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে ওঠে। এটি স্থানীয় অর্থনীতিতে জীবনমানের উন্নতিতে প্রভাব পড়ছ।

স্থানীয় ব্যবসায়ী শাকিল বিন ইসলাম বলেন, কাফকো সেন্টার, চাতরী চৌমুহনী, আনোয়ারা সদর, বটতলী রুস্তমহাটসহ পুরো উপজেলায় বাসাভাড়া, ক্ষুদ্র ব্যবসা, রেস্টুরেন্ট, পরিবহন ও বিনোদনকেন্দ্রের প্রসার ঘটেছে। কেইপিজেড স্থানীয় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।

কেইপিজেড করপোরেশন (বিডি) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহজাহান ঢাকা পোস্টকে বলেন, শতভাগ পরিবেশবান্ধব শিল্পাঞ্চল হিসেবে কোরিয়ান এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (কেইপিজেড) আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি ইতিবাচক ও আস্থার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সবুজ ও টেকসই শিল্পায়নের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও ক্রমেই বাড়ছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে বেশ কয়েকটি নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে। এসব বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ চট্টগ্রামে শিল্পায়ন নতুন গতি পাবে, সৃষ্টি হবে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে সক্ষম হবে এই শিল্পাঞ্চল

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রুনা সাহা ঢাকা পোস্টকে বলেন, কেইপিজেডে শিল্প সম্প্রসারণ ও নতুন বিদেশি বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে শুধু আনোয়ারা ও কর্ণফুলী নয়, পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক চিত্র বদলে যাবে। একই সঙ্গে কর্ণফুলী টানেলকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের এই বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের প্রত্যাশিত সুফলও বাস্তবে দৃশ্যমান হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রত্যাশিত গতির তুলনায় বিদেশি বিনিয়োগের হার এখনো অপর্যাপ্ত। বিদেশি বিনিয়োগের আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশ এখনো প্রত্যাশিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। বর্তমানে যে বিনিয়োগ আসছে, তার বড় অংশই দেশে আগে থেকেই ব্যবসা পরিচালনাকারী বিদেশি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে আসছে।

রুনা সাহা বলেন, কেইপিজেড বাংলাদেশের শিল্প খাতে বিশেষ করে পোশাক রপ্তানিতে  ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে শ্রমবান্ধব কর্মপরিবেশ এবং পরিবেশবান্ধব কারখানা গড়ে তোলার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি একটি ইতিবাচক উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। তবে আরও বেশি বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সরকারের সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হলে রপ্তানি খাতে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ আরও বাড়বে।