এ মুহূর্তের সংবাদ

সাতকানিয়ায় একদিকে মাটিখেকোদের বিরুদ্ধে অভিযান, অন্যদিকে বাণিজ্য !

নিজস্ব প্রতিবেদক »

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায় মাটি কাটার বিরুদ্ধে জোরালো অভিযান চালানোর দাবি করে আসছে পুলিশ ও প্রশাসন। গত পাঁচ মাসে অন্তত দুই শতাধিক অভিযানের তথ্যও প্রচার করা হয়। কিন্তু এসব অভিযানের আড়ালে উঠে এসেছে ভিন্ন এক চিত্র। একাধিক ভুক্তভোগীর অভিযোগ, অভিযানে স্কেভেটর বিকল করার নামে মূলত ব্যাটারি খুলে নেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে টাকার বিনিময়ে তা ফেরত দেওয়ার একটি অনিয়মিত প্রক্রিয়া গড়ে উঠেছে।

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সাতকানিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার। একই সঙ্গে উপজেলা প্রশাসনের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। কারণ বিকল করার তথ্য প্রচার করা হলেও জব্দকৃত সরঞ্জামের কোনো স্বচ্ছ হিসাব বা আইনি প্রক্রিয়ার দৃশ্যমানতা নেই।

ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ এপ্রিল রাতে ইসমাইল হারুনের ভাড়া করা একটি স্কেভেটর ভাঙচুর করে দুটি ব্যাটারি খুলে নিয়ে যায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নেতৃত্বাধীন টিম। পরবর্তীতে ১৫ হাজার টাকার বিনিময়ে ওই ব্যাটারি ফেরত দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। একই দিনে জিয়াউল হকের স্কেভেটর থেকে দুটি ব্যাটারি ও একটি পাওয়ার সেল খুলে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের পক্ষ থেকে ৩০ হাজার টাকা দাবি করা হয় বলে জানান ভুক্তভোগী। টাকা বেশি হওয়ায় তিনি ব্যাটারি ফেরত নেননি এবং সেগুলো এখনো প্রশাসনিক হেফাজতে রয়েছে বলে জানা গেছে।

১৬ এপ্রিল হাসানের আরবিসি ব্রিকফিল্ডে অভিযান চালিয়ে একটি স্কেভেটর থেকে দুটি ব্যাটারি খুলে নেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, তিন দিন পর ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে ব্যাটারি ফেরত দেওয়া হয়। ৬ এপ্রিল মিঠাদিঘী এলাকায় মোবারক ও সেলিমের স্কেভেটর থেকেও একইভাবে ব্যাটারি খুলে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় এখনো দর কষাকষি চলছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এছাড়া সরওয়ারের গাউসিয়া ব্রিকস থেকে স্কেভেটর ভেঙে ব্যাটারি নিয়ে যাওয়ার পর মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তা ফেরত দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ১৯ এপ্রিল ছদাহা মিঠাদিঘী এলাকায় জালালের স্কেভেটরসহ অন্যান্য সরঞ্জাম ভাঙচুরের ঘটনাতেও অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালিত হয় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

অভিযানের সময় স্কেভেটর বিকল করার কথা বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে ব্যাটারি খুলে নেওয়াকেই বিকল করা হিসেবে দেখানো হচ্ছে। পরে মালিকরা যোগাযোগ করলে দর কষাকষির মাধ্যমে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ব্যাটারি ফেরত দেওয়া হচ্ছে। ফলে কয়েকদিনের মধ্যেই স্কেভেটরগুলো আবার সচল হয়ে আগের মতোই মাটি কাটার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সম্প্রতি সাতকানিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে অর্ধশতাধিক স্থানে এ ধরনের অভিযান পরিচালিত হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব অভিযানের মাধ্যমে একটি অনানুষ্ঠানিক অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়া চালু হয়েছে, যেখানে নিয়মিত মাসোহারা নেওয়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে।

অন্যদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে বিভিন্ন সময় স্কেভেটর বিকল করার তথ্য দেওয়া হয়। সেই স্কেভেটরগুলোর ব্যাটারি কোথায় রয়েছে, কতগুলো জব্দ তালিকাভুক্ত হয়েছে কিংবা আদালতে পাঠানো হয়েছে এ বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। আইন অনুযায়ী জব্দকৃত সরঞ্জাম তালিকাভুক্ত করে আদালতে উপস্থাপন করার কথা থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ দেখা যায়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, যদি জব্দ করা ব্যাটারিই আবার টাকার বিনিময়ে ফেরত দেওয়া হয়, তাহলে অভিযানের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। এতে একদিকে যেমন মাটি কাটার কার্যক্রম বন্ধ হচ্ছে না, অন্যদিকে প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আরও অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে স্কেভেটর বা অন্যান্য সরঞ্জাম আনুষ্ঠানিকভাবে জব্দ না দেখিয়ে কয়েকদিন ধরে দেনদরবার চলে। সমঝোতা হলে সরঞ্জাম ছেড়ে দেওয়া হয়, অন্যথায় সীমিত কিছু ক্ষেত্রে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

অভিযোগের বিষয়ে সাতকানিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ৩ টি ব্যাটারি আইনগত প্রক্রিয়ায় জব্দের তালিকা সরবরাহ করেন। তবে বাকি ব্যাটারিগুলো কোন প্রক্রিয়ায় জব্দ এবং কোন প্রক্রিয়ায় মালিকের কাছে স্থানান্তর করেছেন তার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি।

অভিযোগের বিষয়ে সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মাহমুদুল হাসানকে কল করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।