সুপ্রভাত ডেস্ক »
চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় চরম্বা ইউনিয়নে বন্যহাতির প্রাকৃতিক চলাচল পথ (করিডোর) দখল ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অভিযোগ উঠেছে।
রাজঘাটা টংকাবতী বনবিট অফিস সংলগ্ন ভরারচর ও সেগুনবাগান এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, হাতির ঐতিহ্যবাহী চলাচল পথের বিভিন্ন স্থানে টংঘর, বেড়া ও অন্যান্য মানবসৃষ্ট প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছে। এতে বন ও লোকালয়ের মধ্যকার হাতির স্বাভাবিক বিচরণ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি মানুষ-হাতির সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ছে বলে উদ্বেগ জানিয়েছেন পরিবেশবিদ ও স্থানীয় সচেতন মহল।
টংকাবতী বনবিট অফিসের আশপাশে টংকাবতী নদীর দুই পাড়ের প্রায় এক একর বনভূমি স্থানীয় প্রভাবশালী একটি চক্র দখল করে চাষাবাদের কাজে ব্যবহার করছে। বনাঞ্চল পরিষ্কার করে ফসলি জমিতে রূপান্তরের ফলে জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ফসল রক্ষার নামে হাতি তাড়ানোর উদ্দেশ্যে বনবিট অফিস থেকে প্রায় ৫০০ মিটার পূর্বে বনভূমির জায়গা দখল করে সাতটি টংঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এসব টংঘর নির্মাণে বনাঞ্চলের গাছ কেটে ব্যবহার করা হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, বনবিট কর্মকর্তাদের যোগসাজশে টংঘরগুলো নির্মিত হয়েছে। রাতে এসব টংঘরে অবস্থান করে আলো জ্বালিয়ে হাতি তাড়ানো হয়। অথচ এলাকাটি বন্যহাতির নিয়মিত চলাচলের পথ হিসেবে পরিচিত। ফলে মানুষের উপস্থিতিতে হাতির করিডোর সংকুচিত হয়ে পড়ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে হাতির দল বিকল্প পথ খুঁজতে লোকালয়ে প্রবেশ করছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ভরারচর এলাকায় নূর ও আবদুল মালেক একটি এবং সেগুনবাগান এলাকায় কাদের, মঞ্জুর, তৈয়ব আলী, আবদুল মজিদ ও সেলিমের নামে ছয়টিসহ মোট সাতটি টংঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এসব স্থাপনায় রাতের বেলায় আলো জ্বালিয়ে হাতির চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগের হাতি গবেষক অধ্যাপক ড. এ এইচ এম রায়হান সরকার বলেন, ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত আইইউসিএনের জরিপে হাতির ১২টি চলাচল করিডোর চিহ্নিত করা হয়েছিল। এর মধ্যে দক্ষিণ বন বিভাগের আওতাধীন চুনতি-সাতগড় করিডোরটি বর্তমানে প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। বনভূমি দখল ও টংঘর নির্মাণের মাধ্যমে করিডোরে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলে হাতির আবাসস্থল ও চলাচলের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হবে। এতে মানুষ ও হাতির মধ্যে সংঘাত বাড়বে, যা উভয় পক্ষের জন্যই প্রাণঘাতী হতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক কৃষক বলেন, টংকাবতী বনবিট অফিসের ৫০০ মিটারের মধ্যে টংকাবতী নদীর দুই পাশে পহরচান্দা মৌজার ভরারচর ও চরম্বা সেগুনবাগান এলাকায় সাতটি টংঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এসব টংঘরে নিয়মিত পাহারা বসিয়ে হাতির চলাচলে বাধা দেওয়া হচ্ছে। ফলে হাতির দল অনেক সময় লোকালয়ে প্রবেশ করছে এবং কৃষিজমির ফসল নষ্ট করছে।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্যহাতি সাধারণত নির্দিষ্ট করিডোর ব্যবহার করে চলাচল করে। ওই পথে টংঘর বা অন্য কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে হাতির স্বাভাবিক গতিপথ ব্যাহত হয়। এতে হাতি বিকল্প পথ খুঁজতে লোকালয়ে প্রবেশ করে এবং মানুষ-হাতির সংঘাতের ঘটনা বৃদ্ধি পায়
তবে টংকাবতী বনবিট কর্মকর্তা ইমন বিল্লাহ দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট স্থানগুলো বন বিভাগের জমি নয়। এরপরও তিনি বলেন, অবৈধভাবে নির্মিত টংঘরগুলো অপসারণ করা হবে। বন্যহাতির চলাচলের পথে কেউ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ পদুয়া বন রেঞ্জ কর্মকর্তা রিয়াদুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, বন্যহাতির চলাচলের পথে টংঘর নির্মাণ করে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির কোনো সুযোগ নেই। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)-এর চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়ক মনিরা পারভীন বলেন, চকরিয়া থেকে চুনতি পর্যন্ত হাতির অভয়ারণ্য ধরে নেওয়া যায়। এখানে হাতি চলাচলের অনেক করিডোর রয়েছে। এর মধ্যে রেলপথের কারণে হাতি চলাচলে বিঘ্নিত হচ্ছে। অনেক সময় ট্রেনের ধাক্কায় হাতি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এরই মধ্যে টংঘর নির্মাণ করে হাতি চলাচলে বাধা তৈরি করা উদ্বেগজনক। বন বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসনের এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বায়েজীদ বিন আখন্দের সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।



















































